ভারতে ১৩জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছে

ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানো মারুতি সুজুকি শ্রমিকদের মুক্ত করা হোক্‌!

২০ মার্চ ২০১৭

ওয়ার্ল্ড সোশ্যালিস্ট ওয়েবসাইট তার পাঠকদের ডাক দিচ্ছে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানো ১৩জন মারুতি সুজুকি শ্রমিকদের মুক্তির দাবিতে এই অনলাইন আবেদনে সই করার জন্য।

এক ভারতীয় কোর্ট যে ১৩ জন মারুতি সুজুকি শ্রমিককে নির্দয় ভাবে এবং প্রতিহিংসা পরায়ণ মনোভাব নিয়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত করেছে, তাদের সমর্থনে ভারতবর্ষ, এশিয়া এবং সারা বিশ্বের শ্রমিকের একত্রিত হওয়া প্রয়োজন।

ভারতীয় কারাগারগুলির অবস্থা রীতিমত ভয়াবহ ও নিষ্ঠুর। তার এই শ্রমিকরা প্রায় নরকবাসের মত সময় কাটাচ্ছে। অথচ তারা প্রত্যেকেই নির্দোষ। তাদের একমাত্র ‘অপরাধ’ এই যে তারা দিল্লীর কাছে অবস্থিত তাদের গাড়ির কারখানায় যে পাশবিক অবস্থা বিরাজমান, তার বিরুদ্ধে লড়াই করেছে।

তাদের এই শাস্তির কারণ সুজুকি কর্পোরেশন, পুলিশ এবং বিচার বিভাগের কর্তৃপক্ষের করা এক বিরাট ষড়যন্ত্রের ফলে তাদের এই শাস্তি হয়েছে। এই ষড়যন্ত্রে পূর্ণ সহযোগিতা আছে ভারতের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলির – কংগ্রেস এবং হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।

মারুতি সুজুকির শ্রমিকদের প্রদান করা এই নির্মম শাস্তি প্রত্যাহার করতেই হবে। শ্রমিকদের মুক্ত করতে হবে, তাদেরকে তাদের পরিবারে ফিরে যাবার অনুমতি দিতে হবে এবং তাদের কাজ তাদেরকে ফিরিয়ে দিতে হবে।

মারুতি সুজুকি শ্রমিক ইউনিয়ন (এম-এস্‌-ডাব্লু-ইউ)-এর কার্যনির্বাহী সদস্যের ১২ জনের দলের সকলেই যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ১৩ জন শ্রমিকের মধ্যে আছেন। হরিয়ানার মানেসরে মারুতি সুজুকির গাড়ির অংশ জোড়া দেওয়ার কারখানায় মালিকপক্ষের তাবেদারি করা ইউনিয়ন, যারা কোম্পানির সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে শ্রমিকদের শোষণ করত, তাদের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলনের মঞ্চ হিসাবেই এম-এস-ডাব্লু-ইউ সৃষ্টি করা হয়।

ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন যে শ্রমিকরা, তারা এই শিল্পাঞ্চলে বেশ কিছু সংগ্রামী কর্মসূচি ও প্রতিবাদে যুক্ত ছিল। এর মধ্যে ছিল মারুতি সুজুকি ও অন্যান্য প্রধান ভারতীয় এবং বিদেশী মালিকরা তাদের কারখানায় যে ভয়াবহ শোষণমূলক পরিবেশ রাখে তার বিরুদ্ধে ওয়াকআউট, ধর্ণা বিক্ষোভ ইত্যাদি দ্বারা প্রতিবাদ।

চতুর্থ ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক কমিটি (আই-সি-এফ-আই) এবং ওয়ার্ল্ড সোশ্যালিস্ট ওয়েব সাইট-এর আন্তর্জাতিক সম্পাদনার বোর্ড এই শ্রমিকদের এবং সামান্য কারণে দোষী সাব্যস্ত করা আরও ১৮ শ্রমিকের বিরুদ্ধে এই নির্যাতনের দ্ব্যর্থহীনভাবে এবং তীব্রভাবে নিন্দা করছে। ভারতীয় রাষ্ট্র এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি সারা ভারতের সব শ্রমিকদের ভয় দেখানোর জন্য মানেসরের মারুতি সুজুকির শ্রমিকদের বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্র করেছে। তারা বড় ব্যবসাগুলিকে দেখাতে চায় যে সামান্য মজুরি, নিরাপত্তাহীন চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এবং ভয়াবহ কর্মপরিবেশের বিরুদ্ধে শ্রমিকদের প্রতিরোধকে তারা নির্দয়ভাবে দমন করবে।

সরকারি আধিকারিকরা, প্রসিকিউটর এবং বিচারকরা বারবার এই দাবি করেছে যে বিনিয়োগকারীদের “নিশ্চিন্ত” করার জন্য মানেসরের মারুতি সুজুকি শ্রমিকদের কঠিনতম শাস্তি দেওয়া হোক্‌। গত শুক্রবারের রায় শুনানিতে প্রসিকিউটর এমনকি এও বলে যে এই ১৩ শ্রমিককে ফাঁসি দেওয়া হোক্‌।

মারুতি সুজুকি শ্রমিকদের ষড়যন্ত্রে ফাঁসানো এবং আগস্ট ২০১২-তে কর্মী ছাঁটাই, যেখানে ২,৩০০ কর্মীকে প্রতিস্থাপন করা হয়, তার অজুহাত হিসাবে দেখানো হয় ১৮ই জুলাই, ২০১২-তে পরিচালন সমিতির প্ররোচনায় ঘটে যাওয়া এক ঝামেলা এবং অগ্নিকান্ডকে। সেই অগ্নিকান্ডে কোম্পানির মানব সম্পদ বিভাগের এক ম্যানেজার, যাঁর নাম ছিল অবনীশ কুমার দেব, দম বন্ধ হয়ে মারা যান।

দেব-এর মৃত্যুর জন্য ওই ১৩ শ্রমিককে “শাস্তিযোগ্য হত্যাকান্ডে” দায়ী করার অর্থ এই যে আদালত তার নিজের পাওয়া প্রমাণকে উপেক্ষা করল। আদালতের কাছে প্রমাণ ছিল যে পুলিশ জাপানী মালিকাধীন গাড়ি প্রস্তুতকারক সংস্থাটির পরিচালকবর্গের সঙ্গে আঁতাত করেছিল এবং শ্রমিকদের বিরুদ্ধে যে প্রমাণ রয়েছে তা মিথ্যা বানানো।

বিবাদী পক্ষের উকিলরা দেখিয়েছেন যে ২০১২-য় কারখানায় ঝামেলার পর পুলিশ বহু শ্রমিককে যে গ্রেফতার করে, তার ভিত্তি ছিল কোম্পানির দেওয়া ‘সন্দেহভাজনদের তালিকা’। উকিলরা আরও দেখিয়েছেন যে সাক্ষীদের মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং ঝামেলা করার জন্য এবং অন্যান্য অপরাধ করার জন্য যাদের বিরুদ্ধে দোষ দিয়েছে, তাদেরকেই এই সাক্ষীরা চিনতে পারেনি।

বাদী পক্ষের মামলা এতই নিন্দিত ছিল যে ১০ই মার্চের রায়ে আদালত মানেসরের অন্যান্য ১১৭ জন মারুতি সুজুকি শ্রমিকদের পুণর্বাসন দিতে বাধ্য হয়, যদিও কর্তৃপক্ষ প্রবলভাবে দাবি করেছিল যে এই শ্রমিকরাও অপরাধী।

১৩জন শ্রমিকের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের করা কেসের সমগ্র কেসটিই অগ্নিসংযোগের ঘটনার ওপর ভিত্তি করে করা। কিন্তু তারা একটিও প্রমাণ দিতে পারল না যার ওপর ভিত্তি করে ওই ১৩ শ্রমিককে, বা যে কোনো শ্রমিককে, অগ্নিসংযোগের ঘটনার জন্য দায়ী করা যায় বা ওর সঙ্গে যুক্ত করা যায়। তারা এও বলতে পারল না কোথা থেকে, কখন এবং কি ভাবে আগুন লাগানো হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক কমিটি সারা পৃথিবী জুড়ে শ্রমিকদের, ছাত্রদের এবং যুবদের এই ১৩ মারুতি সুজুকি শ্রমিকদের পক্ষে লড়াই করার জন্য ডাক দিচ্ছে। এই ১৩ মারুতি সুজুকি শ্রমিকরা হলেন – রাম মেহের, সন্দীপ ধিলোন, রাম বিলাস, সারাবজিৎ সিং, পবন কুমার, সোহান কুমার, আজমের সিং, সুরেশ কুমার, অমরজিৎ, ধনরাজ বাম্বী, প্রদীপ গুজ্জার, যোগেশ এবং জিয়ালাল।

মারুতি সুজুকির শ্রমিকদের বিরুদ্ধে কোম্পানি এবং রাষ্ট্রের অশুভ আঁতাত ভেঙে দেবার জন্য ভারত, দক্ষিণ এশিয়া এবং সারা বিশ্ব জুড়ে শ্রমিক শ্রেণীর শিল্প সহ স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তিকে চালিত করতে আই-সি-এফ-আই এক আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা কর্মসূচির আয়োজন করেছে। ষড়যন্ত্রের শিকার ওই শ্রমিকদের অবিলম্বে মুক্তি, সব ভুল রায়কে নাকচ করা এবং ২০১২-তে খারিজ করা সব শ্রমিকদের পুনর্বাসনের দাবিতে সৃষ্টি এই সংগ্রামে আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেণীর যুক্ত হওয়া প্রয়োজন।

মারুতি সুজুকির শ্রমিকদের বিরুদ্ধে করা ষড়যন্ত্র এবং তাদের জেলে পাঠানো এক সার্বজনীন প্রক্রিয়ার চরমতম উদাহরণ। প্রত্যেক দেশে বিরাট কর্পোরেশনগুলি এবং তাদের ভাড়া করা রাজনৈতিক দলগুলি শ্রমিক শ্রেণীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, ইউরোপে এবং জাপানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতন দক্ষিণপন্থী রাজনীতিকরা উদ্বাস্তুদের এবং অভিবাসী শ্রমিকদের আক্রমণ করছে। তারা দ্রুত গতিতে শ্রমিক শ্রেণীর প্রত্যেক বিভাগের কর্মসংস্থান, জীবনযাত্রার মান এবং সামাজিক কর্মসূচিগুলির ওপর হামলা করছে। তাদের লক্ষ্য আরও অর্থ অপরাধমূলক যুদ্ধে খরচা করা এবং কর্পোরেট এবং অর্থনৈতিক আভিজাত্যকে আরও সমৃদ্ধ করা।

ভারত, বাংলাদেশ, এশিয়ার অন্যান্য জায়গায়, আফ্রিকায় এবং লাতিন আমেরিকায় জাপানী মালিকানাধীন সুজুকির মতো বহুজাতিকরা উন্নত ব্যবস্থাসহ উৎপাদন কেন্দ্রের সৃষ্টি করেছে যেখানে শ্রমিকদের ওপর ভয়াবহ শোষণ হয়। সব ধরণের শ্রমিক প্রতিরোধ দমন করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি এবং রাষ্ট্রযন্ত্র তাদেরই ইশারায় চলে, যা মারুতি সুজুকির শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের মধ্যে দিয়েই পরিষ্কার।

সারা পৃথিবীতে তাদের শ্রেণী ভ্রাতা ও ভগিনীদের সঙ্গে সব শ্রমিকের সামাজিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার সংগ্রামে একত্রিত না হয়ে কোনো শ্রমিকের পক্ষে নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।

ভারতীয় শ্রমিকদের মধ্যে মারুতি সুজুকি শ্রমিকদের প্রতি যথেষ্ট সমবেদনা ও সমর্থন রয়েছে। তাই গণ-প্রতিবাদের ভয়ে ভারতীয় রাজধানী দিল্লীর উপকন্ঠে বিরাট স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন কেন্দ্র মানেসর-গুরগাঁও শিল্পাঞ্চলে সরকারি কর্তৃপক্ষ পাঁচ জনের বেশী সংখ্যক মানুষের সমাবেশের ওপর বারবার নিষেদ্ধাজ্ঞা জারি করেছে এবং হাজার হাজার পুলিশকে সংগঠিত করেছে।

সারা পৃথিবীর মত ভারতেও ট্রেড ইউনিয়নগুলি এবং তথাকথিত “বাম” দলগুলি শ্রমিক শ্রেণীকে সম্পূর্ণ ভাবে ত্যাগ করেছে। গত পাঁচ বছর ধরে মারুতি সুজুকি শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং তাদের ওপর অত্যাচারের বিষয়ে স্তালীনপন্থী সর্বভারতীয় ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (এ-টি-ইউ-সি) এবং সেন্টার অব ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়নস্‌ (সি-আই-টি-ইউ) এক অপরাধী-সুলভ নীরবতা পালন করেছে। তাদের ওয়েবসাইটগুলি - এবং তারা যে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত, সেই ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি এবং ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) – সেগুলি ১০ই মার্চ শ্রমিকদের দোষী সাব্যস্ত করার দিন এবং ১৮ই মার্চ তাদের শাস্তিদানের দিন একদম চুপ থেকেছে।

স্তালীনপন্থীরা এবং অন্যান্য রাষ্ট্রযন্ত্ররামারুতি সুজুকি শ্রমিকদের বাঁচানোর জন্য শুরু করার সংগ্রামের সঙ্গে এক করে নানান শিল্পে শ্রমিক শ্রেণীকে চালনা করা এবং স্বাধীন রাজনৈতিক সংগ্রাম চালু করে চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক নিয়োগ, কম মাইনে এবং ভয়াবহ কর্ম পরিবেশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার প্রবল ভাবে বিরোধী।

তারা এম-এস-ডাব্লু-ইউ এর ওপর এবং মানেসরের শ্রমিকদের ওপর তাদের প্রভার খাটিয়ে তাদের রাজি করিয়েছে বড় বড় রাজনৈতিক দল ও ভারতীয় পুলিশ এবং আদালতের কাছে আর্জি জানাতে – অর্থাৎ সেই প্রতিষ্ঠানগুলির কাছেই যারা বড় ব্যবসার একাধিপত্ব, দারিদ্রের বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্দ্ধমান সামাজিক অসাম্যকে বাড়াতে আরও সাহায্য করে।

কেন্দ্রে ও হরিয়ানা প্রদেশে কংগ্রেস পার্টির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সরকার মারুতি সুজুকি শ্রমিকদের ওপর হওয়া প্রাথমিক নির্যাতনের দায়িত্বে ছিল। মানেসরের শ্রমিক দলকে কর্মহীন করার এবং গণ গ্রেফতারের আগের ১৪ মাসে হরিয়ানা সরকার বারবার পুলিশ পাঠিয়ে শ্রমিকদের ক্রিয়াকলাপ বন্ধ করার চেষ্টা করেছে। তারা প্রচার করেছে যে এম-এস-ডাব্লু-ইউ এমন এক প্রতিষ্ঠান যাদের সঙ্গে অংশীদারি আছে ‘সন্ত্রাসবাদীদের’ এবং অন্যান্য ‘বহিরাগতদের’ যারা রাজ্যের অর্থনীতির বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাত চালাতে চায়। পরবর্তী কালে দিল্লী ও হরিয়ানায় বি-জে-পি-র নেতৃত্বে যে সরকার গঠিত হয় তারাও একই ভাবে এই কোম্পানি ও রাষ্ট্রের এই বিবাদকে চালিয়ে যায়।

আই-সি-এফ-আই সমস্ত মোটর শ্রমিকদের এবং ডাব্লু-এস্‌-ডাব্লু-এস-এর সমস্ত পাঠকদের কাছে আবেদন জানাচ্ছে এই হাস্যকর পরিস্থিতির বিরোধিতা করতে এবং বন্দী মারুতি সুজুকি শ্রমিকদের এই মুহূর্তে মুক্ত করার দাবি জানাতে। বিশ্ব জুড়ে যত শ্রমিক আছেন এবং যাঁরা সারা পৃথিবীতে গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় ব্রতী, তাঁদের সকলকে জানাতে হবে এই শ্রমিকদের দুর্দশার কথা। শ্রমিক শ্রেণীর শক্তিকে কাজে লাগিয়ে শ্রমিক স্বার্থ রক্ষা করার এক আন্তর্জাতিক আন্দোলনে আমাদের সঙ্গে যোগ দিন।