শ্রীলঙ্কার সোশ্যালিস্ট ইকুয়ালিটি পার্টির অর্ধশতবর্ষ

শ্রমিক শ্রেণীকে আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্র ও বৈপ্লবিক নেতৃত্বের অস্ত্র দিয়ে সজ্জিত করে তোলো!

১৬ জুন ২০১৮

চতুর্থ আন্তর্জাতিকের আন্তর্জাতিক কমিটির শ্রীলঙ্কার শাখার নাম সোশ্যালিস্ট ইকুয়ালিটি পার্টি (এস্‌-ই-পি)। আজ শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক স্বাধীনতার এবং বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের লড়াইয়ে এস্‌-ই-পি ৫০ বছর পূর্ণ করল। কলম্বোতে ১৯৬৮ খৃষ্টাব্দের ১৬-১৭ই জুন একটি সভায় দলটি রেভলিশনারি কমিউনিস্ট লিগ (আর-সি-এল্‌) হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আই-সি-এফ্-আই-এর অন্যান্য বিভাগের সঙ্গে আর-সি-এল্‌-ও ১৯৯৬ সালে এস্‌-ই-পি-তে রূপান্তরিত হয়।

বিশ্বের শ্রমিক শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বের ক্রমবর্দ্ধমান সংখ্যার মাঝে শ্রমিক শ্রেণীকে নেতৃত্বের যে সঙ্কট, তার সমাধান করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আর-সি-এল্‌। পদক্ষেপটি দুঃসাহসী ছিল, কিন্তু অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল। এবং তখন যে দলগুলির আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেণীর ওপর আধিপত্য ছিল, তাদের প্রতি এ ছিল এক তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ, সেই সব দলগুলির জন্য যাদের তখন আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেণীর ওপর আধিপত্য ছিল, যেমন বিশাল এবং আপাতদৃষ্টিতে সর্বশক্তিমান স্তালীনপন্থীরা এবং সামাজিক গণতান্ত্রিক আমলাতন্ত্র পন্থীরা; কৃষক-ভিত্তিক সশস্ত্র সংগ্রামের প্রশংসা করা মাওবাদীরা; এবং ঐতিহাসিক ভাবে শোষিত দেশে নানান বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী সংগ্রামী দল, যেমন ভারতে কংগ্রেস পার্টি, যারা তাদের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বাধীন উন্নয়ন প্রকল্পগুলিকে 'সমাজতন্ত্র' বলে অভিহিত করত এবং মস্কো, বেজিং এবং বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে যোগসাজস রেখে তাদের রণকৌশল ঠিক করত।

এই দলগুলির মধ্যে যা সার্বজনীন ছিল তা হলো জাতীয়তাবাদী কার্য্যক্রমের প্রতি এদের আনুগত্য এবং আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্রের প্রতি এদের প্রবল বিরোধিতা।

তাৎক্ষণিক অর্থে আর-সি-এল্‌ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কারণ লঙ্কা সম সমাজ পার্টি (এল্‌-এস্‌-এস্‌-পি), যারা নিজেদের ট্রটস্কিপন্থী বলত এবং কিছুদিন আগে পর্যন্তও পাবলোইট ইউনাইটেড সেক্রেটারিয়েটের একটি অংশকে নেতৃত্ব দিচ্ছিল, তাদের লজ্জাজনক বিশ্বাসঘাতকতার জন্য।

কয়েক বছর সুবাধাবাদীর মতন পিছু হটার পর ১৯৬৪ সালে শ্রমিক শ্রেণীর একটি বিপ্লবী গণ আন্দোলনের নেতৃত্ব ছিল এল্‌-এস্‌-এস্‌-পি-র হাতে। এল্‌-এস্‌-এস্‌-পি সেই আন্দোলনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং জনপ্রিয় সিংহলী দল শ্রীলঙ্কা ফ্রীডম পার্টির (এস্‌-এল্‌-এফ্‌-পি)-র নেতৃত্বাধীন বুর্জোয়া সরকারে যোগদান করে। এল্‌-এস্‌-এস্‌-পি-র সমর্থন চাইবার সময় প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি বন্দরনায়েকে সঙ্কটাপন্ন শ্রীলঙ্কার বুর্জোয়া শ্রেণীকে পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন যে 'শ্রমিকদের নেতাদের' সরকারে আনার একমাত্র বিকল্প ছিল, তাঁর ভাষায়, 'একনায়কতন্ত্র' এবং শ্রমিকদের 'বন্দুকের নল ও বেয়নেটের সামনে জোর করে কাজ করানো'।

নিজেদের ট্রটস্কিপন্থী বলে দাবি করা প্রথম দল হিসাবে একটি বুর্জোয়া সরকারে যোগ দিয়ে এল-এস-এস-পি চিরস্থায়ী বিপ্লবের সঙ্গে তাদের সব সম্পর্ক অস্বীকার করল। ১৯৪৭-৪৮-এ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ তাদের দক্ষিণ এশীয় সাম্রাজ্য থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ যখন ত্যাগ করল, তখন শ্রীলঙ্কার ট্রটস্কিপন্থীরা এই 'স্বাধীনতা'-কে মিথ্যা বলে ধিক্কার জানিয়েছিল এবং জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার দেশভাগকে ঐতিহাসিক অপরাধ বলে অভিহিত করেছিল। ঔপনিবেশিক বুর্জোয়ার প্রতিদ্বন্দী দলগুলির হাতে ক্ষমতার হস্তান্তর ক্রমাগত বিপ্লবী হয়ে ওঠা শ্রমিক শ্রেণীকে দমন করার লক্ষ্যে এবং জমিদারপ্রথা, বর্ণবাদ এবং নানান সামন্ততান্ত্রিক দোষগুলিকে মুছে দেওয়া থেকে আটকাতে সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের রূপের বদল ঘটিয়েছিল মাত্র।

তামিল ভাষা বলা চাষ শ্রমিক, যারা শ্রীলঙ্কার শ্রমিক শ্রেণীর বৃহত্তম অংশ ছিল, তাদের নাগরিক অধিকার না দেওয়ার প্রতিবাদ কেবলমাত্র ট্রটস্কিপন্থীরাই করেছিল এবং সাবধান করেছিল যে সাম্প্রদায়িকতা শ্রমিক শ্রেণীকে বিভাজন করার একটা অস্ত্র।

কিন্তু ১৯৬০-এর দশকের শুরুর দিকেই এল-এস-এস-পি সম্পূর্ণ উল্টোদিকে চলছিল। এখন তারা দাবি করে যে শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যেই সাংসদীয় সংস্কায় কার্য্য এবং বুর্জোয়া এস-এল-এফ-পি এবং অন্যান্য উৎকট সিংহলী দেশপ্রেমী দলগুলিকে সঙ্গে নিয়েই সমাজতন্ত্র গঠন করা সম্ভব।

১৯৬৪ সালের সেই মারাত্মক বিশ্বাসঘাতকতার পর এল-এস-এস-পি-র মধ্যে এবং আশেপাশের অনেকে, এবং নতুন প্রতিষ্ঠিত এল-এস-এস-পি (আর), তাদের শোধনবাদী, সাংসদীয় রাজনীতির বিরোধীতা করছে বলে দাবি করল। কিন্তু তারা সেই বিরোধীতাও করেছিল অগভীর ভাবে এবং জাতীয়তাবাদী ভিত্তিতে।

আর-সি-এল এবং পাবলোপন্থী সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম

আর-সি-এল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একদল যুব, যাঁরা ভিয়েতনাম যুদ্ধের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এবং উপনিবেশবাদ ভেঙে ফেলা সত্ত্বেও এই পন্থা জনগণের সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ দেখে বিপ্লবের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তারা আই-সি-এফ-আই দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং তারই নির্দেশিকা মেনে এল-এস-এস-পি-র বিশ্বাসঘাতকতার মূল কারণ ও তার তাৎপর্য সংক্রান্ত দূরবর্তী সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন এবং এর থেকে শিক্ষা নিয়েছেন এশিয়া ও সারা বিশ্বে শ্রমিক শ্রেণীর এক বৈপ্লবিক দল প্রতিষ্ঠা করার।

এল-এস-এস-পি-র রাজনৈতিক পচন এবং শ্রীলঙ্কার বুর্জোয়া শাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রতিপালক হিসাবে তাদের রূপান্তর বৃহত্তর সামাজিক প্রক্রিয়ায় প্রথিত। চতুর্থ আন্তর্জাতিকে পেটি বুর্জোয়া সংশোধনবাদের উত্থান যা পুঁজিবাদের সাময়িক স্থিতিশীলতা ফিরে পাওয়ায় স্তালিনপন্থার ট্রটস্কিপন্থী চরিত্রায়নকে ত্যাগ করেছে। স্তালিনপন্থার এই চরিত্রই প্রমাণ করে চতুর্থ আন্তর্জাতিকের প্রতিষ্ঠা কত প্রয়োজনীয় ছিল। এই চরিত্রই বিপ্লবী শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বের সংগ্রামকে অস্বীকার করে অন্যান্য সামাজিক শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে 'সমাজতন্ত্র' প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে।

মিশেল পাবলো এবং আর্নেস্ট ম্যান্ডেল এর নেতৃত্ব 'জনগণের আসল সংগ্রামে যোগ দেওয়ার' নাম করে তাদেরর 'বাম' দিকে ঠেলে দেবার বিবৃত লক্ষ্য নিয়ে চতুর্থ আন্তর্জাতিকের শাখাগুলিকে স্তালীনপন্থী এবং সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট দলগুলির সঙ্গে মিশিয়ে দেবার, এবং এশিয়াতে বুর্জোয়াপন্থী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে এক করে দেবার এই প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হয়েছে।

আই-সি-এফ-আই ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পাবলোপন্থী শোধনপন্থার বিরোধীতা করতে এবং ট্রটস্কিপন্থী কার্য্যক্রম এবং চিরস্থায়ী বিপ্লবের কৌশলকে রক্ষা করতে।

এল-এস-এস-পি দাবি করেছিল তারা পাবলো এবং ম্যান্ডেলের ক্রেমলিনের স্তালীনপন্থী আমলাতন্ত্রের এবং তাদের ধামাধারী কমিউনিস্ট দলগুলির বিপ্লবী ভূমিকার এবং "আত্ম-সংস্কার"-এর অতিরঞ্জিত বর্ণনার বিরোধীতা করেছিল। কিন্তু তারা ভাবে শ্রমিক শ্রেণীকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা দেবার গোঁড়া ট্রটস্কিপন্থী সংগ্রামে যোগ দিলে তাদের শ্রেণী সমঝোতার রাজনীতিতে তার প্রভাব পড়বে। তাই তারা আই-সি-এফ্‌-আই-তে যোগ দিতে অসম্মত হয়।

এর পর কলম্বো ও প্যারীর মধ্যে এক সুবিধাবাদী কার্য্যনির্বাহী সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যেখানে এল্‌-এস্‌-এস্‌-পি পাবলো ও ম্যান্ডেলের মিথ্যা চতুর্থ আন্তর্জাতিককে সমর্থন ও সম্মান জানালো। এর বদলে এল-এস-এস-পি সিংহলী জনপ্রিয় রাজনীতির দ্বারা বুর্জোয়াতন্ত্রের ধামা ধরে সাংসদীয় গণতন্ত্র এবং ট্রেড ইউনিয়নবাদী রাজনীতিতে যোগ দেবার এবং শ্রমিক শ্রেণীকে নিজেদের নীতিতে বেঁধে বিভক্ত করার কাজের রাজনৈতিক সমর্থন পেল।

১৯৬৩-তে তারা 'চতুর্থ আন্তর্জাতিক'কে 'পুণর্মিলিত' করল এই দাবির ভিত্তিতে যে কিউবার বিপ্লব প্রমাণ করেছে যে কোনো প্রলেতারিয়েত বা সর্বাহারা পার্টি বা প্রলেতারিয়েত বিপ্লব ছাড়াও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায়। ইউনাইটেড সেক্রেটারিয়েট-এর পাবলোপন্থী নেতারা যে 'জনসাধারণের ট্রটস্কিপন্থী পার্টি' বানাতে চাইছিল, তার আদর্শ হিসাবে ধরল এল-এস-এস-পি-কে।

যাঁরা আর-সি-এল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাঁরা বুঝেছিলেন যে শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক স্বাধীনতা - শোষণের বস্তু থেকে নতুন সমাজ ব্যবস্থার প্রধান চরিত্র হয়ে ওঠার তাদের যে রূপান্তর - তা পাবলোপন্থা এবং সব রকমের জাতীয়তাবাদী সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে এক বিরামহীন রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক সংগ্রামে বাধা পড়ে আছে। অথবা, মার্কন ট্রটস্কিপন্থী জেমস্‌ পি. ক্যানোন-এর বক্তব্য অনুসারে, "সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রামের দশ ভাগের নয় ভাগ হলো শ্রমিকের দল, এমন কি পার্টির মধ্যেও, বুর্জোয়া প্রভাবের বিরুদ্ধে লড়াই।"

আর-সি-এল প্রতিষ্ঠার সভা

১৯৬৮ সালের জুন মাসের প্রতিষ্ঠা সভায় আর-সি-এল-কে দ্বর্থহীন ভাষায় অভিহিত করা হয় শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী পার্টি হিসাবে, যারা আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিবেদিত।

তিনটি সঙ্কল্প পাশ হয়। প্রথম সঙ্কল্পটি আর-সি-এল-কে আই-সি-এফ-আই-এর শাখা হিসাবে গড়ে তোলার শপথ নেয়। অধিবেশনের আলোচনায়, যেখানে শ্রেণী সংগ্রামের আন্তর্জাতিকের চরিত্র বিষয়ে কথা বলা হয়, তা মেনে নিয়েই বলা হয় যে একটি আন্তর্জাতিক পার্টির প্রয়োজন। চতুর্থ আন্তর্জাতিক স্তালীনপন্থা ও সামাজিক গণতন্ত্রকে যে প্রতিবিপ্লবী বলেছিল, তার যথার্থতা মূল্যায়ন হয়, এবং 'সব ধরণের শোধনবাদের বিরুদ্ধে অদম্য লড়াই' এবং শ্রেণী সংগ্রামে 'সর্বোচ্চ' অংশগ্রহণের মধ্যে যে 'অবিচ্ছেদ্য' যোগ, তার কথা বলা হয়।

দ্বিতীয় সঙ্কল্প ১৯৬৮ সালের মে-জুন মাসে ফরাসি শ্রমিক শ্রেণীর উত্থানকে কুর্নিশ জানায় এবং দ্য গল-এর সরকারকে এবং ফরাসি পুঁজিবাদকে রক্ষা করার জন্য স্তালীনপন্থী কমিউনিস্ট পার্টিকে অভিযুক্ত করে। এই সঙ্কল্পে বলা হয়, "এই বিশাল সংগ্রাম" পশ্চিম ইউরোপে বৈপ্লবিক সংগ্রামের সূচনা করল এবং "পাবলোপন্থী শোধনবাদী তত্ত্বকে ভেঙে দিল যা বলে যে বিপ্লবের কেন্দ্র উপনিবেশ ও আধা-উপনিবেশে সরে গেছে এবং জনগণের চাপে স্তালীনপন্থীরা বিপ্লবীতে পরিণত হবে।"

তৃতীয় সঙ্কল্পটি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তাদের সংগ্রামে ভিয়েতনামের শ্রমিক ও কৃষকদের সমর্থন জানায়। এই সঙ্কল্প জোর দিয়ে বলে যে সত্যিকারের জাতীয় মুক্তি পাওয়া সম্ভব কেবলমাত্র বিশ্ব পুঁজিবাদকে পরাস্ত করে এবং এর জন্য ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং এশিয়ার শ্রমিক শ্রেণীর বৈপ্লবিক সংগঠন প্রয়োজন।

সেই প্রতিষ্ঠা সভাতে এল-এস-এস-পি-র নীতির প্রবল প্রতিক্রিয়াশীল তাৎপর্য সম্বন্ধে এবং এরও আগে বর্তমানে তার কাছের সঙ্গী স্তালিনিস্ট কমিউনিস্ট পার্টি অব্‌ সিলোন (সি-পি-সি) সম্বন্ধে, এবং 'সবার আগে সিঙ্ঘল' নীতি সম্বন্ধে সাবধান করা হয়। এই সভাতে ভবিষ্যত্বাণী করা হয় যে 'এস-এফ-এল-পি, এল-এস-এস-পি এবং সি-পি-সি জোটের করা জাতীয়তাবাদী কার্য্যক্রম 'সিঙ্ঘলী বৌদ্ধ একনায়কতন্ত্রের' জন্য উর্বর জমি প্রস্তুত করেছে'।

সর্বোপরি, আই-সি-এফ-আই-এর সঙ্গে সংযুক্তি এবং বৈপ্লবিক দৃষ্টিভঙ্গীর ব্যাখ্যার মাধ্যমে সভাটি শ্রীলঙ্কার শ্রমিক ও শোষিত শ্রেণীর মধ্যে চিরস্থায়ী বিপ্লবের লড়াইকে পুণরুজ্জীবিত করল। এর মধ্যে ছিল এই বিষয়টি বোঝা যে সাম্রাজ্যবাদের যুগে প্রাক্তন পুঁজিবাদী উন্নয়নের দেশগুলিতে অসম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক কাজগুলি করা সম্ভব একমাত্র শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্ব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে।

এরই সঙ্গে সমন্বয় রেখে, ১৯৪৭-১৯৪৮-এ যুদ্ধোত্তর সময়ে পুঁজিবাদকে পুণর্বার স্থিতিশীল করতে এবং শ্রীলঙ্কায় কোনো ধরণের জাতীয়তাবাদী ধারনার বিপ্লবের, যা দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে এবং ক্রমে বিশ্ব জুড়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্ম দেবে, তা প্রত্যাখান করতে, আর-সি-এল প্রতিক্রিয়াশীল জাতি-রাষ্ট্র কাঠামোর ট্রটস্কিবাদী চরিত্রায়ণকে আবার সঠিক বলে প্রমাণ করল।

শ্রীলঙ্কার পুঁজিবাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠার সূচনাতে এল-এস-এস-পি-র ভূমিকা এবং বিশ্বজুড়ে একই ধরণের ঘটনা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পুঁজিবাদী বৃদ্ধির পতন হওয়ায় ১৯৬৮ ও ১৯৭৬-এর মধ্যে শ্রমিক শ্রেণী বিশ্ব জুড়ে এক বৈপ্লবিক আক্রমণ গড়ে তোলে। আর-সি-এল-এর প্রতিষ্ঠা সভাতে যে ভবিষ্যত দর্শন করেছিল, তেমন ভাবেই ১৯৬৮-র মে-জুন মাসে ফ্রান্সের সাধারণ ধর্মঘটের পরেই ঘটেছিল পর পর বেশ কয়েকটি শ্রমিক উত্থান হয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৬৯-এ ইতালিতে 'তপ্ত গ্রীষ্ম', ১৯৭৪-এ ব্রিটিশ খনি শ্রমিকদের ধর্মঘট, যা এডওয়ার্ড হিথের কন্‌জারভেটিভ পার্টির সরকারের এবং গ্রীস ও পর্তুগালে ফ্যাসিস্ট শাসনের পতন ঘটায়।

কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ এই আক্রমণ সামলে নিতে পেরেছিল কারণ স্তালীনপন্থী এবং সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট দলগুলি প্রতিবিপ্লবী ভূমিকা পালন করেছিল। শ্রমিক শ্রেণীর বৈপ্লবিক প্রচেষ্টাকে দমন করতে পাবলোপন্থীরা প্রতি পদক্ষেপে আমলাতন্ত্রী 'শ্রমিকদের দলগুলিকে' সাহায্য করেছিল। পাবলোপন্থীরা পদ্ধতিগতভাবে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে এবং আই-সি-এফ-আই-কে বিচ্ছিন্ন করার কাজ করে গেছে। এর ফলে শ্রমিক শ্রেণী বৈপ্লবিক ট্রটস্কিপন্থী কার্য্যক্রমের নাগাল পায়নি।

শ্রীলঙ্কায় ১৯৬৪-র ক্ষণস্থায়ী জোটের পরে ১৯৭০ থেকে ১৯৭৫ 'দ্বিতীয় জোট'-এর সৃষ্টি হয়ে যা ক্রমাগত শ্রমিক শ্রেণী এবং গ্রাম্য মানুষের সঙ্গে সর্বসমক্ষে দ্বন্ধে জড়িয়ে পড়ছিল। এল-এস-এস-পি-র অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৭৩-এর বিশ্রী জাতীয়তাবাদী সংবিধানের মধ্যে দিয়েই, যা এল-এস-এস-পি নেতা কলভিন দ্য সিলভা লিখেছিল। এই সংবিধান তামিল সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে কর্ম ও শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক কোটার শুরু করে, বৌদ্ধ ধর্মকে রাষ্ট্র ধর্ম এবং সিঙ্ঘলীকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্থাপন করে।

এল-এস-এস-পি-র বিশ্বাসঘাতকতা সব দক্ষিণপন্থী বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করে তুলল, যা নতুন স্থাপিত আর-সি-এল-কে প্রবল চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলল।

ভারতে স্তালীনপন্থী ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (সি-পি-আই) প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল, কারণ বড় পুঁজিপতিদের দল কংগ্রেস পার্টির সঙ্গে তাদের কাছের সম্পর্ক ছিল এবং ১৯৬২-র ভারত-চীন যুদ্ধে তারা নয়াদিল্লিকে সমর্থন জানিয়েছিল। অথচ স্তালীনপন্থীরা, বিশেষত মাওবাদী নক্সালপন্থী আন্দোলনকারীরা এশিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ ট্রটস্কিপন্থী দল এল-এস-এস-পি -র অপরাধী ভূমিকা নির্দেশ করেছে, কারণ তাদের লক্ষ্য ছিল বিপ্লবমনস্ক শ্রমিক ও যুবদের আসল ট্রটস্কিপন্থাতে যোগ দিতে বাধা দেওয়া।

শ্রীলঙ্কাতে সিংহলী সাম্প্রদায়িকতাকে বৈধ করে এবং তামিল সংখ্যালঘুরা যাতে শ্রমিক শ্রেণীকে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় সাহায্য করতে না পারে, তাই তাদের আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করে দিয়ে এল-এস-এস-পি-র ও শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক শোষণ সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অবাধ বৃদ্ধির দরজা উন্মুক্ত করে দিয়েছিল।

পেটি বুর্জোয়া মৌলবাদী জে-ভি-পি-র বিরুদ্ধে আর-সি-এল-এর সংগ্রাম

মাওবাদ, কাস্ত্রোবাদ, সিংহলী 'দেশভক্তি' এবং অন্ধ দেশহিতৈষিতার মিশ্রণের মাধ্যমে ছাত্র ও কৃষক যুবদের মধ্যে ব্যাপক সমর্থন লাভ করা পেটি বুর্জোয়া মৌলবাদী জনতা বিমুক্তি পেরামুনা (জে-ভি-পি)-র বিরুদ্ধে আর-সি-এল যে তত্ত্বগত অবস্থান আর-সি-এল গ্রহণ করেছে, তা তাদের উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

কীর্তি বালাসুরিয়া, যিনি মাত্র ১৯ বছর বয়সে আর-সি-এল এর প্রতিষ্ঠা সভায় দলের সাধারণ সম্পাদক হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন, ১৯৭০ সালে জে-ভি-পি-র বিরুদ্ধে 'জে-ভি-পি-র রাজনীতি ও শ্রেণী প্রকৃতি' নামে একটি বিধ্বংসী মার্ক্সবাদী সমালোচনা লিখেছিলেন। তিনি প্রকাশ করে দেন যে জে-ভি-পি সংগঠিত ভাবেই শ্রমিক শ্রেণীর জন্য প্রতিকূল, যা তাদের প্রতিক্রিয়াশীল জাতিয়তাবাদের মধ্যে এবং জাতীয় বুর্জোয়াদের 'প্রগতিশীল' সম্ভাবনা সম্পর্কে এবং প্রথিত এবং কৃষক-ভিত্তিক সশস্ত্র সংগ্রামের কার্যকারিতা নিয়ে বিপজ্জনক বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার মধ্যেই প্রথিত। যারা সশস্ত্র সংগ্রামকে বিপ্লবী রাজনীতির কষ্টিপাথর বলে মনে করে, তাদের দাবিকে নস্যাৎ করে কমরেড বালাসুরিয়া লিখেছিলেন: "বিভিন্ন শ্রেণীর নিজেদের মধ্যের সম্পর্ক এবং তার পরিবর্তনশীলতার সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ মূল্যায়ন ছাড়া বিপ্লবের প্রশ্নই ওঠে না।"

আর-সি-এল-এর সাধারণ সম্পাদক সাবধান করেছিল যে জে-ভি-পি-র অন্ধ সিংহলী দেশহিতৈষিতা, যার ফলে তারা 'বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত' তামিল ভাষী চাষ শ্রমিকদেরও বিরোধীতা করেছে, তা ফ্যাসিবাদের রূপ নিয়েছে। তিনি সাবধান করেছিলেন, "জে-ভি-পি লঙ্কাতে এক শ্রমিক শ্রেণী বিরোধী আন্দোলনের সৃষ্টি করছে যা ভবিষ্যতে কোনো ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের কাজে লাগবে।"

জে-ভি-পি-র রাজনীতিকে প্রকাশ করে দিয়ে গোঁড়া সিঙ্ঘলী জনপ্রিয়তা এবং এল-এস-এস-পি এবং এল-এস-এস-পি (আর), যারা এর সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে, তাদের সঙ্গে নিজেদের শ্রেণী বিভেদ আরও গভীর করে নিয়েছে।

পরের বছর জে-ভি-পি রাজনৈতিক ভাবে দেউলিয়া এক 'সশস্ত্র সংগ্রাম' চালু করার পর, দ্বীপের দক্ষিণে জে-ভি-পি এবং গ্রামীন যুবদের ওপর পুঁজিবাদী জোট সরকার যে জঘন্য হামলা করেছিল, তার বিরোধীতা করতে আর-সি-এল-কে বাধ্য করেছিল এই একই বৈপ্লবিক ঝোঁক। এই আদর্শবাদী অবস্থানের জন্য ১৯৭১-এ আর-সি-এল এর সংবাদপত্রগুলিকে অবৈধ বলে ঘোষণা করা হয় এবং দলটিকে কিছুদিন রাষ্ট্রের সন্ত্রাসের হুমকি নিয়ে এবং গোপনে কাজ করতে হয়েছিল। তাসত্ত্বেও, তারা রাষ্ট্রের শোষণের বিরোধীতা করতে শ্রমিক শ্রেণীর হয়ে প্রচার করে এবং 'রাজনৈতিক বন্দীমুক্তির' দাবি তোলে। আমরা যেমন তখনও ব্যাখ্যা করেছিলাম, বুর্জোয়া এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কৃষকদের সঙ্গে জোট বাঁধার অংশ হিসাবে গ্রামীণ জনগণকে রক্ষা করার দায়িত্ব শ্রমিক শ্রেণীরই।

১৯৭৮ সালে জেল থেকে ছাড়া পাবার পর জে-ভি-পি নেতা উইজিয়েরা আর-সি-এল এর প্রতিরক্ষা অভিযানের গুরুত্ব মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং আর-সি-এল এর অফিসে গিয়ে ব্যক্তিগত ধন্যবাদ জানান।

বুর্জোয়া প্রতি আক্রমণ এবং তামিল-বিরোধী যুদ্ধ

১৯৬৮ থেকে ১৯৭৫ এ বিশ্বব্যাপী শ্রমিক শ্রেণীর উত্থানকে কক্ষচ্যূত করানোর মধ্যে দিয়ে পুঁজিবাদী প্রতিআক্রমণের শিকড় প্রথিত হয়, যা ১৯৭০ এর দশকের শেষ থেকে শুরু হয়েছিল এবং এর সঙ্গে চিরকার জড়িয়ে থাকবে রোনাল্ড র‍্যেগান ও মার্গারেট থ্যাচারের নাম।

পুঁজিবাদী সঙ্কটের বোঝা শ্রমিক শ্রেণী ও গ্রামের মানুষের কাঁধে তুলে দেওয়ার যে চেষ্টা'সমাজতান্ত্রিক' এস-এল-এফ-পি, এল-এস-এস-পি এবং সি-পি-সি জোট করেছিল, তার ফলে ১৯৭৭-এ জে.আর.জয়বর্ধনের নেতৃত্বে সম্পূর্ণ দক্ষিণপন্থী ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির (ইউ-এন-পি) সরকার গড়ার পথ পরিষ্কার হয়। এর ফলে শ্রীলঙ্কা বিশ্ব পুঁজিবাদের শোষণের অবাধ ভূমি হিসাবে পরিণত হয়, ১৯৮০-র সরকারি কর্মীদের সাধারণ ধর্মঘট চূর্ণ করে, এবং ক্রমবর্দ্ধমান সামাজিক উত্তেজনা ও ক্রোধ এক প্রতিক্রিয়াশীল দিক দিয়ে মুক্ত করতে সিঙ্ঘলী সাম্প্রদায়িকতা বৃদ্ধি করে। এই পদ্ধতির ফলশ্রুতি হিসাবেই কলম্বো ১৯৮৩ সালে তামিল সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধ শুরু করে।

যে যুদ্ধ এই দ্বীপের রাজনৈতিক জীবনকে আগামী শতাব্দীর এক চতুর্থাংশ সময় ধরে আধিপত্য করবে, তার বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীকে সংহত করতে কেবল মাত্র আর-সি-এল/এস-ই-পি লড়াই করেছিল। তারা তামিল অধ্যুষিত উত্তর ও পূর্ব দিক থেকে অবিলম্বে সেনা ও নিরাপত্তা বাহিনী প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিল এবং পদ্ধতিগতভাবে প্রকাশ করেছিল কিভাবে সমগ্র শ্রমিক শ্রেণীর সামাজিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারকে আক্রমণ করার জন্য যুদ্ধকে ব্যবহার করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে আর-সি-এল/এস-ই-পি লিবারেশন টাইগারস্‌ অব তামিল ইলাম (এল-টি-টি-ই) এবং অন্যান্য তামিল জাতীয়তাবাদী দলগুলি যারা শ্রীলঙ্কা রাষ্ট্র এবং পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর ঐক্য গড়ে তোলার জন্য লড়াই করছিল, যেমন পিপল্‌স্‌ লিবারেশন অর্গানাইজেশন অব তামিল ইলাম (পি-এল-ও-টি-ই) ইত্যাদির জাতীয়তাবাদী-বিচ্ছিন্নতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গীর বিরোধীতা করেছিল।

তালিম জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকারীরা ভারতীয় সরকারের মুখাপেক্ষি ছিল সমর্থনের জন্য। ভারতীয় সরকার তাদের অস্ত্রও জোগাড় করে দিচ্ছি, যদিও তা ভারতীয় বুর্জোয়াদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের উদ্দেশ্যে। কিন্তু ১৯৮৭ সালে যখন ভারতীয় সরকার নিজেদের নীতি বদল করল, তখন তামিল জাতীয়তাবাদী আন্দোলন সঙ্কটের সম্মুখিন হলো। ভারতীয় সরকার ভয় পেয়েছিল যে শ্রীলঙ্কার সঙ্কট দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিক্রিয়াশীল জাতি-রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ রূপে ধ্বংস করে ফেলছে। তাই নতুন দিল্লি তামিল বিদ্রোহী গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতা প্রত্যাহার করল।প্রাথমিক ভাবে এল-টি-টি-ই সহ সমস্ত তামিল গোষ্ঠীরা জুলাই ১৯৮৭-র ভারত-শ্রীলঙ্কা ঐক্যকে সমর্থন করেছিল, যেই চুক্তি অনুসারে ভারতীয় সেনাদের আপাতদৃষ্টিতে শান্তিরক্ষী হিসাবে দ্বীপে মোতায়েন করা হয়েছিল। কিন্তু এই সেনা মোতায়েন আদতে করা হয়েছিল পুঁজিবাদী রাষ্ট্র হিসাবে শ্রীলঙ্কার ঐক্য নিশ্চিত করতে।

শ্রমিক শ্রেণীর স্বার্থের জন্য একমাত্র আর-সি-এল ভারত-শ্রীলঙ্কার জোটের বিরোধীতা করেছিল।

আর-সি-এল নেতৃত্বের সঙ্গে নিবিড় আলোচনার পর আই-সি-এফ-আই "শ্রীলঙ্কার অবস্থা এবং রেভলিউশনারি কমিউনিস্ট লিগের রাজনৈতিক কর্তব্য" নামে এক বিস্তারিত বিবৃতি প্রকাশ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে এশিয়া, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলির অভিজ্ঞতার পর্যালোচনার ওপর ভিত্তি করে সেটি ব্যাখ্যা করে যে: "স্থিরভাবে, সাম্রাজ্যবাদীদের দান করা 'স্বাধীনতা' মানে দাঁড়িয়েছে কিছু জারজ রাষ্ট্র, গণতান্ত্রিক আদর্শকে মারাত্মক আপস করে যাদের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে, জাতীয় বুর্জোয়ারা শোষিত জনগণের মুক্তিদাতা হিসাবে নয়, সাম্রাজ্যবাদী লুন্ঠনের ছোট অংশীদার হিসাবে কাজ করেছে। এই ভাবে সৃষ্ট রাষ্ট্র পচন ধরা পুঁজিবাদের কারাগার ছাড়া আর কিছু নয়, যেখানে উৎপাদনশীল বাহিনীর প্রগতিশীল উন্নয়ন অসম্ভব। এমনই পরিস্থিতিতে বুর্জোয়াদের উল্লসিত অনুমোদন সহ সাম্প্রদায়িক হিংসা ও লড়াই শুরু হয়। যতদিন বুর্জোয়া শাসন আছে, ততদিন এই পরিস্থিতির বদল হবে না। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, বার্মা - বলা যায় পৃথিবীর সমস্ত প্রাক্তন ঔপনিবেশিক দেশেরই স্বাধীনতার পরের ইতিহাস প্রমাণ করে যে বুর্জোয়ারা প্রকৃত জাতীয় ঐক্য এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।"

কলম্বোর শুরু করা সাম্প্রদায়িক যুদ্ধের প্রতি আর-সি-এল এর নিরবিচ্ছিন্ন বিরোধীতাকে পনঃপ্রতিষ্ঠিত করা ছাড়াও এই বক্তব্য পরিষ্কার ভাবে ব্যক্ত করে যে একমাত্র সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রামের মাধ্যমেই তামিলদের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায় করা সম্ভব। শ্রীলঙ্কার ও তামিল বুর্জোয়া শ্রেণী এবং তাদের বিরোধী জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে আর-সি-এল তাদের শ্রীলঙ্কা ও তামিল ইলমের সমাজতান্ত্রিক যুক্তরাষ্ট্র গঠনের দাবিকে পেশ করে।

দুঃখজনকভাবে, এটিই শেষ প্রধান বক্তব্য যার ওপর কমরেড কীর্তি বালাসুরিয়া কাজ করেছিলেন। ১৯৮৭-র ডিসেম্বরে করোনারী থ্রম্বোসিসে মাত্র ৩৯ বছর বয়েসে তার মৃত্যুতে শ্রীলঙ্কার এবং আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেণী বিশ্ব সমাজতন্ত্রের এক দারুণ কৌশলী নেতাকে হারালো।

ভারত-শ্রীলঙ্কা জোটের জবাবে আই-সি-এফ-আই ও আর-সি-এল-এর তৈরী করা চিরস্থায়ী বিপ্লবের কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে আর-সি-এল ইউরোপে আশ্রয় নিতে বাধ্য হওয়া কিছু যুব তামিল জঙ্গীদের মধ্যে হস্তক্ষেপ করতে সক্ষম হয়েছিল। যারা সবচেয়ে বেশী ভবিষ্যতদ্রষ্টা, তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে কেবলমাত্র আই-সি-এফ-আই-এর দৃষ্টিভঙ্গী এবং আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থানের ভিত্তিতে তামিলদের ওপর হয়ে চলা অত্যাচার ও শোষণ শেষ করা সম্ভব। এই সমস্ত মানুষ আই-সি-এফ-আই তে যোগ দিয়ে ইউরোপ ও দক্ষিণ এশিয়াতে এই সংস্থার শক্তি বৃদ্ধি করে।

পরবর্তী বছরগুলিতে গৃহযুদ্ধ নতুন করে শুরু করার শর্তাবলী অনুসারে এবং রাষ্ট্র, জে-ভি-পি এবং এল-টি-টি-ই দ্বারা ক্রমাগত করে চলা হিংসাত্মক আক্রমণের মধ্যে আর-সি-এল/এস-ই-পি তাদের সংগ্রামকে আরও জোরদার করে তোলে। কিন্তু ট্রটস্কিপন্থী কার্য্যক্রমের এমন শক্তি ছিল এবং আর-সি-এল এর এমন ঐতিহ্য ছিল যে এমনকি দ্বীপের যে অংশ এল-টি-টি-ই-র দখলে ছিল, সেখানেও তারা তাদের সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পেরেছে। আই-সি-এফ-আই-এর সহযোগিতায় তারা এক আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা অভিযান শুরু করে যার দ্বারা তারা ১৯৯৮-এ চারজন এস-ই-পি সদস্যকে মুক্ত করতে সফল হয়। পার্টির কার্য্যক্রমের জন্য আন্দোলন করায় এই সদস্যদের এল-টি-টি-ই আটক করেছিল। গৃহযুদ্ধ শেষ হয়ে যাবার পর এস-ই-পি আবার মুক্ত রূপে উত্তর দিকে এবং পূর্ব দিকে রাজনৈতিক কাজ শুরু করতে পারল। এর ফলে তারা বুর্জোয়াদের সব দলের এবং তাদের জাতীয়তাবাদী-সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীকে একত্রিত করার সংগ্রামকে আরও বৃহত্তর রূপ দিতে পারল।

অবশেষে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাত ধরে এবং ভারতের সাহায্যে শ্রীলঙ্কার বুর্জোয়ারা এল-টি-টি-ই-কে ধ্বংস করতে পারল এবং ২০০৯ সালে সম্পূর্ণ দ্বীপটিকে তাদের প্রতিক্রিয়াশীল শাসনের মধ্য দিয়ে 'পুনর্বার একত্রিত করতে' পারল।

এস-ই-পি-র ২০১১-র দৃষ্টিভঙ্গীর সঙ্কল্প 'সোশ্যালিস্ট ইকুয়ালিটি পার্টির ঐতিহাসিক ও আন্তর্জাতিক ভিত্তি' তিন দশকের ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক যুদ্ধের পরে শ্রমিক শ্রেণীর সামনে যে কাজগুলি আছে তার মূল্যায়ন তুলে ধরে।

কলম্বো দাবি করে যে যুদ্ধের শেষে 'শান্তি ও সমৃদ্ধি' আসবে। এই দাবিকে প্রতারণাপূর্ণ বলে বুঝতে পেরে আই-সি-এফ-আই সাবধান করে যে শ্রমিক শ্রেণীর বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য বুর্জোয়ারা বিশাল সামরিক ও নিরাপত্তার বস্তু প্রস্তুত রাখছে। তারা জানায়, "যে বিষয়গুলোর জন্য এই দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ হলো, লি-টি-টি-ই-র পরাজয়ে তার কোনোটারই সমাধান হয়নি। তামিলদের বিরুদ্ধে বহু দশক ধরে ঘটে চলা প্রতারণা ও বৈষম্যের ফলে জমা হওয়া দুঃখ ও রাগের বহিঃপ্রকাশ নতুন ভাবে হবেই। অবশ্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক শিক্ষা লাভ করা হয়েছে। এল-টি-টি-ই-র পরাজয় প্রধানত সামরিক পরাজয় ছিল না। এটি ছিল তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীর সহজাত দুর্বলতার ফল। প্রথম থেকেই এল-টি-টি-ই-র লক্ষ্য ছিল ভারত বা অন্যান্য আঞ্চলিক বা বিশ্বের শক্তিদের সমর্থন নিয়ে তামিল বুর্জোয়াদের জন্য তামিল ইলম তৈরী করা। যখন এই একই শক্তিরা তাদের বিরুদ্ধে যাবার সিদ্ধান্ত নিল, তখন 'আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের' কাছে নেতিবাচক স্বরে সামরিক আক্রমণ বন্ধ করার অনুরোধ করা ছাড়া এল-টি-টি-ই-র কাছে আর কোনো পথ রইল না। শ্রমিক শ্রেণীই একমাত্র সামাজিক শক্তি যারা প্রকৃত গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য সমাজে শ্রীলঙ্কার বুর্জোয়াদের এবং তাদের সাম্রাজ্যবাদী পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম শুরু করতে পারে। কিন্তু শুধু মাত্র শ্রেণীর ভিত্তিতে তামিল ও সিঙ্ঘলী, সব ধরণের শ্রমিকদের একত্রিত করার সব ধরণের পদ্ধতির বিরুদ্ধে এল-টি-টি-ই সব সময়ে সাংগঠনিক বিরোধীতা করেছে। সিঙ্ঘলী অসামরিক নাগরিকদের উপর বাছবিচার না করে তাদের আক্রমণ কলম্বোর সরকারের হাত শক্ত করেছে এবং সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে আরও তীব্র করেছে। যে জায়গা গুলো তারা নিজেরা নিয়ন্ত্রণ করে, সেখানেও এল-টি-টি-ই শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও সামাজিক প্রয়োজনগুলিকে পিষে দিয়েছিল।"

আর-সি-এল এবং আই-সি-এফ-আই

গৃহযুদ্ধের ভয়াবহ পরিবেশ এবং শ্রীলঙ্কার প্রবল প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যেও আর-সি-এল/এস-ই-পি যে শ্রমিক শ্রেণীর জন্য একটি বিপ্লবের রেখা প্রকাশ করতে পেরেছে এবং চিরস্থায়ী বিপ্লবের কৌশল সৃষ্টি করতে এবং তা রক্ষা করতে পেরেছে, আই-সি-এফ-আই-এর তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক কাজের প্রতি আর-সি-এল/এস-ই-পি-র অটল অঙ্গীকারের কারণে।

১৯৮৫-৮৬ সালে আই-সি-এফ-আই-এর ভাঙনকে আর-সি-এল এর নেতৃত্ব এবং সদস্যরা সর্বসম্মতিক্রমে সমর্থন জানায়। তাদের সঙ্গে ছিল ব্রিটিশ ওয়ার্কার্স রেভলিউশনারি পার্টী-র (ডাব্লু-আর-পি) জাতীয় শাখার সুবিধাবাদীরা, যারা বহুদিন ধরে ১৯৫০ ও ১৯৬০ এর দশকে আই-সি-এফ-আই এ পাবলোপন্থা আরোপ করতে বহুদিন পাবলোপন্থার সঙ্গে লড়াই করে যে কর্তৃত্ব পেয়েছিল, তা অনেকদিন ধরে কাজে লাগিয়েছে। এর মধ্যে ছিল এল-টি-টি-ই 'তাত্ত্বিক' অ্যান্টন বালাসিঙ্গমের ১৯৭৯ সালে 'তামিল জাতীয় প্রশ্নের বিষয়ে' নামক একটি প্রবন্ধ প্রকাশ এবং প্রচার করতে সহায়তা করা। এই প্রবন্ধ লেনিনকে বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদপন্থী দার্শনিক হিসাবে দেখাতে চেয়েছিল। আমরা আগেই যা ব্যাখ্যা করেছি, "লেনিন যেখানে জোর দিয়েছিলেন যে জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে মার্ক্সবাদীদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয় হলো 'শ্রমিক শ্রেণীর স্ব-সংকল্প', বালাসঙ্গম বলতে চাইলেন যে লেনিন চেয়েছিলেন মার্ক্সবাদীরা তামিল বুর্জোয়াদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আকাঙ্খাকে বিনা প্রশ্নে সমর্থন করুক।" ডাব্লু-আর-পি কি ভাবে চিরস্থায়ী বিপ্লবের পথ ত্যাগ করেছে, সেই নিয়ে আর-সি-এল এর সাধারণ সম্পাদক কীর্তি বালাসুরিয়ার একাধিক প্রবন্ধ আছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল 'ওয়ার্কার্সরেভলিউশনারিপার্টিকিভাবেট্রটস্কিপন্থারসঙ্গেবিশ্বাসঘাতকতাকরল, ১৯৭৩-১৯৮৫'

ডাব্লু-আর-পি দলত্যাগীদের পরাজয়ের মধ্যে দিয়ে ট্রটস্কিপন্থীরা তাদেরই নিজেদের সংস্থা আই-সি-এফ-আই এর ওপর সম্পূর্ণ আয়ত্ত পেল এবং সফল ভাবে শেষ করল তিন দশক ধরে চলা পাবলোপন্থী সুবাধাবাদ, যা নিশ্চিত ভাবে জাতীয় পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেবার সাথে যুক্ত।

আই-সি-এফ-আই যদি আগামী দশকে মৌলিক রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের বিশ্লেষণ করতে চায়, তবে সর্বহারাদের আন্তর্জাতিক সংস্থা আই-সি-এফ-আই-এর আরও শক্তিশালী হওয়া একান্ত প্রয়োজন। এর মধ্যে যা যা পড়ে, তা হলো: পুঁজিবাদী বিশ্বায়ন, যা বিশ্ব অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং পুঁজিবাদের মূল ঐতিহাসিক ভাবে যে জাতি-রাষ্ট্র পদ্ধতিতে গুণগতভাবে নতুন স্তরে প্রথিত, তার মধ্যের অসঙ্গতি তুলে ধরেছে; গর্বাচভের আগমন এবং সোভিয়েতের স্তালীনপন্থী আমলাতন্ত্রের দ্বারা পুঁজিবাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা; এবং পুঁজিবাদের সহযোগী ট্রেড ইউনিয়নদের কর্পোরেট উপদেষ্টায় রূপান্তর, যারা শ্রমিক শ্রেণীর শোষণ আরও বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।

১৯৬৮ - ২০১৮ এবং চিরস্থায়ী বিপ্লবের নজির

কয়েক ডজন মানুষ, যারা আর-সি-এল প্রতিষ্ঠা করেছিল এবং যাদের অধিকাংশের বয়েস ছিল ২৫ বছরের চেয়েও কম, তারা ১৯৬৮ সালে যে অবস্থান গ্রহণ করেছিল, তার সম্পূর্ণ গুরুত্ব বোঝা গেছে গত পাঁচ দশকের নানা ঘটনাবলীর মধ্যে দিয়ে।

যে পার্টি ও সংস্থাগুলির প্রতি ১৯৬৮ সালে শ্রমিক শ্রেণী ও নিপীড়িত জনগণের আনুগত্য ছিল এবং যারা সমাজতন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করে বলে দাবি করেছিল, আর-সি-এল তাদের চ্যালেঞ্জ করায় তাদের ভেক খসে গিয়েছে এবং বোঝা গেছে যে তারা শ্রমিক শ্রেণীর শত্রু এবং সাম্রাজ্যবাদের আনুষাঙ্গিক সংস্থা।

তাদের চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতার মধ্য দিয়ে ক্রেমলিনের স্তালীনপন্থী আমলাতন্ত্র রাশিয়াতে এবং অন্যান্য সোভিয়েত রিপাবলিকে পুঁজিবাদ পুণঃপ্রতিষ্ঠিত করল, যা সম্পূর্ণ হলো ১৯৯১-এর ডিসেম্বরে ইউ-এস-এস-আর ভেঙে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে। একই ভাবে মাও-এর 'এক দেশে সমাজতন্ত্র'-এর সাধনা প্রথমে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে জোটের সৃষ্টি করল যা 'মহান কান্ডারী' নিজেই করেছিলেন ১৯৭২-এ রাষ্ট্রপতি নিক্সনের সঙ্গে বৈঠকের মধ্য দিয়ে, এবং তারপর তার উত্তরসূরীদের হাত ধরে বিশ্ব পুঁজিবাদের প্রধান সস্তার শ্রম উৎপাদন কেন্দ্র হিসাবে চীনের রূপান্তর।

সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক সমাজতন্ত্রী এবং শ্রমিক দলগুলি অনেকদিন আগে তাদের শোধনবাদী কার্য্যক্রম ত্যাগ করে শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের পার্টিতে পরিণত হয়েছে।

গত শতাব্দীর সিকিভাগে বহু বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী সরকার, যারা নিজেদের সমাজতান্ত্রিক বলে পরিচয় দিত, সাম্রাজ্যবাদের সামনে নতজানু হয়েছে। এখন ভারতীয় বুর্জোয়ারা হিন্দুত্ববাদী বিজেপি-কে তাদের সরকার প্রধান দল বানিয়েছে। এর আগে কংগ্রেস পার্টির নেতৃত্বে ভারতবর্ষকে আন্তর্জাতিক পুঁজির জন্য সামান্য দামের কারখানায় পরিণত করার কাজ চলেছে এবং ভারত ও আমেরিকার মধ্যে একটি বিশ্বব্যাপী কৌশলগত জোট তৈরীর চেষ্টা করা হয়েছে।

ভারতীয় স্তালীনপন্থী পার্টিরা, যেমন সি-পি-এম এবং সি-পি-আই কেন্দ্রে পর পর এমন সরকারকে সমর্থন জানিয়েছে যারা নব্য উদার নীতি অনুসরণ করে চলেছে। যে যে রাজ্যে তারা ক্ষমতা পেয়েছে, সেখানেও তারা সেই সমস্ত প্রক্রিয়াই বাস্তবায়িত করেছে যেগুলিকে তারা নিজেরাই 'বিনিয়োগকারীর অনুকূলে পন্থা' বলে অভিহিত করেছে।

এই সমস্ত সংস্থার পচনের কারণ তাদের জাতীয়তাবাদী কার্য্যক্রম ও অবস্থান, যা সমন্বিত বিশ্ব অর্থনীতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অসঙ্গতির সৃষ্টি করে। এর ফলে পুঁজিবাদের শাসনে সাম্রাজ্যবাদী শোষণ এবং যুদ্ধ হয়। কিন্তু নিরপেক্ষ ভাবে দেখলে লাভের জন্য উৎপাদনের প্রক্রিয়া বন্ধ করলে এবং পুঁজিবাদী রাষ্ট্র থেকে মুক্ত করলে তা-ই সমাজতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য্য বিষয়ের সৃষ্টি করেছে।

শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক পটভূমিতেও একই প্রক্রিয়া ঘটেছে।

এস-এফ-এল-পি-র সঙ্গে তাদের বহু দশকের জোটের ফলে এল-এস-এস-প এবং স্তালীনপন্থী সি-পি ফাঁকা খোলসে পরিণত হয়েছে যা রাজাপক্ষ ও কুমারাতুঙ্গাদের মাঝে মধ্যে 'বাম' ছাপ নিতে সাহায্য করে।

ভারত-শ্রীলঙ্কার ঐক্য ভাঙতে সিংহলী অভিজাতদের সাহায্য করতে জে-ভি-পি দুর্বৃত্ত রাষ্ট্রপতি প্রেমদাসার সঙ্গে সহযোগীতা করে। এই সময় তারা আর-সি-এল এবং অন্যান্য বামপন্থী দল এবং ট্রেড ইউনিয়নের ওপর ফ্যাসিবাদী আক্রমণ শানায়। এর পর জে-ভি-পি-র ওপর একের পর এক ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় দমন নেমে আসে। এর কিছু পরের অবশ্য তারা বুর্জোয়া রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে নিজেদের মানিয়ে নেয়।

তামিল ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স, যারা এল-টি-টি-ই-র মুখপাত্র হিসাবে কাজ করত এবং ওয়াশিংটনের সমর্থন চেয়ে বেড়ায় এবং তামিল মানুষদের বিরুদ্ধে কলম্বো যা অপরাধ করেছে, তা সানন্দে মুছে ফেলতে চায়।

রাজাপক্ষ চীনের অত্যন্ত কাছের ছিল বলে মনে করা হচ্ছিল। তাই ২০১৫-র রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে রাজাপক্ষকে প্রতিস্থাপন করতে তাড়াতাড়ি 'সর্বসম্মত বিরোধী' প্রার্থী মনোনীত করার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের হস্তক্ষেপ ছদ্ম-বামদের মধ্যে সবচেয়ে নির্লজ্জ ভাবে সমর্থন করেছিল নব সম সমাজ পার্টি (এন-এস-এস-পি)। সিরিসেনাকে রাষ্ট্রপতি হিসাবে নির্বাচিত করা এবং বিক্রমাসিঙ্গেকে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নিযুক্ত করাকে এন-এস-এস-পি 'গণতান্ত্রিক বিপ্লব' হিসাবে অভিহিত করেছিল। অথচ সিরিসেনা রাজাপক্ষের এক দৃঢ় সমর্থক ছিল এবং বিক্রমাসিঙ্গে ইউ-এন-পি-র প্রধান, যারা সাম্প্রদায়িক লড়াই শুরু করেছিল। স্বাভাবিক ভাবেই, পাবলোপন্থী আন্তর্জাতিক, যারা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী কার্য্যকলাপকে সরাসরি সমর্থন করেছে, তাদের শ্রীলঙ্কার প্রতিনিধি হল এন-এস-এস-পি।

ইতিমধ্যে পুঁজিবাদ-বিরোধী সংগ্রাম আরো প্রয়োজনীয় হয়ে উঠছে।

সামাজিক বৈষম্য প্রবল হয়ে উঠেছে। মাত্র আটজন সবচেয়ে ধনী কোটিপতির সম্পত্তি বিশ্বের দরিদ্র জনসংখ্যার অর্ধেকের সম্পত্তির চেয়ে বেশী।

বিশ্বব্যাপী আর্থিক মন্দার পরে দশ বছর কেটে গেছে। বিশ্ব পুঁজিবাদ এখনো এক ঐতিহাসিক ভাঙনের মধ্যে ডুবে রয়েছে। এর থেকে মুক্তি পেতে জাতীয়তাবাদী প্রতিদ্বন্দ্বী বুর্জোয়া দলগুলির রাস্তা হলো শ্রমিক শ্রেণীর ঘাম আরও ঝরিয়ে লভ্যাংশ বৃদ্ধি করা এবং আরও আক্রমণাত্মক ভাবে তাদের স্বার্থসিদ্ধি করতে বিশ্ব জুড়ে ভৌগলিক কৌশল, বাণিজ্য এবং যুদ্ধ শুরু করানো।

গত শতাব্দীর সিকিভাগ ধরে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তাদের আপেক্ষিক অর্থনৈতিক শক্তির ক্ষয় রোধ করতে মধ্যপ্রাচ্যে, বলকান ও মধ্য এশিয়াতে একের পর এক অন্যায় ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ করেছে। এখন ওয়াশিংটন 'ক্ষমতার প্রবল প্রতিযোগিতা'র এই নতুন যুগের ঘোষণা করছে এবং পদ্ধতিগত ভাবে পরমাণু-শক্তি সম্পন্ন রাশিয়া ও চীনের ওপর সামরিক কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করছে। জার্মানির নেতৃত্বে অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী ও প্রবল শক্তিমান দেশগুলি এই বিষয়টি খেয়াল করেছে এবং নতুন করে অস্ত্রসাজে সজ্জিত হচ্ছে।

এর ধ্বংসকারী প্রভাব পড়বে দক্ষিণ এশিয়া এবং ভারত মহাসাগর অঞ্চলে। বাজার ও লাভের দৌড়ে এগিয়ে থাকতে মরিয়া হয়ে ভারতীয় বুর্জোয়ারা ওয়াশিংটনের আরও কাছাকাছি চলে গিয়েছে। এর ফলে চীনের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক ও কৌশলগত আক্রমণের একদম সামনের সারির রাষ্ট্র হয়ে উঠেছে ভারত। শ্রীলঙ্কা এবং ক্ষুদ্র দেশ মালদ্বীপ থেকে শুরু করে ভারত বা তার চিরশত্রু পাকিস্তান - দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশের রাজনীতি ও শ্রেণী সম্পর্কে ভাঙন ধরছে কারণ এই অঞ্চল সাম্রাজ্যবাদ এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বের কেন্দ্রীয় স্থল হয়ে উঠছে।

ভারতের ১২০ জন ধনকুবের ভারতের 'উত্থান' উদযাপন করতে মোদির সঙ্গে যোগ দিলেও, দেশের ১৩০ কোটি জনগণ দৈনিক মাত্র ২ ডলার বা তার চেয়ে কম টাকায় এক চরম দুর্দশাপূর্ণ জীবনযাপন করে।\

চিরস্থায়ী বিপ্লবই এখন শ্রমিক শ্রেণীর একমাত্র পথ। সমাজতান্ত্রিক রূপে বিশ্বকে পুণর্বিন্যাস করতে বিশ্ব জুড়ে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর যে আক্রমণাত্মক সংগ্রাম, তাকে একত্রিত করতে হবে। এটাই এখন এস্‌-ই-পি এবং আই-সি-এফ্‌-আই-এর কার্য্যক্রম।

যেহেতু এই কার্য্যক্রম শ্রমিক শ্রেণীর প্রয়োজনে স্থাপিত, গত তিন দশক ধরে আই-সি-এফ্‌-আই অনেক শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

আমলাতান্ত্রিক দেশভিত্তিক শ্রমিক সংস্থাগুলির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ভাঙন যে শ্রেণী সংক্রান্ত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছিল, তা বুঝতে পেরে আই-সি-এফ্‌-আই ১৯৯৫-৯৬ সাল নাগাদ তার শাখাগুলিকে পুরোনো সংস্থাগুলির বিশ্বাসঘাতকতা প্রকাশ করার সংস্থা থেকে সোশ্যালিস্ট ইকুয়ালিটি পার্টিতে পরিণত করে। এর ফলে তারা শ্রমিক শ্রেণীর সংগ্রামে সরাসরি নেতৃত্ব দেবার দায়িত্ব গ্রহণ করে।

বছর দুয়েক পরে, আই-সি-এফ্‌-আই ওয়ার্ল্ড সোশ্যালিস্ট ওয়েবসাইটের প্রতিষ্ঠা করে। এই ওয়েবসাইটটি বিশ্বের প্রথম এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় সমাজতান্ত্রিক ওয়েবসাইট। ওয়ার্ল্ড সোশ্যালিস্ট ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আই-সি-এফ্‌-আই বিশ্বের শ্রমিক শ্রেণীর কাছে ইংরাজি, সিংহলী, তামিল এবং অন্যান্য ভাষায় শ্রেণী সংগ্রাম, বিশ্ব রাজনীতি এবং ভৌগলিক রাজনীতিতে ঘটে চলা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলির দৈনিক বিশ্লেষণ পৌঁছে দেয়, যাতে শ্রেণীগত প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এছাড়াও, আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেণীর সংগ্রাম গঠন করতে সর্বোচ্চ সচেতন অভিব্যক্তি হিসাবে ওয়ার্ল্ড সোশ্যালিস্ট ওয়েবসাইট আই-সি-এফ্‌-আই-এর কাজকে সংহত এবং একত্রিত করে, যাতে সংগ্রাম অতি অবশ্যই দেশ ও মহাদেশের সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে।

বৈপ্লবিক সংগ্রামের নতুন যুগ

চিরস্থায়ী বিপ্লবের কার্য্যক্রম তৈরী করার আই-সি-এফ্‌-এই-এর যে সংগ্রাম, তা এখন শ্রমিক শ্রেণীর ক্রমবর্দ্ধমান আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। ট্রেড ইউনিয়ন, স্তালীনপন্থী দলগুলি এবং সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক বা সামাজিক গণতান্ত্রিক দলগুলি বহু দশক ধরে কৃত্রিম ভাবে শ্রেণী সংগ্রাম দমন করার পর, অবশেষে শ্রমিক শ্রেণী তাদের শ্রেণীস্বার্থ পুণর্ব্যক্ত করতে শুরু করেছে। আমেরিকা, ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে ২০১৮-তে একের পর এক সংগ্রামী ধর্মঘটের ঢেউ আছড়ে পড়েছে।

ভারতে মোদি সরকার এবং ভারতীয় শাসক শ্রেণী সামাজিক বারুদের স্তুপের ওপরে বসে আছে। গত মাসে তামিলনাড়ুর টুটিকোরিনে, যেখানে সাধারণ মানুষ এক ভারতীয় কোটিপতির মালিকানার তামার কারখানা পরিবেশকে দূষিত করছিল বলে প্রতিবাদ করায় শ্রমিকদের যে গণহত্যা করা হল, তা এটাই প্রমাণ করে। শ্রীলঙ্কায় শ্রমিক, যুব এবং কৃষকরা সরকারের নিষ্ঠুর নীতি এবং আই-এম-এফ্‌-এর তত্ত্বাবধানে পাইকারি হারে মালিকানার ব্যক্তিগতকরণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ঘোষণা করছে।

আর-সি-এল এবং আই-সি-এফ্‌-আই-এর কাজ হলো শ্রমিক শ্রেণীকে সচেতন করা যে সামাজিক অসাম্য, দারিদ্র, গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর শাসক শ্রেণীর আঘাত এবং যুদ্ধ - এই সব কিছুর বিরুদ্ধাচরণই শ্রমিকদের শক্তির জন্য সংগ্রাম। তাঁর 'কি করতে হবে?'-তে (What Is To Be Done?) লেনিন বলেছেন এর জন্য শ্রমিক শ্রেণীর প্রতিনিধিদের সমাজতান্ত্রিক চেতনায় জারিত হতে হবে।

এই লক্ষ্য নিয়ে এবং সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে শ্রমিক শ্রেণীর যে বৈপ্লবিক দল প্রয়োজন তা গড়ে তোলার উদ্দ্যেশে এস্‌-ই-পি তাদের সংগ্রামের পঞ্চাশ বছরে পদার্পণ পালন করবে বহু সভা সমাবেশ, বৃক্ততা, WSWS-এ নিবন্ধ এবং পার্টির নেতাদের সাক্ষাতকারের মধ্যে দিয়ে। এই কার্য্যক্রমগুলি পার্টির ইতিহাসের পর্যালোচনা করবে এবং প্রধান প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে এক কার্য্যক্রম ও দৃষ্টিভঙ্গীর কথা বলবে যা শ্রমিক শ্রেণীর বস্তুবাদী বৈপ্লবিক স্বার্থের কথা বলবে।

এই কার্য্যক্রম ট্রটস্কির নেতৃত্বে ১৯৩৮-র চতুর্থ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠিত হবার ৮০তম বার্ষিকী উদযাপন করতে আই-সি-এফ্‌-আই যে কার্য্যক্রম নিয়েছে, তার সঙ্গেই পালিত হবে।