সামাজিক বিপর্যয় ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে লড়াই করতে ভারতীয় শ্রমিকদের প্রয়োজন এক বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক কার্য্যক্রম

By -দীপাল জয়েশেখেরা ও কিথ জোনস্‌
৮ জানুয়ারী ২০১৯

সামাজিক বিপর্যয় এবং "বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে" বিজেপি সরকারের করা অর্থনৈতিক পন্থার - অর্থাৎ বর্বর নিষ্ঠুরতা, বেসরকারিকরণ, নিরাপত্তাহীন চুক্তি অনুযায়ী কাজের প্রচার, পরিবেশ বিধি ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার নিয়ম না মানা, বড় ব্যবসা ও ধনীদের জন্য কর-এ প্রবল ছাড় দেওয়া এবং শ্রমিক ও গ্রামের গরীব মানুষদের কর-এ ব্যাপক বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আগামী মঙ্গলবার ও বুধবার হাজার হাজার শ্রমিক ও যুব সারা ভারত ব্যাপী ৪৮ ঘন্টার ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করবে।

বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে শ্রমিকরা যে অর্থনৈতিক ত্যাগ স্বীকার করছে এবং প্রতিহিংসার, এমনকি চাকরি হারানোর ভয়ও করছে না, তাকে ওয়ার্ল্ড সোশ্যালিস্ট ওয়েবসাইট স্বাগত জানায়।

শ্রেণী সংঘাত তীব্র করে শ্রমিক শ্রেণীর ওপর আঘাত হানতে এবং ভারতীয় বুর্জোয়াদের প্রবল ক্ষমতার উচ্চাকাঙ্খাকে সফল করতে আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠার জন্য অনিল ও মুকেশ আম্বানি, গৌতম আদানি এবং অন্যান্য কোটিপতির গোষ্ঠীরা নরেন্দ্র মোদি এবং তার হিন্দু আধিপত্ববাদী বিজেপিকে ক্ষমতায় নিয়ে এসেছে। এবং তার পরে তারা সেই কাজই করেছে। যে সাড়ে চার বছর এই বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আছে, সেই সময়ে তারা সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াতে ইন্ধন জুগিয়েছে, সব ইলেকট্রনিক যোগাযোগ ও তথ্যে চোখ রাখার অধিকার সহ রাষ্ট্রের সমস্ত দমন নীতিকে আরও জোরদার করে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে ভারতের সামরিক-কৌশলগত জোটকে আরও বিস্তৃত করেছে এবং ভারতকে বিশ্ব পুঁজিবাদের কাছে সস্তা শ্রম পাওয়ার প্রধান স্থান বানাতে শাসক শ্রেণী যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, তাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।

কিন্তু শ্রমিকদের সতর্ক থাকার প্রয়োজন।

জানুয়ারির ৮ ও ৯ তারিখের প্রতিবাদ ধর্মঘটে যে ট্রেড ইউনিয়ন ও রাজনৈতিক দলগুলি নেতৃত্ব দিচ্ছে, তারা ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে যুক্ত এবং ভারতীয় পুঁজিবাদী অভিজাতদের "বাজার-মুখী" লক্ষ্যকে গত পঁচিশ বছরের চেয়েও বেশী সময় ধরে কার্য্যকর করতে ও তার কাছে বিরোধী শক্তিকে মাথা নোয়াতে এক প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।

এই অভিযোগ কেবলমাত্র বড় ব্যবসার দল কংগ্রেস পার্টির প্রতিনিধি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (আই-এন-টি-ইউ-সি) অথবা কংগ্রেসের অন্যতম মিত্র এবং তামিলনাড়ুর দুই প্রধান বুর্জোয়া দলের অন্যতম ডি-এম-কে-র ট্রেড ইউনিয়ন শাখা লেবার প্রোগ্রেসিভ ফ্রন্ট (এল-পি-এফ)-এর ক্ষেত্রেই যে খাটে তা নয়। দুই প্রধান স্তালীনপন্থী সাংসদীয় দল, কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (মার্ক্সসিস্ট) বা সি-পি-এম, এবং কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া বা সি-পি-আই এর ট্রেড ইউনিয়ন শাখা, যথাক্রমে সেন্টার অফ ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়নস (সিটু) এবং অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (এ-আই-টি-ইউ-সি)-র ক্ষেত্রেও এই অভিযোগ সম্পূর্ণ সত্য।

স্তালীনপন্থীদের এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলির জানুয়ারি ৮ ও ৯ এর এই কার্য্যক্রমকে "সাধারণ ধর্মঘট" বলে প্রচার করা হলো এক প্রবল রাজনৈতিক প্রতারণা।

সাধারণ ধর্মঘটকে চিরকালই গত শতাব্দীর শুরুর দিকে রুশ শ্রমিক শ্রেণীর বৈপ্লবিক লড়াইয়ের অনুষঙ্গ হিসাবে দেখা হবে, যা সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক আন্দোলন গড়ে ওঠার মধ্যে দিয়ে শ্রমিক শ্রেণীকে এক স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে স্থান করে দিয়েছিল এবং যা তার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছেছিল লেনিন ও ট্রটস্কির বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বে শ্রমিকদের ক্ষমতা জয় করার মধ্য দিয়ে।

কিন্তু শ্রমিক শ্রেণীর স্বাধীন রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্য লড়াই না করে স্তালীনপন্থীরা এবং তাদের শাখা ইউনিয়নগুলি তাকে ধ্বংস করতে চাইছে।

এপিল-মে-র সাধারণ নির্বাচনে এক অন্য দক্ষিণপন্থী সরকারকে ক্ষমতায় আনতে ভারতীয় শাসক শ্রেণীর এক অংশ যে চেষ্টা করছে, সেই চেষ্টাকেই প্রাধান্য দিয়ে শ্রমিক শ্রেণী ও গ্রামীন দরিদ্রদের ক্রমবর্দ্ধমান জঙ্গী মনোভাবাপন্ন বিরোধীতাকে দমন করাই স্তালীনপন্থীদের লক্ষ্য।

২০১৯ এর নির্বাচনকে সি-পি-এম "সামনের বড় লড়াই" বলে অভিহিত করছে এবং তাদের সব প্রচেষ্টাই "এক বিকল্প সরকার" তৈরী করার জন্য ভোট টানার লক্ষ্যে করা হচ্ছে। অর্থাৎ নতুন দিল্লিতে বিজেপি-বিহীন এক বড় ব্যবসার সরকার স্থাপন করা। স্তালীনপন্থীদের জন্য ২০১৯ এর নির্বাচনের তুলনায় অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ এই ধর্মঘট।

সেই সরকার ১৯৮৯ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত পর পর সংসদে ক্ষমতায় আসা "ধর্মনিরপেক্ষ" সরকারেরই মতন হবে, যে সমস্ত সরকারের অধিকাংশেরই নেতৃত্বে ছিল কংগ্রেস পার্টি এবং যাদের সমর্থন করেছিল সি-পি-এম এবং তাদের বামফ্রন্ট। এই সমস্ত সরকার ওয়াশিংটনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রেখে চলেছে এবং নিশ্চিত ভাবে বুর্জোয়াদের সামাজিক হিংসা ও নব্য-উদারনীতি বাস্তবায়িত করেছে।

আজ, ২০০৮-এর অর্থনৈতিক মন্দার এক দশক পরে, বিশ্ব পুঁজিবাদ সমগ্রভাবে ধ্বংসের মুখোমুখি। সুতরাং, পরের সরকারকে ভারতীয় ও বিশ্ব পুঁজির কার্য্যাবলি আরও কঠোর ভাবে প্রণয়ন করতে হবে। পরের সরকার যা-ই হোক না কেন, বিজেপির হোক, কংগ্রেসের নেতৃত্বে স্তালীনপন্থীদের দ্বারা সমর্থিত "ধর্মনিরপেক্ষ" জোটো হোক, অথবা আঞ্চলিক ও বর্ণভিত্তিক দলের "তৃতীয় ফ্রন্ট" হোক, পরের সরকারকে বিদেশী লগ্নি টানতে এবং বিদেশের বাজার দখল করতে আরও তীব্র ভাবে ভারতের শ্রমিক ও দরিদ্রদের শোষণ করতে হবে।

স্তালীনপন্থীরা কংগ্রেসের অন্যতম মিত্র হওয়ায় তারা কংগ্রেসের জন্য প্রচার করেছিল। এর ফলে কংগ্রেসে, যারা প্রথাগত ভাবে বুর্জোয়াদের পছন্দের শাসক দল, বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শ্রমিক শ্রেণীর প্রধান মিত্র হিসাবে তাদের লভ্যাংশ গুনছে। আই-এন-টি-ইউ-সি-র সভাপতি ও প্রাক্তন কংগ্রেস মন্ত্রী জি.সঞ্জীবা রেড্ডি "সাধারণ ধর্মঘট"-কে নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করছে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীকে শ্রমিক শ্রেণীর "বন্ধু" হিসাবে এবং "প্রগতিশীল সরকার"-এর ভবিষ্যত প্রধান হিসাবে দেখাতে।

যে মারুতি সুজুকি কর্মচারীদের ফাঁসানো হয়েছে, তাদের হয়ে কথা বলতে সি-পি-এম এবং ট্রেড ইউনিয়নগুলি কেন রাজি নয়?

যে ১৩ জন মারুতি সুজুকি কর্মচারীদের খুনের দায়ে ফাঁসিয়ে যাবজ্জীবন কারদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছে, স্তালীনপন্থীরা এবং সব ট্রেড ইউনিয়নগুলি তাদের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তির দাবি তো করেই না, এমনকি তাদের রক্ষা করতেও সম্মত নয়। এর থেকেই শ্রেণী সংগ্রামের প্রতি স্তালীনপন্থীদের এবং সব ট্রেড ইউনিয়নগুলির আসল মনোভাব প্রতিভাত হয়। মারুতি সুজুকির এই কর্মচারীদের একমাত্র "অপরাধ" ছিল যে ভারতের নতুন বিশ্বায়িত উৎপাদন শিল্পের সঙ্গে সংযুক্ত শিল্পে যে ভয়াবহ ও সস্তা দামের কাজের পরিবেশ, তারা তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। তবুও ১৯ শতকের দক্ষিণ ভারতের পারিয়াদের সঙ্গে যেমন ব্যবহার করা হত, স্তালীনপন্থীরা এই বন্দী মারুতি সুজুকি কর্মীদের সঙ্গে তেমন ব্যবহার করছে, যখন নিয়োগকারীরা বিরোধীদের কন্ঠরোধ করতে ক্রমাগত "মারুতি সুজুকির মতন অবস্থা" করার ভয় দেখাচ্ছে।

স্তালীনপন্থীরা মারুতি সুজুকি কর্মীদের এড়িয়ে চলছে, কারণ তারা এই কর্মীদের জঙ্গী মনোভাবের উদাহরণকে ভয় পায়, এবং তার চেয়েও বড় কথা, কারণ তারা ভাবছে যে মারুতি সুজুকির কর্মীদের বাঁচানোর সঙ্গে সামান্য মাইনে ও অনিশ্চিত কর্মসংস্থানের লড়াইকে যুক্ত করলে কংগ্রেস পার্টির সঙ্গে তাদের বন্ধুত্ব ভেঙে যাবে এবং বড় ব্যবসার সঙ্গে তাদের ইউনিয়নগুলির যে আরামদায়ক ও কর্পোরেটের মতো সম্পর্ক আছে, তা নষ্ট হয়ে যাবে।

শ্রমিক শ্রেণীর এখন প্রয়োজন অবিলম্বে স্তালীনপন্থী দলগুলির এবং ট্রেড ইউনিয়নগুলির ভূমিকার সমালোচনামূলক হিসাব কষা এবং এক নতুন নীতি নির্ধারণ করা - যে নীতি বুর্জোয়াদের সব অংশের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর হয়ে স্বাধীন রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু করবে এবং তার ওপর ভর করেই গ্রাম্য জনগণকে এবং সব শোষিতদের নিয়ে শ্রমিক ও কৃষকের সরকার গঠন করবে এবং সমাজকে নতুন ভাবে সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংগঠিত করবে।

গত তিন দশক ধরে তারা যেমন করেছে, স্তালীনপন্থীরা এখনও ভারতীয় পুঁজিবাদকে দায়ী করে শ্রমিক শ্রেণীকে ভারতীয় গণতন্ত্রের প্রতিক্রিয়া ও ভয়াবহতাকে আলিঙ্গন করা থেকে সতর্ক না করে বিজেপি ও তার হিন্দুত্ববাদী দক্ষিণপন্থী মিত্রদের অপরাধের দিকে আঙুল তুলছে। এবং কংগ্রেস এবং তার একাধিক দক্ষিণপন্থী, জাতিভিত্তিক ও আঞ্চলিক মিত্রদের অধীনে শ্রমিক শ্রেণীকে ক্রমাগত রাখার পর আত্মপক্ষ সমর্থনের কাজে বিজেপি ও তার মিত্রদের অপরাধগুলিকে দেখাচ্ছে।

২০১৯ এর নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই স্তালীনপন্থীরা কলরব করছে যে শ্রমিক শ্রেণীর উচিত "গণতন্ত্র বাঁচাতে" এবং "সংবিধান রক্ষা করতে" একটি বড় ব্যবসার, অ-বিজেপি সরকারকে সমর্থন করা।

এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে বিজেপি শ্রমিক শ্রেণীর এক জঘন্য শত্রু। কিন্তু ভারতীয় শ্রমিকরা প্রতিক্রিয়াকে হারাতে পারবে, এবং গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করতে পারবে এমন বুর্জোয়াদের দলের হাত ধরে এবং ভারত রাষ্ট্রের এমন বিকৃত "গণতান্ত্রিক" প্রতিষ্ঠানের ওপর বিশ্বাস করে, যে প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে হিংসাত্মক রূপে শ্রমিক সংগ্রামকে দমন করে এবং একের পর এক সাম্প্রদায়িক অপরাধ চাপা দেওয়ার ষড়যন্ত্রে যোগ দিয়েছে - এমন দাবি আরেকটি বিরাট মিথ্যা।

যদি হিন্দুত্ববাদীরা এমন ভয়াবহ আকার ধারণ করে থাকে, তার জন্য স্তালীনপন্থীরা এবং তাদের নেওয়া নীতিই অপরাধী। তারা শ্রেণী সংগ্রামকে পদ্ধতিগত ভাবে দমন করেছে; তারা নিজেরা যাকে "বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে" নেওয়া নীতি বলে, নিজেরা যে রাজ্যে তারা ক্ষমতায় ছিল, যেমন পশ্চিমবঙ্গ, সেখানে তারা সেই নীতিই বাস্তবায়িত করতে গেছে; এবং হিন্দুত্ববাদীদের বিরোধীতা করার নামে তারা শ্রমিক শ্রেণীকে কংগ্রেস এবং অন্যান্য বুর্জোয়া দলের অধীনে রেখেছে - এর ফলে প্রতিক্রিয়াশীলতা বেড়ে ওঠার মতন জমি তৈরী হয়েছে।

যেহেতু সামাজিক সংকটে শ্রমিক শ্রেণীকে তাদের নিজেদের সমাজতান্ত্রিক সমাধান করা থেকে বাধা দেওয়া হয়েছে, তাই স্তালীনপন্থীদের সমর্থিত বিভিন্ন "ধর্মনিরপেক্ষ" সরকারদের নয়া-উদারবাদী নীতির ধ্বংসাত্মক প্রভাবের ফলে যে জনরোষ জন্ম নিয়েছিল, বিজেপি তাকেই নেতৃত্ব দিয়ে কাজে লাগাতে পেরেছে।

পুঁজিবাদী সংকট এবং বুর্জোয়া গণতন্ত্রের পতন

সারা বিশ্বে ঘটে চলা ঘটনার ভারতীয় সংস্করণ হলো মোদি সরকার। বিশ্ব পুঁজিবাদ, যা ১৯৩০ এর পরের তীব্রতম সংকটে ডুবে আছে, প্রতিক্রিয়াশীলতা উদ্গিরণ করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি আবার নিজেদের সামরিক অস্ত্রে সজ্জিত করে তুলছে। সব জায়গায় অভিজাত শাসক শ্রেণী জাতীয়-জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে ইন্ধন জুগিয়ে এবং স্বৈরাচারী শাসনের দিকে ঝুঁকে পড়ে দক্ষিণপন্থার দিকে এগিয়ে চলেছে। কেবলমাত্র ফ্যাসিবাদী মনোভাবাপন্ন ট্রাম্প নয়, ইতালিতে অতি-দক্ষিণপন্থী লেগা, জার্মানির সাংসদে সরকারি বিরোধী দল এ-এফ-ডি, এবং ব্রাজিলে অতি-দক্ষিণপন্থী, সামরিক-সমর্থক রাষ্ট্রপতি জায়ের বলসোনারো - সকলেরই আদর্শ বিচ্ছিন্নতাবাদী বুর্জোয়া গণতন্ত্র। উদারনীতির প্রকাশ্য সমর্থকদের আদর্শও তাই।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিরোধী শক্তির, প্রধানত যুদ্ধবিরোধী ও সমাজতান্ত্রিক, মতবাদের প্রচার বন্ধ করার জন্য ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ইন্টারনেটের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনার জন্য এক অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছে। এবং ডেমোক্র্যাটরা সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলির সঙ্গে ষড়যন্ত্র করছে প্রাসাদ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ট্রাম্পকে অপসারিত করতে, কারণ তারা চায় ওয়াশিংটন রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও যুদ্ধবাদী নীতি অনুসরণ করুক। ফরাসি রাষ্ট্রপতি ইম্যানুয়েল ম্যাকরণ "জরুরি অবস্থা", "সন্ত্রাসবিরোধী" শক্তি ইত্যাদিকে নিয়মমাফিক বিষয় করে তুলে সেগুলিকে কাজী লাগিয়েছে শ্রমিকদের সামাজিক অধিকারের ওপর প্রবল আক্রমণ করতে।

গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করার এবং প্রতিক্রিয়াশীলতাকে পরাজিত করবার একমাত্র টেঁকসই উপায় রয়েছে আন্তর্জাতিক শ্রেণী সংগ্রাম এবং জরাজীর্ণ পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক আন্দোলন গঠন করার মধ্যেই।

২০১৮-তে শ্রমিক শ্রেণী সি-পি-এম এবং আই-এন-টি-ইউ-সি-র আন্তর্জাতিক প্রতিরূপ, পুঁজিবাদপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন এবং সামাজিক-গণতান্ত্রিক দলগুলি এবং গ্রীসের সিরিজার মতন ছদ্ম-বাম দলগুলির তৈরী করা শৃঙ্খল ভেঙে সংগ্রাম করতে শুরু করেছে। বিশ্ব জুড়ে শ্রমিক শ্রেণী যে প্রাতিষ্ঠানিক "বাম" দলগুলি ও ইউনিয়নের বাইরে নতুন দল সৃষ্টি করছে এবং ওই দলগুলির প্রকাশ্য বিরোধীতা করছে, ফ্রান্সের ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন, যা পুঁজিবাদী নির্মমতা ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিশ্ব জুড়ে শ্রমিক শ্রেণীর ক্রমবর্দ্ধমান আন্দোলনের অন্যতম উদাহরণ।

তাদের শ্রেণী স্বার্থের কথা বলার অন্য ভারতের শ্রমিকদের প্রয়োজন এক নতুন সংগ্রামী দলের, যারা স্তালীনপন্থী দলগুলি এবং তাদের ইউনিয়নের সবকিছুর থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আছে। ভারতের শ্রমিকদের উচিত শ্রীলঙ্কার অ্যাবটস্লে চা বাগানের শ্রমিকদের উদাহরণ অনুশীলন করা, যারা মালিকের হয়ে ইউনিয়ন যে আক্রমণ করছিল, তার উত্তরে নিজেদের মৌলিক অধিকারের সংগ্রামে সাধারণ কর্মীদের এক কর্ম কমিটি গঠন করে।

সর্বোপরি, শ্রমিক শ্রেণীর প্রয়োজন একটি বিপ্লবী দল যারা শ্রমিকদের ক্ষমতা নেওয়ার লড়াইয়ে নেতৃত্ব প্রদান করবে এবং এক আন্তর্জাতিক ভিত্তিতে তাদের সংগ্রামের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখবে। সেই রকমই দল হলো চতুর্থ আন্তর্জাতিক এবং তাদের জাতীয় বিভাগগুলি, যার মধ্যে দক্ষিণ এশিয়াতে আছে সোশ্যালিস্ট ইকুয়ালিটি পার্টি (শ্রীলঙ্কা)।

১৯৩৮-র লিও ট্রটস্কি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত চতুর্থ আন্তর্জাতিক, সাম্রাজ্যবাদ এবং তার সমস্ত প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে, এবং সর্বোপরি সোভিয়েত স্তালীনপন্থী আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্রের কার্য্যক্রম রক্ষা করেছে এবং তৈরী করেছে। এই সোভিয়েত স্তালীনপন্থী আমলাতন্ত্র, যারা সি-পি-এম ও সি-পি-আই-এর ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারকারী, "এক দেশে সমাজতন্ত্র"-এর জাতীয়তাবাদী পতাকার তলায় ১৯১৭-র রুশ বিপ্লবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এবং অবশেষে প্রাক্তন সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ায় পুঁজিবাদ পুণঃপ্রতিষ্ঠিত করেছে। আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেণীর সমস্ত সংগ্রাম, গত শতাব্দীতে এবং একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশকে তাদের সমস্ত জয় ও পরাজয়, থেকে পাওয়া কৌশলগত শিক্ষার প্রতিরূপ হলো চতুর্থ আন্তর্জাতিক, ১৯৫৩ সাল থেকে যার নেতৃত্বে রয়েছে চতুর্থ আন্তর্জাতিকের ইন্টারন্যাশনাল কমিটি (আই-সি-এফ-আই)।

শ্রমিক ও যুবরা: সামাজিক বৈষম্য, পুঁজিবাদী প্রতিক্রিয়াশীলতা এবং যুদ্ধের বিরোধীতা করুন। আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম শুরু করুন। আই-সি-এফ-আই-এর ভারতীয় শাখা গড়ে তুলুন।