চতুর্থ ইন্টারন্যাশনাল-এর ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন উপলক্ষ্যে আয়োজিত কলকাতার সভার প্রচার করছেন ভারতীয় ট্রটস্কিপন্থীরা

অরুণ কুমার এবং ঋত্বিক মিত্র
২৬ জানুয়ারী ২০১৯

চতুর্থ ইন্টারন্যাশনালের ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত আগামী ১০ই মার্চের জনসভাকে সফল করার জন্য চতুর্থ ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক কমিটি (আই-সি-এফ-আই)-এর ভারতীয় সমর্থকরা পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে প্রচার চালাচ্ছেন।

গত ১৮ই নভেম্বর ভারতীয় ট্রটস্কিপন্থীরা চেন্নাইতে এমনই একটি সভা করেছিল। সেই সভাতে বক্তব্য রেখেছিলেন সোশ্যালিস্ট ইকুয়ালিটি পার্টি (শ্রীলঙ্কা)-র সহকারি জাতীয় সম্পাদক দীপাল জয়শেখরা। কলকাতার সভাতেও বিশ্বের ট্রটস্কিপন্থী আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা আই-সি-এফ-আই-এর শ্রীলঙ্কার শাখা, সোশ্যালিস্ট ইকুয়ালিটি পার্টি-র কোনো একজন নেতা বক্তব্য রাখবেন।

সুমন

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র সুমন আই-সি-এফ-আই সমর্থকদের বলেন, "এই পার্টি যা করছে, আমি তার সবই সমর্থন করি"। সুমন আরও বলেন, "সমাজতন্ত্রের জন্য আন্দোলন আন্তর্জাতিক স্তরেই হওয়া উচিত। নয়তো তা সোভিয়েত ইউনিয়নের মতই ভেঙে পড়বে।"

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও অন্যান্য ছাত্রছাত্রীদের মতন সুমনও এমনই মতের সঙ্গে একতা পোষণ করেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের যে প্রস্তুতি হচ্ছে এবং মোদি সরকার নির্মম ভাবে ভারতীয় শ্রমিক ও গ্রামীণ দরিদ্র মানুষকে যে আক্রমণ করছে - এই দুইয়েরই মোকাবিলা করার জন্য শ্রমিক শ্রেণীর নিজস্ব আন্তর্জাতিক বিপ্লবী দলের আশু প্রয়োজন।

স্তালীনপন্থী ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) বা সি-পি-এম সহ ভারতবর্ষের অন্যান্য সব রাজনৈতিক দলের প্রতিই সুমন ঘৃণা পোষণ করে। সুমন জানায় যে শ্রমিক শ্রেণীর দুরবস্থা সম্বন্ধে সি-পি-এম সম্পূর্ণ ভাবে উদাসীন। সুমন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার এক সম্পূর্ণ বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পক্ষে জোর সওয়াল করে এবং জানায় যে সে ট্রটস্কিপন্থী আন্দোলনে যোগদান করতে আগ্রহী।

আই-সি-এফ-আই সমর্থকরা ছাত্রছাত্রীদের কাছে আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেণীর পুণরূত্থানের এবং ট্রেড ইউনিয়ন বিরোধী বিদ্রোহের বেড়ে ওঠার তাৎপর্য বিশ্লেষণ করেন। তারা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ভারতের সাম্প্রতিক দুই-দিন ব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটের ওপর ডাব্লু-এস-ডাব্লু-এস ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রবন্ধ বিলি করেছে। এই প্রবন্ধে সি-পি-এম এবং অন্যান্য স্তালীনপন্থী দল, যেমন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি এবং তাদের ইউনিয়নগুলি যে প্রতারণাপূর্ণ আচরণ করেছে, তার কথা বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক স্তরে তাদের মতন দলগুলি যেমন করে, এই ইউনিয়নগুলিও কর্পোরেশন এবং পুঁজিবাদী সরকারের শিল্প-সংক্রান্ত পুলিশ বাহিনী হিসাবে কাজ করে।

ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে এই বিষয়ে প্রবল মতৈক্য হয়েছে যে সি-পি-এম ভারতীয় পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটি অংশ। সি-পি-এম-এর নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার, যারা পশ্চিমবঙ্গে ৩০ বছরেরও বেশী সময় ধরে ২০১১ পর্যন্ত শাসন করেছে, তারা ভারতীয় বড় ব্যবসাদারদের এবং বিশ্বের বিভিন্ন জায়গার বিনিয়োগকারীদের দাবী অনুযায়ী নির্মমভাবে "মুক্ত বাজার নীতি" প্রয়োগ করেছে।

গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর তৃণমূল কংগ্রেস (টি-এম-সি)-র নেতৃত্বাধীন বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ক্রমবর্দ্ধমান আক্রমণের বিষয়েও ছাত্রছাত্রীরা উদ্বেগ প্রকাশ করে। এই সরকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে একটি কাউন্সিল ব্যবস্থা চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করছে, যা গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত ছাত্র ইউনিয়নগুলিকে সম্পূর্ণ ভাবে ধ্বংস করে দেবে। এই কাউন্সিলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রছাত্রীদের প্রতিবাদ সংগঠিত হচ্ছে।

আই-সি-এফ-আই সমর্থকরা ব্যাখ্যা করে যে দক্ষিণপন্থী টি-এম-সি-র উত্থান এবং প্রধানমন্ত্রী মোদির হিন্দু সাম্প্রদায়িক বিজেপি-র ক্ষমতায় আসার রাজনৈতিক দায়িত্ব বর্তায় সি-পি-এম-এর নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট এবং তাদের সংযুক্ত ট্রেড ইউনিয়নগুলির ওপর।

স্তালীনপন্থী সি-পি-এম ধর্মঘটী শ্রমিকদের বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল এবং ভারতের বড় ব্যবসার পার্টি, যেমন কংগ্রেস, এবং বিভিন্ন জাতিভিত্তিক আঞ্চলিক দলের কাছে শ্রমিক শ্রেণীকে রাজনৈতিক ভাবে নত করেছিল। শ্রমিক শ্রেণীর যে কোনো স্বাধীন আন্দোলনকে দমন করাকে চরম দক্ষিণপন্থী ও সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলি কাজে লাগিয়েছিল শ্রমিক শ্রেণীকে ভাগ করতে এবং সরকারি আক্রমণকে আরও তীব্র করে তুলতে।

গৌরব

যাদবপুরের আরেক ছাত্র, গৌরব ট্রটস্কিপন্থী আন্দোলনের সমাজতান্ত্রিক কার্য্যক্রমের বিষয়ে অত্যন্ত উৎসাহ প্রকাশ করে। সে বলে, "আমি এই ভাবনাকে সম্পূর্ণ ভাবে সমর্থন করি যে শ্রমিকদের সরকারের হাতেই থাকবে চরম ক্ষমতা, যাতে সাধারণ মানুষ তার সুফল পায়।"

দূর্পায়ন আই-সি-এফ-আই-এর প্রচারকারীদের জানায় যে সে "সোশ্যালিস্ট ইকুয়ালিটি পার্টি-র আদর্শকে সমর্থন করে এবং অবশ্যই শ্রমিক শ্রেণীর সংগ্রামে তাদের সঙ্গে আছে"। আরেক জন ছাত্র, সৌম্যজিৎ জানায়: "আমাদের প্রয়োজন মানুষকে সচেতন করে তোলা"।

দার্জিলিং থেকে আসা এক ছাত্র জানায় যে সে এই বিষয়ে একমত যে সমাজতন্ত্রের লড়াইয়ের অংশ হিসাবে শ্রমিকরা প্রধান শিল্পগুলির গণতান্ত্রিক দখল নেবে। "এমনকি চা বাগান শ্রমিকদেরও (কাজ থেকে) ছেঁটে ফেলা হচ্ছে। আমি এই বিষয়টি সমর্থন করি যে তারা দখল নিক সব বড় চা বাগানগুলির, যেমন ডানকান (যা ভারতের সর্ব বৃহৎ চা উৎপাদনকারি।"

সি-পি-এম-এর ছাত্র সংগঠন এস-এফ-আই-এর এক প্রাক্তন সদস্য জানায়: "আমি আগে এস-এফ-আই-এর সঙ্গে থেকেছি এবং দেখেছি তারা কি ভাবে বড় বড় এবং প্রভাবশালী লোকের সঙ্গে সহযোগিতা করে। সি-পি-এম যে রাস্তা দেখায়, এস-এফ-আই সেই রাস্তাই অনুসরণ করে এবং সেই কারণের আমি এস-এফ-আই ছেড়ে দিয়েছি।"

তন্ময়

আর এক ছাত্র, তন্ময়, যুদ্ধের ক্রমবর্দ্ধমান বিপদের কথা বলে। "শাসক শ্রেণী যে বিশ্বযুদ্ধের ভয় দেখাচ্ছে তা আমাদের সকলের পক্ষেই বিপজ্জনক। একে রোখার একমাত্র উপায় শ্রমিক শ্রেণীকে একত্রিত করা। ভারতবর্ষের শ্রমিকদের নিজেদের মতামত ব্যক্ত করার জন্য এক যৌথ নেতৃত্বের অভাব।" আই-সি-এফ-আই-এর প্রচারকারীরা ব্যাখ্যা করে কি ভাবে আই-সি-এফ-আই ও ডাব্লু-এস-ডাব্লু-এস সেই ধরণের নেতৃত্ব দেবার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

আই-সি-এফ-আই প্রচারকারীরা ব্যাখ্যা করে স্তালীন বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ত্যাগ করে কি ভাবে "এক দেশে সমাজতন্ত্র"-কে আলিঙ্গণ করেছিলেন, যা এক মার্ক্সবাদ-বিরোধী ও জাতীয়তাবাদী কার্য্যক্রম। ঋতজিৎ এই ব্যখ্যা শুনে তার প্রতিক্রিয়া জানায়।

ঋতজিৎ বলে, "বিশ্ব মার্কসবাদী আন্দোলনের থেকে স্তালীনপন্থী চ্যুতি একের পর এক বিপর্যয়ের জন্য দায়ী ছিল।" সে আরও বলে, "স্তালীনপন্থী দলগুলি, যারা আজও শ্রমিক স্বার্থের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে, তারা যে চ্যুতি ঘটাচ্ছে, তার মোকাবিলা করার জন্য শ্রমিক আন্দোলনকে একত্রিত করতেই হবে।"