ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই-ই সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম

২১ ডিসেম্বর ২০১৯

ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি-র) প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত ১২ই ডিসেম্বর তাদের মুসলিম-বিরোধী সাংবিধানিক সংশোধনী আইন (সিএএ) সংসদে পেশ করার পর থেকে ভারত জুড়ে প্রভূত গণবিক্ষোভ শুরু হয়েছে।


স্বাধীন ভারতে প্রথমবার একজন মানুষের নাগরিকত্ব বিচারের জন্য ধর্মকে মাপকাঠি করছে সিএএ। বিজেপি এবং তাদের আদর্শগত গুরু, অন্ধকারের ফ্যাসিবাদী দল আর-এস-এস-এর প্রধান লক্ষ্য পূরণ করার পথে সিএএ প্রথম পদক্ষেপ। ফ্যাসিবাদী আর-এস-এস-এর প্রধান লক্ষ্য হলো ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র বা এমন এক রাষ্ট্রে পরিণত করা যেখানে সংখ্যালঘু মুসলমানদের ততক্ষণই "সহ্য" করা হবে, যতক্ষণ তারা হিন্দু আধিপত্ববাদ মেনে নেবে।


নলবাড়িতে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের সময় ভারতীয়রা স্লোগান দিচ্ছেন, ভারত, শুক্রবার, ডিসেম্বর ২০, ২০১৯ (এপি ছবি/অনুপম নাথ)


সিএএ বিরোধী প্রতিবাদের সম্মুখভাগে রয়েছে মুসলিম ছাত্র ও যুবরা। কিন্তু প্রতিবাদগুলি সকল ধর্মীয়, সাম্প্রদায়িক, জাতিগত ও বর্ণ বিভেদ ছাড়িয়ে ভারতবর্ষের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে।
নাগরিকত্ব আইন বিরোধী বিক্ষোভ আয়োজিত হলো ভারত ও শ্রীলঙ্কায় ধর্মঘটের ঢেউ আছড়ে পড়ার পরেই, যে ধর্মঘটগুলি ছিল আমেরিকা থেকে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা জুড়ে হওয়া বিশ্বব্যাপী শ্রেণী সংগ্রামেরই অংশ।


বিজেপি সরকার এই সিএএ বিরোধী প্রতিবাদে নড়ে গিয়েছে এবং তার প্রতিক্রিয়ায় গণ হারে দমনের নীতি নিয়েছে। শুক্রবার উত্তর ভারতে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ছয় জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। দেশের বিরাট অংশে সরকার ফৌজদারি কোডের ১৪৪ ধারা জারি করেছে, যে কারণে এক সঙ্গে চার জনের বেশী মানুষ জড়ো হওয়াকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে। যে সমস্ত জায়গায় ১৪৪ ধারা জারি হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে উত্তর প্রদেশ (জনসংখ্যা ২৩ কোটি) এবং কর্ণাটক (জনসংখ্যা ৬.৫ কোটি) এবং দেশের রাজধানীর দিল্লীর কিছু অংশ। লক্ষ লক্ষ মানুষ ইন্টারনেট পরিষেবা থেকে, এবং কিছু ক্ষেত্রে, সেলফোন পরিষেবা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।


মুসলমানরা ছাড়া আর সকল মানুষ যারা ২০১৫-র আগে আফঘানিস্তান, পাকিস্তান বা বাংলাদেশ থেকে ভারতে এসেছেন, সিএএ-র মধ্যে দিয়ে তাদের সবাইকে ভারতের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। এটি আরও ভয়াবহ একটি সাম্প্রদায়িক প্রকল্পের প্রস্তুতি: ভারতের ১৩০ কোটি মানুষকে কর্তৃপক্ষকে সন্তুষ্ট করতে হবে এই বিষয়টি প্রমাণ করে যে তারা ভারতের নাগরিকত্ব পাবার যোগ্য।


সিএএ-র কিছু অংশ স্পষ্ট করে দেয় যে বিজেপির জাতীয় নাগরিক নিবন্ধকের (এনআরসি) একমাত্র উদ্দেশ্য হবে মুসলমানদের ভয় দেখানো, হয়রানি করা ও নির্যাতন করা - কারণ কেবলমাত্র তাদেরই ভয় থাকবে "রাষ্ট্রহীন" হবার। "রাষ্ট্রহীন" বলে ঘোষিত হবে তারা হারাবে সমস্ত নাগরিক অধিকার হারাবে এবং তাদের আটক অথবা বহিষ্কারও করা হতে পারে।


সাম্প্রদায়িক উস্কানি  দিতে বিজেপি সরকার যত কাজ করেছে, সেই তালিকায় সর্বশেষ যোগ হয়েছে সিএএ ও এন-আর-সি।


গত ৫ই আগস্ট এই সরকার অবৈধভাবে ভারতের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য, জম্মু ও কাশ্মীরের অনন্য আধা-স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা বাতিল করে এবং এই অঞ্চলকে স্থায়ীভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। এই সাংবিধানিক অভ্যুত্থানটি করার জন্য এই সরকার জম্মু ও কাশ্মীরে কয়েক হাজার অতিরিক্ত সুরক্ষা বাহিনী মোতায়েন করে, কোনো অভিযোগ ছাড়াই হাজার হাজার মানুষকে আটক করে এবং এই মাস ধরে ওই অঞ্চলে  সেলফোন এবং ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখে।


মোদি সরকার ও আর-এস-এস-এর দাবির কাছে মাথা নত করে, গত মাসে সুপ্রিম কোর্ট রায়দান করে যে অযোধ্যাতে যেখানে বাবরি মসজিদ ছিল, সেখানে একটি হিন্দু মন্দির স্থাপন করতে হবে। ১৯৯২ সালে বিজেপি নেতৃত্বের প্ররোচনায় হিন্দু ধর্মান্ধরা অযোধ্যায় অবস্থিত বাবরি মসজিদকে ধ্বংস করে।


"ধর্ম নিরপেক্ষ" ভারত যে স্থানে পরিণত হয়েছে, সেই বিষয়ে ভারতে হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সকল শ্রমিক, ছাত্রছাত্রী এবং পেশাদার ব্যক্তিদের মধ্যে ক্ষোভ ও বিদ্বেষ রয়েছে এবং তারা একে প্রতিহত করতে বদ্ধপরিকর।


কিন্তু তা করতে পারার জন্য এবং প্রাসঙ্গিক থাকার জন্য, তাদের প্রয়োজন এক আন্তর্জাতিক ও সমাজতান্ত্রিক কৌশল। বুর্জোয়ারা অতি-জাতিয়তাবাদ, ফ্যাসিবাদ ও একনায়কতন্ত্রের দিকে ঝুঁকেছে। পুঁজিবাদী অভিজাত শ্রেণী এবং তাদের সকল রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর স্বাধীন রাজনৈতিক আন্দোলন চালিত করে এবং শ্রমিকের ক্ষমতার লড়াইয়ের মাধ্যমেই কেবলমাত্র এর মোকাবিলা করা সম্ভব।


একটি বিশ্বব্যাপী ঘটনা


মোদি সরকার এবং তাদের সাম্প্রদায়িক আক্রমণও এক বিশ্বব্যাপী ঘটনার ভারতীয় সংস্করণ।


সামাজিক অসাম্য তীব্রতর হয়ে উঠছে, বিশ্বব্যাপী শ্রেণী সংগ্রাম বেড়ে চলেছে, এবং বাজার, সম্পদ ও ভূকৌশলগত সুবিধা পাবার জন্য পুঁজিবাদীদের নিজেদের মধ্যে যে লড়াই তা প্রবল হয়ে উঠেছে। এই রকম পরিস্থিতিতে সর্বত্র বুর্জোয়ারা শাসনের জন্য একনায়কতন্ত্রের দ্বারস্থ হচ্ছে এবং অতি-দক্ষিণপন্থী ও ফ্যাসিবাদী শক্তিদের বাড়িয়ে তুলছে।


সাম্রাজ্যবাদী "গণতন্ত্র"গুলিতে এবং ভারত, তুরস্ক বা ব্রাজিলের মতন দেশ যেখানে বিলম্বিত পুঁজিবাদী উন্নয়ন হয়েছে, সেই সব জায়গায় এই ঘটনা ঘটছে।


মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর আঘাত হানছে; সামরিক বাহিনী ও পুলিশের কাছে তার আবেদনের মধ্য দিয়ে এবং সমাজতন্ত্রের প্রবল নিন্দা করে এক ফ্যাসিবাদী আন্দোলন তৈরী করতে চাইছে।


ফরাসি রাষ্ট্রপতি এম্যানুয়েল ম্যাক্রন ভিচি ন্যাৎসি ষড়যন্ত্রকারী মার্শাল পেটায়েনকে পুণর্বাসন দিচ্ছেন এবং সামাজিক উন্নয়নের খরচ বিপুল ভাবে হ্রাস করতে ও আক্রমণাত্মক ফরাসি সামরিক অভিযান পুণরায় শুরু করতে বারবার সামাজিক বিরোধীতাকে দমন করতে শক্তির ব্যবহার করার আদেশ দিচ্ছে। জার্মানিতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলি এবং অভিজাত শাসক শ্রেণী নব্য-নাৎসি এ-এফ-ডি-র হয়ে প্রচার করে ওই দলটিকে রাইখস্ট্যাগের প্রধান বিরোধী দল করে তুলেছে।


ভারতীয় বড় ব্যবসাগুলি বিশ্বমঞ্চে তাদের লুন্ঠনের স্বার্থকে আরও তীব্র ভাবে প্রতিভূত করতে এবং বিনিয়োগকারীদের পক্ষে নীতি, যা সামাজিক ভাবে হিংসাত্মক, তাকে দৃঢ় ভাবে প্রণয়ণ করতে ২০১৪ সালে মোদিকে ক্ষমতায় নিয়ে এসেছিল।


তাদের দ্বিতীয় দফার প্রথম ছয় মাসে বিজেপি হিন্দু দক্ষিণপন্থার আধিপত্ববাদের বিষয়টি প্রণয়ন করতে এবং একই সঙ্গে নব্য-উদারনৈতিক সংস্কার আরোপ করতে জোর দিয়েছিল। এর জন্য তারা বেসরকারিকরণের নতুন জোয়ার তুলেছিল এবং বড় ব্যবসাদের জন্য বিপুল কর ছাড় দিয়েছিল।


মোদি এবং তার প্রধান সহযোগী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, অত্যন্ত সচেতন যে "উদীয়মান" পুঁজিবাদী ভারতের দম্ভ আসলে একটি সামাজিক বারুদের স্তুপ যার সলতেতে ইতিমধ্যেই অগ্নিসংযোগ হয়ে গেছে। প্রবল সামাজিক অনৈক্যের কারণে তৈরী হওয়া সামাজিক উত্তেজনা, দ্রুত খারাপ হতে থাকা অর্থনীতি এবং যুদ্ধবাজ বিদেশনীতির বিরুদ্ধে ক্রমাগত প্রতিরোধী হয়ে ওঠা ও জঙ্গী শ্রমিক শ্রেণীর বিরুদ্ধে সৈন্য তৈরী করে তাদের হিন্দু ফ্যাসিবাদী ভিত্তিকে আন্দোলিত করার লক্ষ্যে তারা মুসলমান-বিরোধী সাম্প্রদায়িকতা বাড়িয়ে তুলছে।


সারা পৃথিবীর মতন ভারতেও শ্রমিক শ্রেণীই পুঁজিবাদী প্রতিক্রিয়া, একনায়কতন্ত্র এবং যুদ্ধের বিরুদ্ধে আক্রমণ করার সামাজিক ভিত্তি স্থাপন করেছে শ্রমিক শ্রেণী। বিশ্ব জুড়ে পুঁজিবাদী উৎপাদন এই শ্রমিক শ্রেণীকে একত্রিত করেছে এবং এরা নিজেদের আন্তর্জাতিক চরিত্র সম্বন্ধে সচেতন। কিন্তু শ্রমিক শ্রেণীর বিপুল সামাজিক শক্তিকে কেবলমাত্র তখনই কাজে লাগানো যাবে যখন তারা নিজেদের আলাদা ভাবে এবং বুর্জোয়াদের সমস্ত রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে সংগঠিত করতে পারবে।


যারা কিছুদিন আগে পর্যন্তও সরকার গঠনের জন্য বুর্জোয়াদের প্রধান দল ছিল, সেই কংগ্রেস পার্টি এবং বেশ কিছু আঞ্চলিক-জাতীয়তাবাদী এবং জাতিভিত্তিক দল মোদি সরকারের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া গণ বিরোধীতার রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চাইছে।


দুই স্তালীনপন্থী সাংসদীয় দল, ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) বা সিপিএম এবং ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিআই এক নিন্দনীয় ও বিপজ্জনক ভূমিকা পালন করছে।


১৯৯২-এ বাবরি মসজিদ ভাঙার পর; ২০০২-এ মোদি গুজরাটে মুসলিম-বিরোধী দাঙ্গায় নেতৃত্ব দেবার পর; এবং ২০১৪-তে মোদি প্রথম সংখ্যাগরিষ্ঠ বিজেপি সরকার গঠন করার পর স্তালীনপন্থীরা যেমন "হিন্দু ফ্যাসিবাদ"-এর বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলত, আজও তেমনি আওয়াজ তুলছে। কিন্তু শ্রমিক শ্রেণীকে কেবল ভারতীয় বুর্জোয়া ও রাষ্ট্রের দল ও প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে বেঁধে রাখার জন্য তারা যে প্রচেষ্ঠা করে, তার অঙ্গ হিসাবেই তারা এই আওয়াজ তুলছে।


হিন্দু দক্ষিণপন্থীদের বিরুদ্ধে লড়াই করার নামে স্তালীনপন্থীরা শ্রেণী সংগ্রামকে নিয়ম মেনে দমন করেছে এবং ভারতীয় বুর্জোয়াদের নব্য-উদারনৈতিক কার্যাবলী প্রণয়ন করতে সাহায্য করেছে। ১৯৮৯ থেকে ২০০৮-এর মধ্যে একের পর এক দক্ষিণপন্থী, মার্কিন-পন্থী সরকার, যাদের অধিকংশই ছিল কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন, তাদের ক্ষমতায় আনতে এবং টিকিয়ে রাখতে স্তালীনপন্থীদের ভূমিকা এটাই প্রমাণ করে। এছাড়াও যে যে রাজ্যে তারা ক্ষমতায় ছিল, যেমন পশ্চিমবঙ্গ, কেরল, ত্রিপুরা, সেখানে স্তালীনপন্থীরা নিজেরাই "বিনিয়োগকারীদের পক্ষে" নীতি প্রণয়ন করেছে।


ঠিক যেমন যুদ্ধের সমর্থক, উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলিতে প্রতিষ্ঠিত "বামপন্থী" দলগুলির নেওয়া তীব্র কঠোরতার ব্যবস্থা অতি-দক্ষিণপন্থী উন্নয়নের পথ প্রশস্ত করতে সাহায্য করেছিল, তেমন ভাবেই রাজনৈতিকভাবে শ্রমিক শ্রেণিকে দমন করে স্তালীনপন্থীরা সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়া বৃদ্ধি করার কাজ করছে।


তাই, হিন্দু দক্ষিণপন্থাকে পরাজিত করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য ও পথ প্রদর্শনকারী নীতি - স্তালীনপন্থীরা এমন দাবি করার পর তিন দশক পেরিয়ে যাবার পরেও মোদি ও তার বিজেপি অভূতপূর্ব শক্তির অধিকারী।


আজ "গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা" রক্ষা করতে সিপিএম ও সিপিআই আবার বড় ব্যবসার কংগ্রেস পার্টির সঙ্গে মিলিত হবার কথা বলছে। তারা মাথায় রাখছে না যে হিন্দু অধিকারকে সাহায্য করার ও তোষণ করার কুখ্যাত ইতিহাস কংগ্রেসের রয়েছে। গত মাসেই সিপিএম-এর সমর্থিত একটি কার্য্যক্রমে কংগ্রেস ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জনসংখ্যার রাজ্য মহারাষ্ট্রে এক জোট সরকারের ক্ষমতায় আসা নিশ্চিত করেছে, যে সরকারের নেতৃত্বে রয়েছে শিবসেনা। এই শিবসেনা এক হিন্দু আধিপত্ববাদী এবং উগ্র মারাঠা জাতীয়তাবাদী দল যারা মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও বিজেপি-র নিকটতম সঙ্গী ছিল।


চিরস্থায়ী বিপ্লব এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম


স্তালীনপন্থীরা শ্রমিকদের আবেদন জানায় সুপ্রিম কোর্ট এবং পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের অন্যান্য অচল দক্ষিণপন্থী প্রতিষ্ঠানের কথা শুনে মোদির রাজত্বে আয়োজিত গণতন্ত্রবিরোধী ও বেআইনি কর্মসূচির বিরোধীতা করতে। বাস্তবে, বহু দশক ধরেই সুপ্রিম কোর্ট একের পর এক সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরাচারী রাজত্বকে এগিয়ে চলার সংকেত দেখিয়েছে।


শ্রমিক শ্রেণীকে ভারত রাষ্ট্রের সঙ্গে বেঁধে রাখতে যে চেষ্টা তারা করে, তাকে সমর্থন করতে স্তালীনপন্থীরা দাবি করে যে  বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে দক্ষিণ এশিয়ায় জনগণের দ্বারা সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী যে সংগ্রাম শুরু হয়েছিল, ভারতীয় প্রজাতন্ত্র এবং তার প্রতিষ্ঠানগুলি তারই ফসল।


এই দাবি সর্বৈব মিথ্যা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের আঞ্চলিক বুর্জোয়া মক্কেলদের মধ্যে এক নোংরা চুক্তির মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমিক ও সর্বহারাদের বৈপ্লবিক প্রচেষ্টাকে দমন করে ভারত রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এক অবিভক্ত গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ ভারত গড়ার যে কার্য্যক্রম কংগ্রেসের ছিল, তারা নিজেরাই সেই কার্য্যক্রমের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে দক্ষিণ এশিয়া ছেড়ে গমনোদ্যত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রভু ও মুসলিম লিগের সঙ্গে হাত মেলায় এক স্পষ্টত মুসলিম পাকিস্তান ও প্রধানতঃ হিন্দু ভারত গঠনের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রদায়িক বিভাজন করার জন্য।


এম.কে.গান্ধী ও জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস, যারা ভারতীয় বুর্জোয়াদের প্রতিনিধি, তারা শ্রমিক শ্রেণীর ক্রমবর্ধমান উত্থানের মধ্যেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ পেতে উদগ্রীব ছিল। ব্রিটিশ এবং তাদের হিন্দু ও মুসলিম সাম্প্রদায়িক মিত্রদের বিভাজন-ও-শাসনের কৌশলের একমাত্র উত্তর ছিল দক্ষিণ এশিয়ার হিন্দু, মুসলমান ও শিখ শ্রমিক ও শোষিত শ্রেণীদের সমবেত স্বার্থের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তাদের নিয়ে সাম্রাজ্যবাদ, জমিদারি প্রথা এবং পুঁজিবাদী শোষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা। এই আন্দোলন করার ক্ষমতা কংগ্রেসের ছিল না এবং তারা এই আন্দোলনের বিরুদ্ধেও ছিল।


দেশভাগের তাৎক্ষণিক প্রভাব ছিল জনগণের মধ্যে সাম্প্রদায়িক হিংসা, যার ফলে দশ লক্ষেরও বেশী মানুষ মারা যান এবং ২০০ লক্ষ মানুষ গৃহহারা হন। তার চেয়েও বড় কথা হলো, এই দেশভাগ এক প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্ম দিল যা সাম্রাজ্যবাদকে এই অঞ্চলে তাদের শাসন চালিয়ে যাবার পথ তৈরী করে দিল; প্রতিক্রিয়াশীল আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রতিদ্বন্দ্বীতার জন্ম দিল যার ফলে বহু যুদ্ধ হয়েছে এবং আজ তা এই অঞ্চলকে এক সংকটের সম্মুখীন করতে পারে যেখানে ভারত ও পাকিস্থানের মধ্যে পরমাণু অস্ত্রের দ্বারা যুদ্ধ হতে পারে; এবং দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিক্রিয়াশীল অভিজাত শাসক শ্রেণী একে ব্যবহার করেছে সাম্প্রদায়িকতা বাড়িয়ে তুলতে এবং জনগণের বিভাজন ঘটাতে।


স্বাধীনতার পর বাহাত্তর বছর পার হয়ে গেছে, যে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, তার সরূপ প্রকাশিত হচ্ছে। রাশিয়ায় ১৯১৭-র অক্টোবরের বিপ্লবের থেকে ভারতের শ্রমিকরা যে ভাবে শিক্ষা গ্রহণ করছে এবং চিরস্থায়ী বিপ্লবকে তাদের সংগ্রামের কৌশলগত অক্ষ করছে এটি তার আরেকটি বর্ণণা। যদি শ্রমিক শ্রেণী অন্যান্য গ্রামীণ শোষিত মানুষকে নিয়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে নেতৃত্ব না দেয়, তবে যে সমস্ত দেশে বিলম্বিত পুঁজিবাদী উন্নয়ন হয়েছে, সেই সব দেশে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কোনো মৌলিক কাজ সম্পন্ন করা যাবে না।


সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে সংগ্রামের একটি সমাজতান্ত্রিক আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থাকা আবশ্যিক। সব ধর্ম ও জাতি নির্বিশেষে ভারতের সকল শ্রমিক ও শোষিত মানুষকে এক করার লড়াইয়ের সঙ্গে এক সাথেই চলতে থাকে তাদের লড়াইকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা শ্রমিকের লড়াইয়ের সঙ্গে এক করার যুদ্ধ।
সামাজিক অসাম্য, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, ওয়াশিংটনের সঙ্গে ভারতীয় বুর্জোয়াদের সামরিক ও কৌশলগত মৈত্রী এবং তাদের বিশাল সামরিক প্রস্তুতি - এই সকলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য শ্রমিক শ্রেণীকে প্রস্তুত করা গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার সংগ্রামের এই অবিচ্ছেদ্য অংশ।


এর জন্য তীব্র শ্রেণী সংগ্রামের প্রয়োজন। শ্রমিক শ্রেণীকে বুর্জোয়াদের এবং তাদের সব রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা তৈরী করতেই হবে। বিশ্ব পুঁজিবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেণীর আক্রমণ সৃষ্টি করার অংশ হিসাবে এবং শ্রমিক ও কৃষকের সরকার তৈরী করতে গ্রামের দরিদ্র ও শোষিত মানুষকে তাদের নিজেদের সমর্থনে নিয়ে আসতে হবে।


যে সকল ভারতীয় শ্রমিক, ছাত্র ও অন্যান্য মানুষ যারা এই সংগ্রামে সামিল হতে চান, তাদেরকে আমরা ওয়ার্ল্ড সোশ্যালিস্ট ওয়েব সাইট এবং চতুর্থ ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করতে আহ্বান জানাচ্ছি।

কিথ জোন্স্