বাংলা

ভারত ও পাকিস্তান এক বিধ্বংসী যদ্ধের মুখে দোদুল্যমান

ভারত ও পাকিস্তান, দক্ষিণ এশিয়ার দুই পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র, এই মুহূর্তে এক পূর্ণ মাত্রার সামরিক সংঘর্ষের কিনারায় দোদুল্যমান। মঙ্গলবার ভোর রাতে ভারতীয় যুদ্ধবিমান ১৯৭১-এর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পরে এই প্রথমবার পাকিস্তানে আক্রমণ চালায়। নতুন দিল্লী দাবি করেছে পাকিস্তানের গভীরে আক্রমণ চালিয়ে তারা ভারত-অধিকৃত কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী জঙ্গী সংগঠন জইশ-ই-মহম্মদের প্রধান "জঙ্গী ঘাঁটি" ধ্বংস করেছে।

ভারতের আক্রমণের ফলে হওয়া ক্ষয়ক্ষতি এবং তার কৌশলগত প্রভাব মূল্যায়ন করতে সংক্ষিপ্ত সময়ের বিভ্রান্তির পর ইসলামাবাদ প্রতিজ্ঞা করেছে তারা ভারতকে এক শক্তিশালী সামরিক প্রত্যুত্তর দেবে। পাকিস্তান জানায় যে তারা ভারতকে কাশ্মীরের জঙ্গী হামলার প্রতিশোধ হিসাবে বা স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে বেআইনি মার্কিন বা ইসরায়েলি পন্থার পাকিস্তানের ভিতর আক্রমণ করাকেই "নিয়ম" করে তুলতে দেবে না।

পরের দিন ভারতীয় ও পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্যের ওপর যুদ্ধ শুরু করে। পাকিস্তান ভারতীয় সামরিক ঘাঁটির ওপর আক্রমণ করে, যাকে নতুন দিল্লী ব্যররথ আক্রমণ বলে জানায়। দুই দলই দাবি করেছে বুধবারের লড়াইয়ে তারা অন্তত একটি করে শত্রু বিমানকে গুলি করে ফেলে দিয়েছে। ইসলামাবাদ তাদের দাবির স্বপক্ষে প্রমাণ হিসাবে এক বন্দী ভারতীয় যুদ্ধবিমানচালককে দেখায়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া এবং বিশ্বের অন্যান্য শক্তিশালী দেশগুলি এখন একটি সর্বগ্রাসী যুদ্ধ বেধে যাওয়া আটকাতে প্রকাশ্যে মতামত দিচ্ছে, কারণ তারা ভাবছে উপমহাদেশের সীমানায় "আটকে থাকলেও" এই যুদ্ধ শিগগিরি একটি ভয়াবহ পারমাণবিক অস্ত্র আদানপ্রদানের রূপ নেবে। যদিও তারা সংযমী হবার পরামর্শ দিচ্ছে এবং মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব পেশ করছে, তবুও এই প্রধান শক্তিরা, যারা নিজেরা আটক আছে, তারা, পেন্টাগনের ভাষায় "কৌশলগত প্রতিযোগিতার নতুন যুগে" দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক সংকটকে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে নিজেদের ভূ-কৌশলগত স্বার্থকে এগিয়ে নিয়ে যেতে।

বিশেষ করে ওয়াশিংটন এই বিরোধকে কাজে লাগিয়েছে চীনকে কূটনৈতিকভাবে এবং সামরিক ভাবে ঘিরে ফেলার তার প্রচেষ্টাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে। তারা পাকিস্তানের ওপর ভারতের আক্রমণকে “আত্মরক্ষা” কারণ বলে সবুজ সংকেত দেখিয়েছে এবং এই বর্তমান সংকটকে কাজে লাগাচ্ছে ভারত-মার্কিন “বিশ্বব্যাপী কৌশলগত অংশীদারীকে” বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে।

নরেন্দ্র মোদি এবং তার হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির নেতৃত্বাধীন ভারতের এবং জনপ্রিয় ইসলামিক নেতা ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানের সামাজিক-অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সংকট যোগ হয়ে এই অবস্থার ভয়াবহতা বৃদ্ধি করছে।

কর্মসংস্থান করার, উন্নয়ন করার এবং সামাজিক কাজের খাতে খরচ বৃদ্ধি করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইমরান খান মাত্র সাত মাস আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু তার পর আই-এম-এফ এর চাহিদা অনুযায়ী কঠোর নীতি প্রনয়ণ করায় ইমরান খানের জনপ্রিয়তা হ্রাস পেতে শুরু করেছে। এপ্রিল-মে মাসে ভারতের একাধিক পর্যায়ের নির্বাচনে বেশী ভোট পেতে মোদি ও তার বিজেপি সামরিক সংকটকে নির্লজ্জ ভাবে ব্যবহার করছে। সরকারের বিরুদ্ধাচারণ ও সমালোচনা বন্ধ না করায় এবং “শক্তিশালী পুরুষ” মোদি ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের “কৌশলগত শৃঙ্খল ভেঙে ফেলেছে বলে তারা যে দাবি করছে তা প্রচার না করায় বিজেপি বিরোধীদের দায়ী করছে ‘জাতীয় ঐক্য’ নষ্ট করার জন্য।

ইমরান খান যে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিল, সামরিক বাহিনী, কর্পোরেট মিডিয়া এবং কার্যত সম্পূর্ণ বিরোধী শিবিরের সমর্থন পেয়ে তা মোদি সরকার নাকচ করে দিয়েছে। যতক্ষণ না ইসলামাবাদ নতুন দিল্লির দাবি মেনে কাশ্মীরেরজঙ্গী আন্দোলনের ওপর থেকে তাদের সমগ্র যৌক্তিক সমর্থন তুলে নিচ্ছে, ততক্ষণ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে “শান্তি আলোচনা” দূরের কথা, দিল্লি কোনো রকম উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকেই রাজি হচ্ছে না, যেমন তারা বহু বছর করে এসেছে।

পারমাণবিক বিপর্যয়ের পথে এগিয়ে চলা হচ্ছে?

দুটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে এই প্রথম যুদ্ধ হতে পারে - এর বিপদ ছোটো করে দেখা উচিত নয়। ২০০১-০২-এর সামরিক সংকটের সময় পাকিস্তান সীমানায় নয় মাসের জন্য দশ লক্ষ সৈন্য মোতায়েন করা হয়েছিল। সেই সময় থেকে দুই দেশের মধ্যেই সামান্য বিষয়েই নীতি প্রয়োগ হয় এবং এমন সম্পর্ক হয়েছে যে দ্রুত সমস্যার তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। ভারতের শীতল নীতি অনুযায়ী পাকিস্তান যদি আক্রমণ করে তো বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত সৈন্য পৌঁছে যাবে। তার উত্তরে ইসলামাবাদ যুদ্ধকৌশলসংক্রান্ত বিষয়ে বা যুদ্ধক্ষেত্রে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন করেছে। আবার তার উত্তরে ভারত ইঙ্গিত দিয়েছে যে পাকিস্তান যদি কোনো ভাবে যুদ্ধকৌশলসংক্রান্ত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে, তবে তা 'কৌশলগত বাধ' ভেঙে দেবে এবং ভারতকে পারমাণবিক অস্ত্র "প্রথমে ব্যবহার করা যাবে না"-র শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করবে। এর ফলে ভারত কৌশলগতভাবে পারমাণবিক অস্ত্র দিয়েই প্রতিশোধ নেবে।

এ সবই ঘটবে অপেক্ষাকৃত ছোটো, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাতে। পাকিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর লাহোরের কেন্দ্রে ১১০ লক্ষেরও বেশী মানুষ বাস করেন। এই শহর ভারতের সীমানা থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার (১২.৫ মাইল) দূরে অবস্থিত। নতুন দিল্লি থেকে ইসলামাবাদের দূরত্ব বার্লিন ও প্যারী বা নিউ ইয়র্ক ও ডেট্রয়েটের মধ্যের দূরত্বের চেয়ে অনেক কম। এই দূরত্ব একটি পারমাণবিক অস্ত্রসম্পন্ন মিসাইল মাত্র কয়েক মিনিটে পার করতে পারবে।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধ হলে তা কেবলমাত্র দক্ষিণ এশিয়ায় হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুই ঘটাবে না। ১৯৮০-র দশকে যে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীকে "পারমাণবিক শীতকাল"-এর বিষয়ে বিশ্বকে সচেতন করেছিল, তারাই ২০০৮-এ একটি নকল পরীক্ষার আয়োজন করে নির্ধারণ করেন যে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে হিরোশিমায় বিস্ফোরণ হওয়া বোমার একশো গুণ পারমাণবিক অস্ত্র চালানোয় বড় শহরগুলি ধ্বংস হবার ফলে উচ্চ আবহাওয়ামন্ডলে এত ধোঁয়া ও ছাই-এর সৃষ্টি হবে যে তা বিশ্বব্যাপী কৃষির পতনের কারণ হবে। বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যদ্বাণী করেন যে দক্ষিণ এশিয়াতে "সীমিত" পারমাণবিক যুদ্ধের পরের মাসগুলিতে দশ লক্ষ মানুষ মারা যাবে।

আগামী কয়েক দিনে বা সপ্তাহে এই সামরিক সংকটের ফলে কিছু বিষয় হয়তো হাতের বাইরে চলে যেতে পারে। এই সামরিক সংকটের ফল যা-ই হোক, এর থেকে বোঝা যায় কেমন করে যুদ্ধোত্তর ভূরাজনৈতিক শৃঙ্খলার ভেঙে পড়া এবং তার ফলে হওয়া ক্রমবর্দ্ধমান সাম্রাজ্যবাদী বিরোধ ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় বৈরিতা কিভাবে সব অমিমাংসিত দ্বন্দ্বকে এবং বিংশ শতাব্দীর সমস্যাদের বাড়িয়ে তুলছে। মনে রাখতে হবে, বিংশ শতাব্দী এমন এক শতাব্দী যখন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব পুঁজিবাদের সামনে যে সংকটের সৃষ্টি করেছিল, পুঁজিবাদ তা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে ঠিকই, কিন্তু তার জন্য তারা মানবতাকে দুটি বিশ্বযুদ্ধ, ফ্যাসিবাদ এবং আরও অসংখ্য ভয়াবহতার মধ্যে দিয়ে নিয়ে গেছে।

দেশভাগ এবং জাতীয় বুর্জোয়াদের ঐতিহাসিক ব্যর্থতা

১৯৪৭ সালে উপমহাদেশকে মুসলিম পাকিস্তান এবং প্রধানত হিন্দু সংখ্যাগুরু সমেত ভারতে ভাগ করার সাম্প্রদায়িক কাজের মধ্যেই ভারত-পাকিস্তানের দ্বন্দ্বের শিকড় প্রথিত রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া ছেড়ে যে ব্রিটিশ প্রভুরা চলে যাচ্ছিল এবং দেশী বুর্জোয়াদের প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলির মধ্যে তাদের প্রতিনিধি, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং মুসলিম লিগ উপমহাদেশকে সাম্প্রদায়িক বিভাজনে বিভক্ত করার এই অপরাধ করেছিল।

দেশভাগ সব ধরণের ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক যুক্তির ঊর্ধ্বে ছিল। দেশভাগের ফলে শুরু হওয়া ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ২০ লক্ষ মানুষ মারা যায় এবং আরও ১৮০ লক্ষ মানুষ ভারত ছেড়ে পাকিস্তানে এবং পাকিস্তান ছেড়ে ভারতে পালিয়ে আসে। কিন্তু তার তিন দশক আগে থেকে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী যে গণবিদ্রোহ দক্ষিণ এশিয়াতে চলছিল, তার এক রক্তাক্ত সমাপ্তি নিয়ে এসে এই দেশভাগ ভারতের ও পাকিস্তানের অভিজাত শাসক শ্রেণীর নৃসংস স্বার্থসিদ্ধি করতে সাহায্য করেছে। লন্ডন এই স্বাধীনতা ও দেশভাগের চুক্তির অঙ্গ হিসাবে ক্রমবর্দ্ধমান লড়াকু শ্রমিক শ্রেণীর থেকে এই পুঁজিবাদী রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে ভারত ও পাকিস্তানের অভিজাত শ্রেণীকে ব্রিটিশ কলোনির অন্তর্গত এই পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের শাসনভার দিয়ে যায়।

জনগণের সমস্যার কোনো প্রগতিশীল সমাধান খুঁজে না পেয়ে ভারতীয় এবং পাকিস্তানী বুর্জোয়ারা গত সাত দশক্ ধরে তাদের কৌশলগত দ্বন্দ্ব এবং সাম্প্রদায়িকতায় সম্পৃক্ত জাতীয়তাবাদী আবেদনকে ব্যবহার করেছে সামাজিক ক্রোধকে প্রতিক্রিয়াশীল পথে সরিয়ে দিতে।

তাদের যৌথ দেউলিয়াপণার সাক্ষী এই উন্মুক্ত ক্ষত, অর্থাৎ কাশ্মীর। ভারতের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীরের মানুষকে ভারতীয় বুর্জোয়ারা তিন দশক ধরে সামরিক নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। সেখানে ক্রমাগত ভাবে ভারতীয় শাসনের প্রতি জনগণের যে ঘৃণা তা মেনে নিতে তারা সংকোচ প্রকাশ করে, যদিও তারা এমন এক শাসক দল ও প্রধানমন্ত্রীর জয়ধ্বনি তোলে যাদের মুসলিম-বিরোধী কাজের জন্য দায়ী করা হয়েছিল।

অন্যদিকে, যে কাশ্মীর তাদের শাসনে আছে, পাকিস্তানের ভয়াবহ অভিজাত শাসক শ্রেণী সেই কাশ্মীরিদের অধিকারকে পদদলিত করেছে এবং সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল ইসলামিক উপাদানদের সম্মুখে নিয়ে আসতে জম্মু ও কাশ্মীরের বিরোধীদের ব্যবহার করেছে ।

শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বাধীন যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী এক আন্দোলনের পক্ষে

গত দুই দশক ধরে ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের চরিত্র বদল হয়েছে। সেটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-চীন-এর বিবাদের সঙ্গে ওতপ্রতোভাবে জড়িয়ে পড়েছে, যার ফলে এই দ্বন্দ্বে নতুন বিস্ফোরণের সম্ভাবনা যোগ হয়েছে। এর ফলে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলির জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

এই শতাব্দীর শুরু থেকে ডেম্রোক্রাটিক ও রিপাবলিকান, উভয় দলের শাসনকালেই ভারতকে প্রবল ভাবে সমর্থন জানিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের উন্নত অসামরিক পরমাণু জ্বালানী, ভারতকে ব্যবহার করতে দিয়েছে এবং ভারতের প্রতি নীতিগত পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ছিল নতুন দিল্লীকে তাদের কৌশলগত কার্যাবলীর অন্তর্গত করা।

সাম্প্রতিক কালে মার্কিন আতলান্তিক কমান্ডকে ইন্দো-মার্কিন কমান্ড হিসাবে নামকরণ করায় প্রমাণ হয় যে মার্কিন সামরিক পরিকল্পকরা দক্ষিণ এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরকে প্রবল গুরুত্ব দেয়। মনে রাখতে হবে, ভারত মহাসাগর সেই জলপথ যা দিয়ে চীনের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে চলার জন্য তেল ও অন্যান্য সম্পদ ওই দেশে আসে এবং চীনের রপ্তানি দ্রব্য ওই পথ দিয়েই ইউরোপ, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে যায়।

মোদির শাসনে ভারত মার্কিন যুদ্ধবিমান ও জাহাজের জন্য তাদের ঘাঁটিগুলি উন্মুক্ত করে দিয়ে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এবং তাদের প্রধান আঞ্চলিক মিত্রের (জাপান ও অস্ট্রেলিয়া) সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক, ত্রিপাক্ষিক ও চতুর্পাক্ষিক কৌশলগত সহযোগিতা বৃদ্ধি করে চীনের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক-কৌশলগত আক্রমণের ক্ষেত্রে ভারত যথার্থ এক “অগ্রগণ্য রাষ্ট্র”-তে পরিণত হয়েছে।

ঠান্ডা যুদ্ধের সময়ে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে যারা ওয়াশিংটনের প্রধান মিত্র ছিল, সেই ইসলামাবাদ ক্রমাগত উচ্চ কন্ঠে সাবধান করছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাজের ফলে ওই অঞ্চলের “শক্তির ভারসাম্য” ধ্বংস হয়ে গেছে এবং ভারত তাতে আরও বেশী সাহসী হয়ে উঠেছে। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হয়নি।

এর ফলস্বরূপ পাকিস্তান, যারা বেড়ে চলা ভারত-মার্কিন মৈত্রীতে ভয় পেয়েছে এবং চীনের সঙ্গে তাদের বহু বছরের সামরিক-কৌশলগত অংশীদারিকে নাটকীয়ভাবে শক্তিশালী করে তুলেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হিসাব কষে বুঝেছে যে এই মুহূর্তে একটি সর্বশক্তিক্ষয়ী দক্ষিণ এশীয় যুদ্ধ বাধলে তা তাদের বিশ্বব্যাপী লক্ষ্যে বাধার সৃষ্টি করবে। তাই তারা বর্তমান ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনাকে ঠান্ডা করতে চাইছে। কিন্তু বিশ্ব জুড়ে তাদের কর্তৃত্ব কায়েম করার এবং সবশেষে চীনকে আয়ত্তে আনার পথের কাঠামোর মধ্যে থেকেই এই কাজটা তারা করছে। এই কাজের অংশ হিসাবে ওয়াশিংটন একটি বিষয় পরিস্কার করে দিয়েছে - পাকিস্তানকে নিজেদের বেল্ট এবং সড়ক উদ্যোগের নোঙর বানাতে চীন যে প্রচেষ্টা করছে, এবং বিশেষ করে ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরের "গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলি" দখল করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনের ওপর যে অর্থনৈতিক অবরোধ সৃষ্টি করতে চাইছে, তার বিরোধীতা করতে চীন যে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক অলিন্দ ব্যবহার করছে, তা ব্যর্থ করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বদ্ধপরিকর।

অভিজাত শাসক শ্রেণীর এই অপরাধমূলক যুদ্ধ প্রস্তুতির বিরুদ্ধে ভারত ও পাকিস্তানের শ্রমিক শ্রেণী ও শোষিত শ্রেণীর একত্রিত হওয়া প্রয়োজন।

সারা বিশ্বের মতই দক্ষিণ এশিয়াতেও যুদ্ধবিরোধী সংগ্রাম পুঁজিবাদ-বিরোধী সংগ্রামের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই সংগ্রাম বিরোধী জাতীয়তাবাদী পুঁজিবাদী চক্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে, বাজার, লভ্যাংশ এবং কৌশলগত প্রাধান্যের লক্ষ্যে যাদের প্রবল সংগ্রাম বিশ্বকে পুণরায় ভাগ করার মধ্যে পূর্ণতা পায়। এই সংগ্রাম সেকেলে জাতি-রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যার মধ্যে শিকড় গেড়ে রয়েছে পুঁজিবাদ। দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রে এই সেকেলে জাতি-রাষ্ট্র ব্যবস্থা সাম্প্রদায়িকতায় ভরা।

বুর্জোয়াদের যুদ্ধ, কঠোরতা ও সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়াশীলতার কার্যাবলীর বিরুদ্ধে যে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন, তার অংশ হিসাবে যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বাধীন আন্দোলন গড়ে তুলতে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমিক ও সমাজতান্ত্রিক-মনস্ক যুবদের লড়াই করতে হবে।

এমন এক আন্দোলন গড়ে উঠতে পারে কেবলমাত্র ভারতের স্তালীনপন্থী রাজনৈতিক দলগুলি, যেমন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) বা সি-পি-আই-এম এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি বা সি-পি-আই এবং বিভিন্ন মাওপন্থী দলের বিরুদ্ধে করা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে। বিজেপি-র ডাকা যুদ্ধের সংকটকালীন "সর্বদলীয়" সভায় অংশগ্রহণ করে সি-পি-এম এবং সি-পি-আই আবার দেখালো যে তারা জাতীয়তাবাদী, সামরিক-পন্থী দল যারা সর্বনাশা যুদ্ধের বিপদের প্রতি জনগণকে অন্ধ করে রাখতে সাহায্য করছে। বহু দশক ধরে তারা ভারতীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে কাজ করে বহুবার কংগ্রেস পার্টির নেতৃত্বাধীন সরকারকে ক্ষমতায় আসতে সাহায্য করেছে। সেই সব সরকার নব্য-উদারনৈতিক পুণর্গঠনকে বাস্তবায়িত করেছে, ভারত-মার্কিন মৈত্রী গড়ে তোলার প্রচেষ্টা করে গেছে, এবং বুর্জোয়াদের প্রবল শক্তি হাতে পাওয়ার উচ্চাকাঙ্খা পূরণ করতে দ্রুত ভারতের সামরিক দক্ষতা বৃদ্ধি করে গেছে। মাওবাদীরা জাতীয়তাবাদে সম্পৃক্ত এবং শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক স্বাধীনতার সংগ্রামের পরিপন্থী।

আজকের দিনে চতুর্থ আন্তর্জাতিক যার প্রতিনিধি, লেনিন ও ট্রটস্কি সেই আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্র, শ্রমিকদের ক্ষমতা প্রদানের সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে সমাজের নিম্ন স্তর থেকে দেশভাগকে ব্যর্থ করার লড়াই এবং দক্ষিণ এশিয়ার সমাজতান্ত্রিক যুক্তরাষ্ট্র গঠন করার মধ্যে দিয়েই ভারত ও পাকিস্তানের শ্রমিকরা পুঁজিবাদী যুদ্ধ ও প্রতিক্রিয়াশীলতার বিকল্প খুঁজে পাবে।

Loading