ভারতের নির্বাচন এবং কঠোরতা, যুদ্ধ এবং সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়ার বিরোধীতা করার জন্য বৈপ্লবিক কর্মসূচি

কিথজোন্‌স্‌
৮ মে ২০১৯

ভারতের বহু-পর্যায়ের কেন্দ্রীয় নির্বাচনের প্রচার এক ভয়াবহ দৃশ্যদূষণে পরিণত হয়েছে। এই নির্বাচনী প্রচারের চূড়ান্ত সীমা স্পর্শ হবে ২৩শে মে-র ভোট গণনার মাধ্যমে। ভারতবর্ষের সরকার দেশের ১৩৭ কোটি মানুষের স্বাস্থ্যের খাতে যা খরচ করে, তার দুই-তৃতীয়াংশের বেশী, প্রায় ৭০০ কোটি ডলার খরচ করা হচ্ছে এই প্রচারের জন্য, যে প্রচারের অধিকাংশ জুড়ে রয়েছে নোংরা সাম্প্রদায়িক উস্কানি, হিংস্র হুমকি এবং মিথ্যা জনমোহনকারী প্রতিশ্রুতি।

প্রথম থেকেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও তার হিন্দু আধিপত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নির্বাচনের প্রচারের চরিত্র বেধে দিয়েছে। গত ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভারত অধিকৃত কাশ্মীরে হওয়া জঙ্গী আক্রমণকে নিজেদের অস্ত্র বানিয়ে নিয়ে একটা মিথ্যা যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে এবং পাকিস্তানের ভিতর বায়ুসেনাকে আঘাত হানতে নির্দেশ দিয়েছে। এটা পরিষ্কার যে তারা এটা করেছে মোদি "শক্তিশালি পুরুষ" রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে গুরুত্ব দিতে। তাদের লক্ষ্য বিপুল বেকারত্ব এবং ভারতের দীর্ঘ কৃষি সংকটের ফলে বেড়ে ওঠা জনরোষ চাপা দিয়ে তাদের হিন্দুত্ববাদী কর্মীদের মধ্যে আন্দোলন তৈরী করা।

মোদি গর্ব করে বলছে যে ভারত ইচ্ছা মতন পাকিস্তানকে শাস্তি দিতে পারে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী নিজেদের অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধা এবং রাজনৈতিক শক্তির দাবিকে যথাযথ প্রমাণ করতে চিরশত্রু ভারতের থেকে যে হুঁশিয়ারি পাচ্ছে তার প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য। ১৯৭১-এর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর গত ফেব্রুয়ারিতে প্রথমবার দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে যুদ্ধের পরিস্থিতি সবচেয়ে কাছাকাছি এসে গিয়েছিল।

সামরিক সংকট প্রকাশ পাওয়ার পর কংগ্রেস থেকে শুরু করে স্তালীনপন্থী ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিআই এবং ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) বা সিপিএম সহ সব বিরোধী দলগুলি সামরিক বাহিনীর প্রশংসাতে কে সবচেয়ে বেশী মুখর হবে তা নিয়ে মোদির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। তার "সার্জিকাল স্ট্রাইক" নিয়ে মোদির ক্রমাগত প্রচার এবং পাকিস্তানকে তোষণ করার জন্য বিরোধীদের মোদি যে নিন্দা করে, তার প্রতিক্রিয়ায় বিরোধীরা পাকিস্তানে বায়ুসেনার আক্রমণকে "রাজনৈতিক রঙ" দেবার জন্য বিজেপি সরকারের সমালোচনা করে।

কিন্তু ভারতকে আবার একটি সর্বগ্রাসী যুদ্ধের মুখে নিয়ে আসার জন্য মোদির সমালোচনা করে একটা কথাও কেউ বলেনি। এর কারণ সব বিরোধীরা - এবং এর মধ্যে স্তালীনপন্থীরাও রয়েছে - পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিক্রিয়াশীল, কৌশলগত বিরোধীতা সহ আরও বেশী শক্তির প্রতি ভারতের অভিজাত শাসক শ্রেণীর উচ্চাকাঙ্খাকে সমর্থন করে। তারা সবাই এক প্রধান সামরিক শক্তি হিসাবে ভারতের উত্থানকে সমর্থন করেছে। সামরিক খাতে সব চেয়ে বেশী খরচের নিরিখে ভারত বিশ্বে চতুর্থ। ভারতবর্ষকে চীনের বিরুদ্ধে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সামরিক-কৌশলগত আক্রমণের সামনের সারির রাষ্ট্র হিসাবে রূপান্তরিত করার যে ষড়যন্ত্র পর পর কংগ্রেস ও বিজেপি সরকারের নেতৃত্বে হয়েছে, তাতে এরা সবাই অংশীদার।

পাঁচ বছর আগে, গভীরে দানা বাঁধা সামাজিক ক্ষোভকে নেতৃত্ব দিয়ে বিজেপি নির্বাচন জিতেছিল। সেই নির্বাচনের প্রচারে তারা কর্মসংস্থানের ও উন্নয়নের কথা বলেছিল এবং মোদিকে নিজেদের প্রধানমন্ত্রীর প্রার্থী হিসাবে মনোনিত করেছিল। এই মোদি ২০০২ সালে গুজরাতে মুসলিম-বিরোধী দাঙ্গা ও গণহত্যায় উস্কানি দিতে এবং সংগঠিত করায় তার ভূমিকার জন্য প্রথম জাতীয় ক্ষেত্রে প্রচার পেয়েছিল।

এই নির্বাচনে মোদি ও বিজেপি তাদের হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িকতা দ্বিগুন করে দিয়েছে। এখন উস্কানি ছাড়া এমন একটা দিনও কাটে না যেদিন বিজেপি-র সভাপতি অমিত শাহ বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলিম শরণার্থীদের "ছাড়পোকা" ব'লে এবং তাদের বঙ্গোপসাগরে ছুঁড়ে ফেলে দেবার হুমকি দেন না বা মোদি একজন দাগী হিন্দু আধিপত্ববাদী জঙ্গীকে বিজেপি-র "তারকা" প্রার্থী বলেন না।

সামরিক-গোয়েন্দা ব্যবস্থা এবং ভারতের বড় ব্যবসাগুলির মধ্যে তাদের যে সমর্থন, তা-ই বিজেপি-কে সাহস জোগাচ্ছে। জনবিরোধী নয়া-উদারনৈতিক সংস্কার করার জন্য এবং বিশ্ব মঞ্চে তাদের স্বার্থের কথা বলার জন্য একটি "শক্তিশালী" সরকারের যে প্রয়োজন, তার জন্য ভারতের বড় ব্যবসাগুলি বিজেপি-কে তাদের সেরা বিকল্প হিসাবে দেখে। বিরোধী দলের মেরুদন্ডহীনতা এবং এই ষড়যন্ত্রে যোগ দেওয়া তাদের উদ্দীপনা জোগাচ্ছে। এই নির্বাচনের জন্য প্রচার করার সময় কংগ্রেস পার্টি এবং তাদের পারিবারিক নেতা, রাহুল গান্ধী, একের পর এক সাম্প্রদায়িক কাজ এবং নীতি ঘোষণা করেছেন, যাকে এমনকি কর্পোরেট প্রচারমাধ্যমও "হিন্দুত্বের মতন" প্রচার বলে অভিহিত করেছে।

কিন্তু নির্লজ্জ সাম্প্রদায়িক প্রতিক্রিয়ার দিকে বিজেপি ঝুঁকে পড়ার কারণ ক্রমবর্দ্ধমান সামাজিক ক্রোধের প্রতি তাদের ভয়। মোদি ও তার হিন্দুত্ববাদী দক্ষিণপন্থী দল বুঝতে পারছে যে তাদের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। গত আড়াই বছরে বিপ্লবী শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে ধর্মঘট ও প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছে যাতে গ্রাম ও শহরের মজুরদের এক বিরাট অংশ যোগদান করেছে। বিজেপি সরকারের হিংস্র নির্মমতা এবং বিনিয়োগকারীপন্থী নীতির প্রতিবাদে জানুয়ারি মাসে ডাকা দুই দিনের ধর্মঘটে সারা ভারতের লক্ষ লক্ষ শ্রমিক যোগ দিয়েছিলেন।

২০১৭ থেকে ভারত জুড়ে যে ধর্মঘট ও কৃষক প্রতিবাদ দেখা গেছে, তার কারণ কেবল বিজেপি বিরোধীতার চেয়ে অনেক গভীর। ১৯৯১ থেকে ভারতের কেন্দ্রে ও রাজ্যে সব সরকার যে বাজার-মুখী, বিনিয়োগকারীদের পক্ষে যে নীতি গ্রহণ করেছে, এরা তাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। ১৯৯১ সালে ভারতের স্বাধীনতাত্তোর রাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী উন্নয়নের ভরাডুবির পরে ভারতকে বিশ্ব পুঁজির জন্য সস্তা শ্রমের বাজারে পরিণত করতে ভারতের বুর্জোয়ারা সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধে।

একটি মারাত্মক সামাজিক আদেশ

মোদি সরকারের বিরোধীতা নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলবে তা এখনওপরিষ্কার নয়।

বিজেপি-র সব বিরোধীরাই প্রবল ভাবে নিন্দিত। তারা নিজেরাই বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে নীতি প্রণয়ন করেছে, দারিদ্রের সৃষ্টি করেছে এবং প্রবল বেগে সামাজিক অসাম্য যাতে সৃষ্টি হয়, তার দিকে নজর রেখেছে।

কংগ্রেস, যারা কিছুদিন আগে পর্যন্তও সরকার গড়ার জন্য বুর্জোয়াদের পছন্দের দল ছিল, আর উত্তর ভারতের বিরাট অংশে নির্বাচনে প্রতিযোগিতা জানানোর অবস্থায় নেই। নির্বাচনের উত্তেজনা সৃষ্টি করতে এবং "তাজা রক্ত" নিয়ে আসার মরিয়া প্রচেষ্টায় তারা তাদের তারকা প্রচারক হিসাবে প্রিয়াঙ্কা ভদ্রার নাম ঘোষণা করেছে। এই প্রিয়াঙ্কা ভদ্রা রাহুল গান্ধীর বোন, যাদের মা, বাবা, ঠাকুমা ও ঠাকুমার বাবা - সবাই তাদের আগে কংগ্রেস পার্টির সভাপতি ছিল (শেষোক্ত তিনজন ভারতের প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন)।

বড় ব্যবসাদার দুই দলের বিরুদ্ধে জমে থাকা জনরোষের সুযোগ নেবার আশা বহু আঞ্চলিক ও জাতি-ভিত্তিক দল এই নির্বাচনে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড প্রোগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স এবং বিজেপি-র ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স (এন-ডি-এ)-এর থেকে স্বাধীন ভাবে লড়ছে। এই সব দলগুলি আগে দক্ষিণপন্থী কংগ্রেস ও বিজেপি সরকারে অংশগ্রহণ করেছে। তারা শ্রমিক শ্রেণীকে অন্যদিকে চালিত করতে এবং ভাগ করতে, আর বিভিন্ন বুর্জোয়া ও পেটি-বুর্জোয়া অংশের ক্ষমতার জন্য উগ্র-জাতীয়তাবাদী ও জাতিভিত্তিক আবেদন জানায়।

"গণতন্ত্রবাঁচানো" এবং "দেশবাঁচানো"-রনামেস্তালীনপন্থীরাএবংতাদেরবামফ্রন্টবিজেপি-কে পাল্টাতে নির্লজ্জভাবেবুর্জোয়াদেরআরেকটিদক্ষিণপন্থীসরকারকেসমর্থনকরছে, যারনেতৃত্বেসম্ভবতকংগ্রেসথাকবে।তারা "বিজেপিছাড়াযেকেউ" নামকএকটিপ্রচারচালাচ্ছেএবংশ্রমিকদেরবলছেযেদলএইমুহূর্তেবিজেপি-কেহারাতেশ্রেষ্ঠস্থানেআছে, তাদেরসমর্থনকরতে।তারসাথেতারাপ্রচারকরছেকিভাবেতারা১৯৮৯থেকে২০০৮-এরমধ্যে "বিজেপি-হীনসরকার" গঠনকরতেঅন্যতমভূমিকানিয়েছে।

এই সকল সরকার, বিশেষ করে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন নরসীমা রাও (১৯৯১-৯৬) এবং মনমোহন সিং (২০০৪-২০১৪)-এর সরকার মোদি সরকার আসার পথ পরিষ্কার করে দিয়েছে। আগের জন লগ্নিকারীদের পক্ষে "বিগ ব্যাং" নীতির প্রথম ঢেউ নিয়ে এসেছিল এবং পরের জন সেটাকেই এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল বেসরকারীকরণ, নিয়ন্ত্রণ ও বাজারীকরণ এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের "বিশ্বব্যাপী কৌশলগত অংশীদার" হয়ে।

নির্বাচনের ফলাফল বা ভারতের পরের সরকারের গঠন যেমনই হোক্‌ - সরকার বিজেপির নেতৃত্বাধীন হোক্‌, কংগ্রেসের হোক্‌ বা ছোটো দলগুলির "ফেডারেল ফ্রন্ট" হোক্‌ - সেই সরকার নির্মম ও প্রতিক্রিয়াশীল হবেই। বুর্জোয়াদের লক্ষ্যের রূপরেখা টাইম্‌স্‌ অফ্‌ ইন্ডিয়া-র "নির্বাচনের পর: ভারতের কৌশলগত উত্থানের জন্য অর্থনৈতিক সংস্কার ও সঠিক মৈত্রী স্থাপন প্রয়োজন" নামক একটি সম্পাদকীয়তে দেওয়া হয়েছিল। সেই সম্পাদকীয়র দাবি অনুযায়ী, "দৃঢ় অর্থনৈতিক সংস্কার" এবং ভারত-মার্কিন মৈত্রীকে আরও শক্তিশালী করে তোলা অত্যন্ত প্রয়োজন। তার সাথে প্রয়োজন "Quad" গঠনের কাজ শুরু করা, যা NATO-র মতন চীন-বিরোধী জোট, যে জোটে থাকবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং ভারত।

কয়েক দশকের লগ্নিকারীপন্থী নব্য-উদারনৈতিক সংস্কারের প্রভাব যে বিপ্লবী শ্রমিক শ্রেণীকে ধ্বংস করেছে, তাদের সঙ্গে ভারতের পরের সরকারের প্রাথমিক সংঘর্ষ অবধারিত।

তার জন্য প্রস্তুত হতে সকল শ্রেণী সচেতন শ্রমিক ও যুবদের এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে শ্রমিক শ্রেণীকে একটি স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে গড়ে তুলতে হবে, এবং গ্রামীণ শ্রমিক এবং সব শোষিত মানুষদের তাদের সমর্থনে নিয়ে এসে শ্রমিকদের সরকার গড়ে তোলার জন্য লড়াই করতে হবে।

"স্বাধীন"ভারতেরসাতদশকেরবেশীসময়েরইতিহাসবুর্জোয়াদেরদিকেঅভিযোগেরপ্রমাণএবংনেতিবাচককার্য্যক্রমযা১৯১৭সালেরুশবিপ্লবেরসূচনাকরেছিল।এইরুশবিপ্লবেরসঙ্গেচিরকালএকহয়েথাকবেদুটিনাম–লিওট্রটস্কিওচিরস্থায়ীবিপ্লব।যেদেশগুলিঐতিহাসিকভাবেসাম্রাজ্যবাদদ্বারাঅত্যাচারিত, সেখানেগণতান্ত্রিকবিপ্লবেরসাধারণকাজগুলিসমাধাকরাসম্ভবকেবলমাত্রশ্রমিকশ্রেণীরনেতৃত্বাধীনসমাজতান্ত্রিকবিপ্লবেরমধ্যেদিয়েএবংবিশ্বব্যাপীসমাজতন্ত্রেরজন্যসংগ্রামেরঅংশহিসাবে।

সমসাময়িক পুঁজিবাদী ভারতের সমাজ রোগাক্রান্ত। এখানে জাত-প্রথা, জমিদারি প্রথা, চুক্তি ভিত্তিক্ক শ্রম এবং সামন্ততন্ত্রের অন্যান্য চিহ্ন বিশ্ব জুড়ে সংগঠিত পুঁজিবাদী শোষনের উন্নত শক্তির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এই সমাজের শীর্ষে অপরাধীরাই শাসন করে। ভারতের নতুন ১৩০ জন ধনকুবের এবং বাকি পুঁজিবাদী অভিজাত শ্রেণী রাষ্ট্রশক্তির হিংসা এবং বিভাজন ও শাসন এবং জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ব্যবহার করে সামাজিক বিরোধীতা দমন করে এবং প্রবল ধন সম্পত্তি ভোগ করে।এর পথ দেখিয়ে গিয়েছিল ভারতে অতীতে শাসন করা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রভুরা।

ভারতের এখনকার সামাজিক বৈষম্য ব্রিটিশ শাসনের সময়কার সামাজিক বৈষম্যেকে হার মানাবে। ওপরের ১ শতাংশ মানুষ ভারতের ৭১ শতাংশ সম্পত্তির অধিকারি, আর অসংখ্য মানুষ দিনে ২ ডলারের কমে বেঁচে থাকে। আর মোদি বিশ্ব মঞ্চে লগ্নি আনার ঢাক পেটায় এই বলে যে ভারতে শ্রমিকের মজুরি চীনের মজুরির এক-চতুর্থাংশ।

বিশ্ব পুঁজিবাদ ভেঙে পড়া, বাণিজ্য যুদ্ধ এবং বেড়ে চলা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মুখে ভারতের অভিজাত শাসক শ্রেণী অত্যন্ত নির্মম ও উস্কানিদায়ক ভূমিকা নিচ্ছে। তাদের এই ভূমিকার মধ্যে তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে আরও নিবিড় ভাবে কূটনৈতিক ভাবে এবং সামরিক ভাবে জড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে চীনের বিরুদ্ধে তাদের সামরিক সংগঠনে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে ভারতের অভিজাত শাসক শ্রেণী উৎসাহ জোগাচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন দিল্লি ওয়াশিংটনের থেকে যে কোনো কৌশলগত সাহায্য নিতে চাইছে ভারতকে তার আগ্রাসন, ষড়যন্ত্র এবং সামরিক কার্য্যকলাপ বাড়িয়ে চলতে ও অঞ্চলে নিজের কতৃত্ব কায়েম করতে।

প্রতিক্রিয়াশীল ভারত-পাকিস্তান ও চীন-ভারত যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-চীন কৌশলগত দ্বন্দ্বের অঙ্গ। এই দ্বন্দ্ব এশিয়া ও বিশ্বের শ্রমিক শ্রেণীর কাছে এক বিশাল বিপদ। গত সেপ্টেম্বর ২০১৬ থেকে ভারত যে তিনটি সামরিক সংকটে জড়িয়ে পড়েছে - পাকিস্তানের সঙ্গে দুটি এবং গত ২০১৭-র গ্রীষ্মে চীনা সৈন্যদের সঙ্গে হিমালয়ের একটি উপত্যকা দখল করা নিয়ে দশ সপ্তাহের মুখোমুখি - সেগুলি এই বিষয়টিই প্রমাণ করছে।

স্তালীনপন্থা এবং হিন্দু আধিপত্ববাদী দক্ষিণপন্থার উত্থান

শ্রমিক শ্রেণীকে আন্তর্জাতিক সমাজতন্ত্রের কার্য্যক্রম দিয়ে রাজনৈতিকভাবে সশস্ত্র করার সংগ্রামের জন্য প্রয়োজন স্তালীনপন্থার সঙ্গে সব হিসাব চোকানো।

সিপিএম, সিপিআই এবং তাদের ট্রেড ইউনিয়ন শাখাগুলি বহু দশক ধরে বুর্জোয়া রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসাবে কাজ করেছে। ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে যে জ্বলন্ত অসঙ্গতি, তার জন্য তারাই দায়ী। গত তিন দশকের পুঁজিবাদী বিস্তারের ফলে শ্রমিক শ্রেণীর আয়তন ও সামাজিক শক্তি প্রবল ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তা সত্ত্বেও বুর্জোয়ারা শ্রমিকদের দ্বারা উৎপাদিত সম্পত্তির আরও বেশী ভাগ নিতে সক্ষম হয়েছে, কারণ শ্রমিকরা রাজনৈতিক ভাবে বঞ্চিত।

শাসক শ্রেণীর আক্রমণের বিরোধী না করা কিন্তু এর কারণ নয়। এর কারণ স্তালীনপন্থীরা শ্রেণী সংগ্রামকে পদ্ধতিগতভাবে দমন করেছে এবং বুর্জোয়াদের নব্য-উদারনৈতিক নীতি কার্য্যকর করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিজেপি-কে ক্ষমতা পাওয়া থেকে আটকানোর জন্য একাধিক দক্ষিণপন্থী কেন্দ্রীয় সরকারকে সমর্থন জানানো, এবং তারা নিজেরা যাকে "বিনিয়োগকারীদের পক্ষ নেওয়া" বলে, একসময় তাদের শাসনে থাকা রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ কেরল এবং ত্রিপুরাতে সেই কাজই করা।

এর ফলে বুর্জোয়ারা তাদের সামাজিক ভাবে প্রতিক্রিয়াশীল কর্মসূচি বাস্তবায়িত করতে সক্ষম হচ্ছে। এবং স্তালীনপন্থীরা শ্রমিক শ্রেণীকে রাজনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে এবং সামাজিক সংকট গুলির ক্ষেত্রে তাদের নিজেদের সমাজতান্ত্রিক সমাধান ব্যবহার করতে দিচ্ছে না। স্তালীনপন্থীরা দক্ষিণপন্থী ব্যবস্থা সমর্থন করছে এবং বাস্তবায়ন করছে। এর ফলে হিন্দুত্ববাদী দক্ষিণপন্থীরা জনগণের মধ্যে আসা হতাশা ও অর্থনৈতিক সংকট তীব্রতর হওয়ার ভয়কে দূর করতে সক্ষম হচ্ছে।

গত তিন দশকে সি-পি-এম ও সি-পি-আই-এর প্রধান লক্ষ্য ছিল বিজেপি-র বিরোধীতা করা। এবং এই তিন দশকের পরে, আজ এই হিন্দু আধিপত্ববাদীরা আগের থেকে বেশী শাক্তিশালী।

আজ, ভারতের তীব্রতর হয়ে ওঠা শ্রেণী সংগ্রামের এবং বিশ্ব জুড়ে শ্রমিক শ্রেণী বিরোধী শক্তি হিসাবে উঠে আসার প্রতিক্রিয়া হিসাবে স্তালীনপন্থীরা বুর্জোয়াদের কাছে, তাদের দলের কাছে এবং তাদের রাষ্ট্রের কাছে শ্রমিক শ্রেণীকে শৃঙ্খলিত করার প্রচেষ্টা আবার দ্বিগুন করে তুলছে।

এছাড়াওএইবিষয়টিতাদেরএইদাবিকেমিথ্যাপ্রতিপন্নকরবেযেভারতরাষ্ট্রটিএকটি "গণতান্ত্রিক" কাঠামোযারওপরসাধারণমানুষভরসাকরতেপারেসাম্প্রদায়িকতারবিরোধীতাকরারজন্য।

১৩ জন মারুতি সুজুকি শ্রমিকদের রক্ষা করার জন্য শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রতি তাদের প্রবল বিরোধীতায় ক্রমবর্দ্ধমান শ্রমিক আন্দোলনের প্রতি স্তালীনপন্থীদের মনোভাব প্রকাশ পায়। ভারতের সর্ববৃহৎ অটোমোবাইল প্রস্তুতকারক সংস্থার সামান্য মাইনে ও ভয়াবহ কাজের পরিবেশের বিরোধীতায় নেতৃত্ব দেবার জন্য এই ১৩ জন শ্রমিকের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে তাদের যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত করা হয়েছে। সি-পি-এম, সি-পি-আই এবং তাদের ইউনিয়নগুলি, যথাক্রমে সেন্টার অব ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়নস্‌ (সি-আই-টি-ইউ) এবং অল্‌ ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (এ-আই-টি-ইউ-সি) মারুতি সুজুকি শ্রমিকদের প্রসঙ্গে কিছু উচ্চারণ করবে না, কারণ স্বাধীনতার জন্য সেই শ্রমিকদের যে সংগ্রাম তা এই শ্রমিকদের বিরুদ্ধে অন্যায় ভাবে ষড়যন্ত্র শুরু করা কংগ্রেস পার্টির সঙ্গে এবং মালিক পক্ষের সঙ্গে এই স্তালীনপন্থী দলগুলির আরামদায়ক সম্পর্ককে আক্রমণ করে। এছাড়াও এই বিষয়টি তাদের এই দাবিকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে যে ভারত রাষ্ট্রটি একটি "গণতান্ত্রিক" কাঠামো যার ওপর সাধারণ মানুষ ভরসা করতে পারে সাম্প্রদায়িকতার বিরোধীতা করার জন্য।

ওয়ার্ল্ড সোশ্যালিস্ট ওয়েবসাইট ভারতীয় শ্রমিক, যুব এবং সমাজতান্ত্রিক-মনস্ক পেশাদারদের আহ্বান জানাচ্ছে বিপ্লবী নেতৃত্বের সাহায্যে স্বাধীন রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে এবং শ্রমিক শ্রেণীকে আন্তর্জাতিক ভাবে একত্রিত করে তুলতে। যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করতে এবং দক্ষিণ এশিয়ার সমাজতান্ত্রিক যুক্তরাষ্ট্র সৃষ্টির জন্য অত্যন্ত প্রয়োজন দক্ষিণ এশিয়ার জনগণকে প্রতিক্রিয়াশীল, জাতিগত-সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রসীমানার বাইরে নিয়ে আসা। ১৯৪৭-৪৮ সালে চলে যাবার সময় ব্রিটিশ রাজের ঔপনিবেশিক প্রভুরা এবং দেশী প্রতিদ্বন্দ্বী বুর্জোয়ারা এই রাষ্ট্রসীমানার সৃষ্টি করেছিল।

চিরস্থায়ী বিপ্লবের এই নীতি চতুর্থ আন্তর্জাতিকের রাজনৈতিক কর্মকান্ডের মধ্যে প্রতিমূর্ত হয়। চতুর্থ আন্তর্জাতিক বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পার্টি। ১৯১৭-র রুশ বিপ্লবের প্রতি স্তালীনপন্থী বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে ১৯৩৮ সালে এই দল প্রতিষ্ঠা করেন লিও ট্রটস্কি। ১৯৫৩ সাল থেকে এই দলকে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছে চতুর্থ ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক কমিটি। এর লক্ষ্য বাস্তবায়িত করতে শীঘ্রই আই-সি-এফ-আই-এর ভারতীয় শাখা সৃষ্টি করা একান্ত প্রয়োজন।