বাংলা
Perspective

মে দিবস ২০২২ এর ভাষণ

ন্যাটো-রাশিয়ার যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেণীর কর্তব্য

আমরা এখানে ১লা মে, ২০২২শে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মে দিবস এর অনলাইন সমাবেশে ডেভিড নর্থের দেওয়া উদ্বোধনী প্রতিবেদন প্রকাশ করছি। নর্থ বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ওয়েব সাইটের আন্তর্জাতিক সম্পাদকীয় বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং আমেরিকার সোশ্যালিষ্ট ইকোয়ালিটি পার্টির জাতীয় চেয়ারম্যান।

এবারের মে দিবসটি ব্যতিক্রমী পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিশ্ব একটি পারমাণবিক বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে যা হুমকি দিচ্ছে এই গ্রহ থেকে জীবন বিলুপ্তি করার। ২০২২ সালের মে দিবসের চ্যালেঞ্জ হল এই উদযাপনকে শ্রমিক শ্রেণীর আন্তর্জাতিক ঐক্যের জন্য গড়ে তোলা যা বিশ্বের জনসংখ্যার ব্যাপক জনগোষ্ঠীর একটি বৈশ্বিক আন্দোলনের সূচনা করবে পারমাণবিক সংঘাতের দিকে ধাবিত ন্যাটো-রাশিয়া যুদ্ধের অপরাধমূলক ও বেপরোয়া বৃদ্ধি থামাতে এবং জোরপূর্বক তা শেষ করতে ।

এই সংগঠনের, বিকাশ এবং আন্দোলনের বিজয়ের জন্য যুদ্ধের কারণ এবং এটি যে স্বার্থ পরিবেশন করে সে সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে বোঝা দরকার।

অন্তর্জাতিক মে দিবস এর সভা ২০২২

চতুর্থ অন্তর্জাতিকের আন্তর্জাতিক কমিটি, ওয়ার্ল্ড পার্টি অফ সোশ্যালিস্ট রেভোলিউশন, দ্ব্যর্থহীনভাবে মার্কিন ও ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদকে রাশিয়ার সাথে সংঘাত উসকে দেওয়ার জন্য নিন্দা করে। এটি ইউক্রেন বা বিশ্বের অন্য কোথাও গণতন্ত্র রক্ষা করার যুদ্ধ নয়। এটি এমন একটি যুদ্ধ যার লক্ষ্য বিশ্বের পুনর্বিভাজন, অর্থাৎ বিশ্বের বস্তুগত সম্পদের নতুন ভাগ বাঁটোয়ারা করা।

রাশিয়া মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে পুতিন সরকারের স্বৈরাচারী চরিত্রের কারণে নয়, বরং প্রথমত, রাশিয়ার পুঁজিবাদীদের স্বার্থের প্রতিরক্ষার সাথে বিশ্বব্যাপী আধিপত্যের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে অভিযান তার সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে, যার প্রস্তুতির কেন্দ্রে রয়েছে চীনের সাথে যুদ্ধ; এবং, দ্বিতীয়ত, রাশিয়ান ভূখণ্ডের বিশাল বিস্তৃতি হল অপরিমেয় মূল্যবান এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল, ধাতু এবং খনিজ পদার্থ গুলি - সোনা, প্ল্যাটিনাম, প্যালাডিয়াম, দস্তা, বক্সাইট, নিকেল, পারদ, ম্যাঙ্গানিজ, ক্রোমিয়াম, ইউরেনিয়াম, লোহা আকরিক, এবং ইরিডিয়াম, শুধুমাত্র কয়েকটির নাম বলা হল -যা যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে বদ্ধপরিকর।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে জোটবদ্ধ অন্যান্য প্রধান সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোও একইভাবে তাদের নিজেদের প্রতিক্রিয়াশীল অর্থনৈতিক ও ভূ-কৌশলগত স্বার্থ অনুসরণ করছে। ইউক্রেনের সংঘাতে জার্মান সাম্রাজ্যবাদকে - যা ১৯৪১ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে ধ্বংসের যুদ্ধ চালিয়েছিল - নাৎসি শাসনের পতনের পর সবচেয়ে ব্যাপকভাবে পুনরায় অস্ত্রসজ্জার অভিযান চালানোর সুযোগ পেয়েছে৷ বরাবরের মতো, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ আমেরিকান নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী, এই আশায় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তার 'বিশেষ সম্পর্ক' এটিকে যুদ্ধের লুণ্ঠনের মালকে সুবিধাজনক বন্টনের অধিকারী করবে। ফরাসি সাম্রাজ্যবাদীরা আশা করে যে রাশিয়ার বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধকে অনুমোদন দেবার ফলে, তা অনিচ্ছা সত্ত্ব হলেও, আমেরিকা আফ্রিকায় ফরাসি অভিযানে হস্তক্ষেপ করবে না। এমনকি ন্যাটো জোটে থাকা কম শক্তিগুলিও মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে সমর্থনের জন্য কিছু পাবার প্রত্যাশা করে, উদাহরণস্বরূপ, পোল্যান্ড ভুলে যায়নি যে লভিভ এক সময় পোলিশ শহর লুও(Lwow) ছিল।

ইউক্রেনের পবিত্র অধিকারের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বান, একটি সার্বভৌম জাতি হিসাবে, ন্যাটোতে যোগদান করা যদি এটি তা পছন্দ করে, ওয়াশিংটন সেই অধিকারের সম্প্রসারণকে কোন দেশের জন্যই স্বীকৃতি দেয় না যার জাতীয় প্রতিরক্ষার স্বার্থ আমেরিকা হুমকি হিসাবে দেখে। নিরাপত্তা এমনকি যখন ইউক্রেনে সঙ্কট ঘনিয়ে উঠছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সলোমন দ্বীপপুঞ্জকে – যা আমেরিকান পশ্চিম উপকূল থেকে ৬,০০০ মাইল দূরে - চীনের সাথে প্রতিরক্ষামূলক সম্পর্কে প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকতে, না মানলে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিচ্ছে৷

ন্যাটো আগ্রাসী রাশিয়ার দ্বারা রাজনৈতিকভাবে নির্দোষ ইউক্রেনে একটি 'বিনা প্ররোচনায়' আক্রমণের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে, হারানো 'সোভিয়েত সাম্রাজ্য' পুনরুদ্ধারের অভিপ্রায়ে, এই দাবিগুলি হল এক গুচ্ছ মিথ্যা৷ যুদ্ধের পটভূমির একটি বস্তুনিষ্ঠ অধ্যয়ন স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২-এ রাশিয়ার আক্রমণ ছিল ন্যাটোর নিরলস সম্প্রসারণের জন্য একটি মরিয়া প্রতিক্রিয়া। গত দুই মাসে যুদ্ধের বিকাশে স্পষ্টভাবে দেখা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো ইউক্রেনীয় বাহিনীকে সশস্ত্র এবং প্রশিক্ষিত করছে, নব্য-নাৎসি উপাদানগুলি যারা আজভ ব্যাটালিয়নের সাথে জড়িত তাঁদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটি ছায়া যুদ্ধ চালাতে।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে ন্যাটোর ব্যাপক সংহতি আগ্রাসণ একটি অপ্রত্যাশিত, অপরিকল্পিত এবং উন্নত প্রতিক্রিয়া ছিল এমন ভান রাজনৈতিকভাবে নিষ্পাপদের জন্য একটি রূপকথার গল্প। এটি এমন একটি যুদ্ধ যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো চেয়েছিল, ছক কষেছিল, প্রস্তুতি নিয়েছিল এবং প্ররোচিত করেছিল। ২০০৫-এর প্রাথমিক 'কমলা বিপ্লব' এবং বিশেষত, ২০১৪ সালে রাশিয়াপন্থী ইয়ানুকোভিচ সরকারকে পতনের জন্য ওবামা প্রশাসন কর্তৃক আয়োজিত ময়দান পুটস( Maidan putsch) , মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সাথে যুদ্ধের জন্য একটি পথ তৈরি করেছে৷

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটো যুদ্ধের পরিকল্পনা বা প্ররোচনা দেয়নি এমন বিদ্রুপকারী দাবি আন্তর্জাতিক কমিটির বারবার দেওয়া সতর্কবার্তার দ্বারা সবচেয়ে শক্তিশালীভাবে খণ্ডন করা হয়েছে। ২০১৪ সালে আন্তর্জাতিক কমিটি এবং বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ওয়েব সাইট দ্বারা আয়োজিত প্রথম অনলাইন মে দিবসের সমাবেশে, আমরা ময়দান পুটশের মাত্র কয়েক মাস পরে সতর্ক করে দিয়েছিলাম যে, 'ইউক্রেনের সঙ্কটটি ইচ্ছাকৃতভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জার্মানির সুসমন্বয়সাধনের মাধ্যমে উস্কে দিয়েছিল কিয়েভে একটি অভ্যুত্থান ঘটাতে। এই অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য ছিল ইউক্রেনে এমন একটি শাসনকে ক্ষমতায় আনা যা মার্কিন ও জার্মান সাম্রাজ্যবাদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ওয়াশিংটন এবং বার্লিনের চক্রান্তকারীরা বুঝতে পেরেছিল যে এই অভ্যুত্থান রাশিয়ার সাথে সংঘর্ষের দিকে নিয়ে যাবে। প্রকৃতপক্ষে, একটি সংঘর্ষ এড়ানোর চেষ্টা থেকে অনেক দূরে, জার্মানি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই বিশ্বাস করে যে তাদের সুদূরপ্রসারী ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ বাস্তবায়নের জন্য রাশিয়ার সাথে সংঘর্ষ প্রয়োজন।'

আজ থেকে ঠিক ছয় বছর আগে, ২০১৬ সালের মে দিবসের সমাবেশে, আমরা সতর্ক করেছিলাম যে বিশ্বব্যাপী আধিপত্যের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান এটিকে রাশিয়া এবং চীনের সাথে যুদ্ধের পথে নিয়ে গেছে। আমরা বলেছি:

পেন্টাগন এবং সিআইএ কৌশলবিদদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিশ্বাস করে যে চীনের কৌশলগত বিচ্ছিন্নতার জন্য এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং ভারত মহাসাগর অঞ্চলেই কেবল আমেরিকান নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই ইউরেশিয়াকে আধিপত্য করতে হবে, যা আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির পাঠ্যপুস্তকে 'বিশ্ব দ্বীপ' হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এইটি হল কৌশলগত উদ্দেশ্য যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান সংঘাতের মধ্যে অন্তর্নিহিত। 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উত্তেজনার এমণ একটি স্তরে পৌঁছেছে যা সমান, যদি না এটি ইতিমধ্যেই অতিক্রম করে থাকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে ১৯৩০ এর দশকের শেষের দিকে যেমণ ছিল। জার্মানি এবং জাপান সহ সমস্ত প্রধান সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি তাদের সামরিক প্রতিশ্রুতি বৃদ্ধি করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং রাশিয়ার মধ্যে একটি দ্বন্দে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার জড়িত হতে পারে তা ইতিমধ্যেই স্বীকার করা হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির রাজনৈতিক ও সামরিক নেতারা বা বেজিং এবং মস্কোতে তাদের শঙ্কিত প্রতিপক্ষরা কখনোই পারমাণবিক যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক পরিণতির ঝুঁকি নেবে না বলে অনুমান করা সবচেয়ে বড় ভুল হবে।

এক বছর পর, ২০১৭ সালের মে দিবসের সমাবেশে, আমরা ভবিষ্যতের সামরিক সংঘাতে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাব্যতা নিয়ে মার্কিন কৌশলবিদদের মধ্যে আলোচনার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করার ডাক দেই। আমরা বিভিন্ন কৌশল উদ্ধৃত করেছি যা পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহারকে অন্তর্ভুক্ত করে, যার মধ্যে রয়েছে ১) একটি অ-পরমাণু প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পারমাণবিক ব্যবহার; ২) একটি প্রতিপক্ষ দেশের প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা দূর করার লক্ষ্যে প্রথমেই আক্রমণ; ৩) প্রতিপক্ষকে পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য করার জন্য পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করার হুমকি; এবং ৪) সীমিত পারমাণবিক যুদ্ধের সূচনা। আমরা জিজ্ঞেস করেছিলাম:

কারা সেই উন্মাদ যে এই কৌশল তৈরি করেছে? এই কৌশলগুলির যে কোনও একটিকে বিবেচনা করার ইচ্ছা, নিজেই, একটি উন্মাদনার লক্ষণ। পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার অগণনীয় পরিণতি বয়ে আনবে। এই বাস্তবতা কি শাসক শ্রেণীকে যুদ্ধ অবলম্বন করা থেকে বিরত রাখবে? বিংশ শতাব্দীর সমগ্র ইতিহাস, একুশ শতকের প্রথম ১৭ বছরের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ না করে, এমন আশাব্যঞ্জক ধারণার বিরুদ্ধে যুক্তি দেয়। শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক কৌশল হতে হবে বাস্তবতার উপর ভিত্তি করে, আত্মপ্রতারণার আশায় নয়।

আরও একটি উদ্ধৃতি: ২০১৯ সালের মে দিবসের সমাবেশে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক সংকটের পটভূমিতে, আমরা বলেছিলাম:
অভ্যন্তরীণ নীতি পরিচালনায় সাংবিধানিক নিয়ম লঙ্ঘন এবং বৈদেশিক নীতিতে গ্যাংস্টার পদ্ধতির অবলম্বন, চূড়ান্ত বিশ্লেষণে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সংকটের মূলে রয়েছে। ইউরোপ এবং এশিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে বিশ্বব্যাপী আধিপত্যের অবস্থান বজায় রাখার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মরিয়া প্রচেষ্টার জন্য একটি স্থায়ী এবং ক্রমবর্ধমান যুদ্ধের অবস্থার প্রয়োজন।

এই বেপরোয়া নীতি ট্রাম্পের সাথে বা তাকে ছাড়াই প্রাধান্য পাবে। প্রকৃতপক্ষে, রাশিয়া-বিরোধী হিস্টিরিয়া যে ডেমোক্রেটিক পার্টিকে আঁকড়ে ধরেছে তা সন্দেহ করা যুক্তিযুক্ত করে তোলে যে, হোয়াইট হাউস পুনরুদ্ধার করতে পারলে বিশ্বযুদ্ধের বিপদ আরও বেশি হবে।

ঘটনা আমাদের সতর্কতা নিশ্চিত করেছে. পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী আন্দোলন ছাড়া আর কিছুই সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের ভয়ানক যুক্তি ও এর ফলাফলের প্রকাশকে থামাতে পারে না। এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধুমাত্র মার্কিন-ন্যাটো সাম্রাজ্যবাদের নিন্দা করতেই নয়, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের প্রতি আমাদের মনোভাবকেও নির্দেশ করে।

ন্যাটোর দ্বারা পরিচালিত যুদ্ধের সাম্রাজ্যবাদী চরিত্র আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেণীর দৃষ্টিকোণ থেকে, রাশিয়ান সরকারের দ্বারা ইউক্রেন আক্রমণের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে না। আন্তর্জাতিক কমিটি এই আক্রমণকে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াশীল বলে নিন্দা জানিয়েছে। পুতিন সরকারের আগ্রাসনের সিদ্ধান্ত হাজার হাজার নিরীহ ইউক্রেনীয়কে হত্যা ও আহত করেছে যারা দুর্নীতিগ্রস্ত কিয়েভ সরকারের নীতির জন্য কোনোভাবেই দায়ী নয়, রাশিয়ান ও ইউক্রেনীয় শ্রমিক শ্রেণীকে বিভক্ত করেছে এবং ওয়াশিংটন ডিসি- এবং ল্যাংলি, ভার্জিনিয়াতে সাম্রাজ্যবাদী কৌশলবিদদের হাতে খেলেছে (সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির সদর দফতর)। এটি জার্মান সাম্রাজ্যবাদকে ব্যাপকভাবে পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ দিয়েছে।

চূড়ান্ত বিশ্লেষণে, রাশিয়ার সামনে এখন যে বিপদগুলি রয়েছে তা হল, ১৯৯১ সালে স্তালিনবাদী আমলাতন্ত্র দ্বারা সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি এবং পুঁজিবাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠার পরিণতি৷ সোভিয়েত ইউনিয়নের ধ্বংস - ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবকে নির্দেশিত সমাজতান্ত্রিক আন্তর্জাতিকতাবাদের নীতিগুলিকে স্ট্যালিনবাদী প্রত্যাখ্যানের ফলাফল - তিনটি বিপর্যয়কর মিথ্যা ধারণার উপর ভিত্তি করে ছিল যা সোভিয়েত আমলাতন্ত্র দ্বারা উতসাহীতভাবে গ্রহণ করা হয়েছিল।

প্রথমটি ছিল পুঁজিবাদ পুনরুদ্ধারের ফলে রাশিয়ার দ্রুত সমৃদ্ধি ঘটবে। দ্বিতীয়টি ছিল আমলাতান্ত্রিক শাসনের বিলুপ্তির ফলে বুর্জোয়া গণতন্ত্র প্রস্ফুটিত হবে। তৃতীয়টি ছিল যে পুঁজিবাদী রাশিয়া তার বিপ্লবী উত্তরাধিকারকে প্রত্যাখ্যান করার ফলে রাষ্ট্রগুলির মধ্যে সুখী ভ্রাতৃত্বের সাথে শান্তিপূর্ণভাবে একীভূত হবে। এইসব ভ্রান্ত প্রত্যাশা বাস্তবে চূর্ণ হয়েছে।

লিও ট্রটস্কির সতর্কতা, তার ১৯৩৬ সালের গ্রন্থ, দ্য রেভলিউশন বিট্রেয়েড-এ বুদ্ধিদিপ্তভাবে বিশদে বর্ণনা করা হয়েছে, তা প্রমাণিত হয়েছে। পুঁজিবাদী পুনরুদ্ধারের ফলে রাশিয়ান জনসংখ্যার বড় অংশের মধ্যে দারিদ্র্য দেখা দিয়েছে, আমলাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে স্বৈরাচারী অভিজাত শাসনের দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে এবং রাশিয়াকে আধা-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে ভাঙ্গনের আসন্ন হুমকি যার নিয়ন্ত্রন করবে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি।

পুতিন সরকার ইউক্রেন আক্রমণ করা ছাড়া রাশিয়ার মুখোমুখি হওয়া বিপদের অন্য কোন উত্তর খুঁজে পায়নি, এবং এখন ন্যাটোর উসকানিকে পারমাণবিক প্রতিক্রিয়া করার হুমকি দিচ্ছে, যা সাক্ষ্য দেয় পুঁজিবাদী পুনরুদ্ধারে শাসনের রাজনৈতিক দেউলিয়াপনার। রাশিয়ান পুঁজিবাদী অভিজাতরা, যার সম্পদ শ্রমিক রাষ্ট্রের জাতীয়করণকৃত সম্পত্তির নিয়মতান্ত্রিক লুণ্ঠন থেকে উদ্ভূত হয়েছে, সোভিয়েত ইউনিয়নের সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তিগুলিতে যা প্রগতিশীল ছিল তা প্রত্যাখ্যান করেছে।

এটা খুব কমই দুর্ঘটনাজনক যে পুতিন, তার ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০২২-এর বক্তৃতায়, ইউক্রেনের আসন্ন আক্রমণকে ন্যায্যতা দিয়েছেন বলশেভিক শাসনের দ্বারা জাতিসত্তার গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার সুস্পষ্ট এবং তিক্ত নিন্দা করে যা ১৯১৭ সালের আগে জারবাদী শাসনে নির্মমভাবে দমন করা হয়েছিল। পুতিন ঘোষণা করেছেন যে সোভিয়েত ইউক্রেনের সৃষ্টি ছিল 'বলশেভিক নীতির ফলাফল এবং সঠিকভাবে 'ভ্লাদিমির লেনিনের ইউক্রেন' বলা যেতে পারে। তিনি ছিলেন এর স্রষ্টা এবং স্থপতি।'

ভ্লাদিমির লেনিন

হ্যাঁ, লেনিন ছিলেন সোভিয়েত ইউক্রেনের স্রষ্টা, এবং নিপীড়িত জাতিসত্তার অধিকারের বলশেভিক প্রতিরক্ষা, এবং বিশেষ করে ইউক্রেনে, অক্টোবর বিপ্লব পরবর্তী গৃহযুদ্ধে ট্রটস্কির নেতৃত্বে লাল সেনাবাহিনীর বিজয়ের একটি প্রধান কারণ ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের আমলাতান্ত্রিক অধঃপতনের প্রক্রিয়াটি অ-রাশিয়ান জাতিসত্তার অধিকারে লেনিনের প্রতিরক্ষাকে ক্ষুণ্ন করার জন্য স্ট্যালিনের প্রচেষ্টায় এর প্রাথমিক অভিব্যক্তি খুঁজে পেয়েছিল তা উল্লেখ করা এড়াতে পুতিন সতর্ক ছিলেন।

এই নীতিগুলি ১৯১৯ সালে ট্রটস্কি দ্বারা প্রণীত একটি নথিতে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছিল, যা বিশেষভাবে ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাটিকে সম্বোধন করেছিল। প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদীদের প্রতি কোনো ছাড় না দিয়ে, ট্রটস্কি লিখেছেন: “ইউক্রেনের সংস্কৃতি … শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জারবাদ এবং রাশিয়ার শোষক শ্রেণী দ্বারা দমন করা হয়েছে, এই বিবেচনায়, রাশিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি এটিকে সকলের জন্য বাধ্যতামূলক করে যে পার্টির সদস্যরা ইউক্রেনীয় ভাষা ও সংস্কৃতির অবাধ বিকাশে সমস্ত বাধা দূর করার জন্য সমস্ত উপায়ে সাহায্য করবে।'

পুতিন, সমাজতন্ত্রের তিক্ত শত্রু এবং অক্টোবর বিপ্লবের ঐতিহ্যের, ইউক্রেনের শ্রমিক শ্রেণীর কাছে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক এবং প্রগতিশীল আবেদন করতে অক্ষম। পরিবর্তে, তিনি জারবাদী এবং স্তালিনবাদী মহান রাশিয়ান উচ্ছৃঙ্খলতার প্রতিক্রিয়াশীল উত্তরাধিকারকে আহ্বান করেন।

ইউক্রেনে পুতিনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে চতুর্থ আন্তর্জাতিকের বিরোধিতা লেনিন এবং ট্রটস্কির সমুন্নত নীতির প্রতিরক্ষার উপর ভিত্তি করে। কিন্তু সেসব নীতির প্রতিরক্ষার জন্য মার্কিন ও ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের প্রতিক্রিয়াশীল ষড়যন্ত্রের নিরলস বিরোধিতা প্রয়োজন।

পারমাণবিক তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আসন্ন বিপদ হল সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পর আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং সাম্রাজ্যবাদী হিংসতার বিশ্ব তরঙ্গের চূড়ান্ত পরিণতি।

এই গত সপ্তাহে তিনি কিয়েভের রাস্তায় হেঁটে যাওয়ার সময়, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস হতাশার সুরে ঘোষণা করেছেন যে ২১ শতকের যুদ্ধ একটি 'অযৌক্তিকতা'। মিঃ গুতেরেস যদি ইউক্রেন পরিদর্শন করার পরেই এই দার্শনিক অন্তর্দৃষ্টিতে পৌঁছান তবে একজনকে অবাক হতে হবে যে তিনি গত ২২ বছর ধরে কোথায় লুকিয়ে ছিলেন। এই তরুণ শতাব্দী এক মুহূর্তের জন্যও শান্তি জানে না। প্রকৃতপক্ষে, গত ৩০ বছর ধরে সাম্রাজ্যবাদী হিংস্রতার সীমাহীন এবং অনিয়ন্ত্রিত তাণ্ডব প্রত্যক্ষ করেছে, যার প্রধান প্ররোচনাকারীরা হোয়াইট হাউসের বাসিন্দা।

গুতেরেসের মন্তব্য ইউক্রেনের যুদ্ধকে এর আগের সমস্ত কিছু থেকে আলাদা করার উদাহরণ দেয়। যেন গত তিন দশকে আমেরিকা ও ন্যাটোর যুদ্ধ আর হয়নি। ইউক্রেনের হিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনাকে গণমাধ্যমে আধুনিক কোন নজির ছাড়াই ভয়াবহ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এটি দাবি করে, রাশিয়ানদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধগুলি, এতটাই চরম যে তাদের কেবল নাৎসিদের নৃশংসতার সাথে তুলনা করা যেতে পারে। ইউক্রেনের আক্রমণকে গণহত্যার কাজ বলে ঘোষণা করা হয়েছে, যার জন্য যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা এবং ভ্লাদিমির পুতিনের বিচার এর চেয়ে কম কিছুর প্রয়োজন নেই। গণহত্যার অভিযোগ পুতিনের অপসারণের আহ্বানকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতি বাইডেন দ্বারা আহ্বান করা হয়েছে - অর্থাৎ রাশিয়ায় শাসন পরিবর্তনের জন্য।

তদুপরি, রাশিয়ার জনগণকে অপরাধী করার জন্য রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রচার বাড়ানো হয়েছে। রাশিয়ান লেখক, সঙ্গীতজ্ঞ, ক্রীড়াবিদ, বিজ্ঞানী এবং এমনকি রাশিয়ান সংস্কৃতি যার বিশ্ব ঐতিহাসিক অর্জনকে সম্মিলিত শাস্তির লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। সর্বাত্মক যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় উন্মত্ত পরিবেশ তৈরি করতে রাশিয়ার প্রতি অন্ধ বিদ্বেষ প্রচার এই ভয়ঙ্কর আক্রমণের লক্ষ্য। এটি প্রচারের একটি সুপরিচিত কৌশল, যা এর আধুনিক আকারের ফসল হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। এর উদ্দেশ্য, যেমনটি ইতিহাসবিদ রবার্ট হাসওয়েল লুটজ ১৯৩৩ সালে বর্ণনা করেছেন, 'নতুন আকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি, দলকে সম্মোহন করা, পাল্টা-প্রচারের বিচ্ছিন্নতা, নির্বাচিত এবং পক্ষপাতদুষ্ট তথ্য দিয়ে জনগণের সংপৃক্তি।

এই কৌশলগুলির বিকাশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিখুঁত হয়েছে, এবং এর সবচেয়ে কার্যকর ব্যবহার ছিল ২০০২-২০০৩ সালে বুশ প্রশাসনের দাবি, সম্পূর্ণরূপে সাজানো, যে ইরাকের 'গণবিধ্বংসী অস্ত্র' রয়েছে। এই প্রচারণার কার্যকারিতা, যেমন ২০০৩ সালে কলম্বিয়া জার্নালিজম রিভিউ ব্যাখ্যা করেছিল, 'মূলত একটি অনুগত প্রেসের উপর নির্ভরশীল ছিল যেটি সাদ্দাম হোসেনের দ্বারা আমেরিকার জন্য তৈরি করা হুমকির বিষয়ে প্রতিটি প্রতারণামূলক প্রশাসনের দাবিকে সমালোচনাহীনভাবে পুনরাবৃত্তি করেছিল।'

এমনকি যদি রাশিয়ান সামরিক বাহিনীকে দায়ী করা সমস্ত সুনির্দিষ্ট অপরাধ সত্য হয় - এবং এখনও পর্যন্ত, যেমণ বুচা নৃশংসতার মতো অভিযোগের কোনও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই - তারা এমনকি নথিভুক্ত অপরাধের সেই মাত্রার কাছে যেতেও পারে না যা গত ৩০ বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধতে চালিয়ে গেছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯১ সাল থেকে ইরাক, সোমালিয়া, সার্বিয়া, আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়া এবং সুদানে বোমা হামলা বা আক্রমণ করেছে। এটি একটি সম্পূর্ণ তালিকা নয়, তবে এই আক্রমণের ফলে মোট মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা কয়েক মিলিয়ন।

আমেরিকান মিডিয়া মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের লক্ষ্যবস্তুকে দোষারোপ করার একটি উপায় হিসাবে 'গণহত্যা' এর অভিযোগ নিয়ে ঘুরে বেড়ায় এবং এই প্রক্রিয়ায় শব্দটির প্রকৃত অর্থকে তুচ্ছ করে। কিন্তু যদি শব্দটি ব্যবহার করতে হয়, তবে তা গত তিন দশকে মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ায় আমেরিকার হস্তক্ষেপের পরিণতিতে প্রয়োগ করা যেতে পারে। বাইডেন পুতিনকে একজন যুদ্ধাপরাধী হিসাবে নিন্দা করেছেন যাকে হেগের ট্রাইব্যুনালে বিচার করা উচিত। সম্ভবত তাই। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক সংঘটিত অপরাধের নথিভুক্ত তথ্যের উপর ভিত্তি করে, অনেক আমেরিকান রাষ্ট্রপতি এবং উচ্চ রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা রয়েছেন যাদের অবশ্যই পুতিনের সাথে কাঠগোড়ায় দাঁড়ানো উচিত।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে ন্যাটোর যুদ্ধ ইউক্রেনের বিরুদ্ধে অপ্রীতিকর আগ্রাসনের প্রতিক্রিয়া বলে দাবি করাই একমাত্র কল্পকাহিনী নয়। গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে তার সর্বশেষ মন্তব্যে, বাইডেন ঘোষণা করেছেন যে তিনি কংগ্রেসকে 'স্বাধীনতার লড়াইয়ে ইউক্রেনকে সমর্থন করার জন্য' আরও ৩৩ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করতে বলছেন। কিন্তু মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর তার ২০২০ সালের প্রতিবেদনে ইউক্রেনের 'স্বাধীনতার' অবস্থার বর্ণনা দিয়েছে:

উল্লেখযোগ্য মানবাধিকার বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত: বেআইনি বা নির্বিচারে হত্যা; নির্যাতন এবং আইন প্রয়োগকারী কর্মীদের দ্বারা নিষ্ঠুর, অমানবিক, বা অবমাননাকর আচরণ বা বন্দীদের শাস্তির মামলা; কারাগার এবং আটক কেন্দ্রে কঠোর এবং জীবনের-হুমকিপূর্ণ অবস্থা; নির্বিচারে গ্রেফতার বা আটক; বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর সমস্যা…

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে “গুরুতর দুর্নীতি; নারীর প্রতি হিংসার তদন্ত ও জবাবদিহিতার অভাব; হিংস্রতা বা হিংসা করার হুমকি ইহুদি বিরোধী দ্বারা অনুপ্রাণিত; প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর সদস্য এবং সমকামী, উভকামী, ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে হিংসতা বা হিংসার হুমকি জনিত অপরাধ; এবং শিশুশ্রমের সবচেয়ে খারাপ রূপের অস্তিত্ব।'

ইউক্রেন সরকার, রিপোর্টে অভিযোগ করা হয়েছে, “অধিকাংশ কর্মকর্তাদের যারা অপব্যবহার করেছে তাঁদের বিচার বা শাস্তি দিতে পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে দায়মুক্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। মানবাধিকার গোষ্ঠী এবং জাতিসংঘ সরকারি নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের তদন্তে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি উল্লেখ করেছে।

ইউক্রেনীয় সরকার কমিউনিস্ট পার্টি এবং অন্যান্য অনেক রাজনৈতিক সংগঠনকে নিষিদ্ধ করেছে এবং রাশিয়ান ভাষার ব্যবহারকে দমন করার লক্ষ্যে আইন পাস করেছে।

এই 'ঘাটতিগুলি' আর সংবাদ মাধ্যম দ্বারা রিপোর্ট করা হয় না, যা এখন ইউক্রেনের 'নতুন গণতন্ত্র' এবং এর রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির জেলেনস্কিকে মহিমান্বিত করছে। কিন্তু সম্প্রতি, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং পশ্চিমী ব্যাঙ্কগুলি, ইউক্রেনের উপর আর্থিক কৃচ্ছ্রতার কঠোর শাসন আরোপ করার সময়, জেলেনস্কিকে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া সরকারের নেতা হিসাবে তিক্তভাবে নিন্দা করছে। বাইডেন, যিনি রাশিয়ান অভিজাতদের নিন্দায় অপ্রতিরোধ্য, ইউক্রেনে তাদের প্রতিপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নীরবতা বজায় রেখেছেন, যদিও এটি একটি সুপরিচিত সত্য যে মুষ্টিমেয় বিলিয়নেয়াররা দরিদ্র দেশের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে।

কিন্তু রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ন্যাটোর ইউক্রেনকে ছায়া হিসাবে ব্যবহার করার বৈধতা দেওয়ার জন্য নিযুক্ত সমস্ত মিথ্যা এবং মিথ্যা আখ্যানের মধ্যে, সবচেয়ে কপট এবং রাজনৈতিকভাবে প্রকাশ করা হল সেইগুলি যা ইউক্রেনের ফ্যাসিস্টিক জাতীয়তাবাদের জঘন্য ইতিহাসকে ঢেকে রাখে, যা গণহত্যা চালিয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পোল এবং ইহুদিদের।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অর্গানাইজেশন অফ ইউক্রেনীয় ন্যাশনালিস্ট (OUN)-এর নেতৃত্বদানকারী গণহত্যাকারী স্টেপান বান্দেরাকে শ্রদ্ধা করার মত নেতা হিসাবে তুলে ধরার বিষয়ে মিডিয়া নীরব। অরেঞ্জ বিপ্লবের পরে ভিক্টর ইউশচেঙ্কোর রাষ্ট্রপতি পদে যোগদানের মাধ্যমে জাতীয় বীর হিসাবে বান্দেরা এবং OUN এবং এর সশস্ত্র শাখা, ইউক্রেনীয় বিদ্রোহী সেনাবাহিনীর সদস্যদের গৌরব করা শুরু হয়েছিল। ২০১৪-এর পর, গণহত্যা জাতীয়তাবাদের এই ফ্যাসিবাদী এবং তীব্রভাবে ইহুদি-বিরোধী নায়কদের হেয় করা একটি অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইউক্রেনের কিয়েভে একটি সমাবেশের সময় অতি-ডানপন্থী দলগুলির সমর্থকরা মশাল এবং স্টেপান বান্দেরার প্রতিকৃতি সহ একটি ব্যানার বহন করে। ১লা জানুয়ারী, ২০১৯, ব্যানারটিতে লেখা আছে, 'কোনও ধারণাকে থামাতে পারবে না যার সময় এসেছে'। (এপি ছবি/এফ্রেম লুকাটস্কি) [AP Photo/Efrem Lukatsky]

ইতিহাসের মিথ্যাচার বর্তমান ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীতে সশস্ত্র ফ্যাসিবাদী ইউনিটের বৈধতা দেওয়ার জন্য অপরিহার্য আদর্শগত ভিত্তি হিসাবে কাজ করেছে, যার মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত উপাদান হল আজভ ব্যাটালিয়ন। আজভ ব্যাটালিয়ন পূর্ব ইউক্রেনের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে যাতে ২০১৪ সাল থেকে ১৪,০০০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ দিয়েছে। এর প্রভাব শুধু ইউক্রেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একজন বিশেষজ্ঞ যিনি আজভের কার্যকলাপগুলি অধ্যয়ন করেছেন তার ব্যাখ্যা অনুসারে, 'এটি এমন একটি আন্দোলন যা সারা বিশ্বের অন্যান্য অতি-ডান আন্দোলনের জন্য একটি মডেল এবং অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করেছে এবং চালিয়ে যাচ্ছে৷ এর হিংস্রতার দ্বিমুখী আলিঙ্গন এবং ক্রমবর্ধমানভাবে শক্তিশালী আর্ন্তমহাদেশীয় সুদূর ডানের অংশ হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা এটিকে ইউক্রেনের সীমানা ছাড়িয়ে হুমকিপূর্ণ করে তুলেছে।'

এ ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার ন্যাটো মিত্ররা বিশ্বকে পারমাণবিক বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। বাইডেন প্রশাসন বেপরোয়াতার সাথে কাজ করছে যা অপরাধমূলকভাবে উন্মাদ আচরণের সীমানা। শীতল যুদ্ধের সময়, এটি অবিসংবাদিতভাবে সত্য হিসাবে গৃহীত হয়েছিল যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে একটি সশস্ত্র সংঘাত একটি ধ্বংসাত্মক পারমাণবিক বিনিময়ে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল এবং তাই, এড়ানো উচিত। ১৯৬২ সালের কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের সময়, রাষ্ট্রপতি কেনেডির অত্যধিক ভয় ছিল যে ওয়াশিংটন এবং মস্কোর নেতাদের দ্বারা প্রতিপক্ষের অভিপ্রায়ের ভুল বোঝা একটি পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারে। বাইডেন প্রশাসন, লন্ডন এবং বার্লিনে তার প্রতিপক্ষদের উল্লেখ না করে, সেই বিপদ সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন বলে মনে হয়।

বাইডেনের করা মন্তব্যগুলি সুস্পষ্টভাবে দ্বন্দ্ব দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে বাইডেন বলেছিলেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার মধ্যে একটি সামরিক সংঘর্ষ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু এখন তিনি ইউক্রেনে অস্ত্র ঢেলে দিচ্ছেন এবং সরাসরি সংঘর্ষের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিচ্ছেন। এমন একটি দৃশ্যকল্প কল্পনা করা কঠিন নয় যেখানে পুতিন রাজনৈতিক এবং সামরিক বিবেচনার ভিত্তিতে, রাশিয়ান সৈন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ইউক্রেনে প্রাণঘাতী অস্ত্র সরবরাহকারী দেশগুলিকে সরাসরি আক্রমণ করতে বাধ্য হবেন। রাশিয়া যদি একটি ন্যাটো দেশের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয় এবং প্রক্রিয়ায় আমেরিকান বাহিনীকে আক্রমণ করে তবে বাইডেন প্রশাসন কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে?

একদিকে, বাইডেন পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের জন্য পুতিনের হুমকিকে নিছক হতাশার বহিঃপ্রকাশ হিসাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্তু এটা ঠিক হতাশার অনুভূতি যা পারমাণবিক অস্ত্রকে অবলম্বন করার বিপদ বাড়িয়ে দেয়। এটি অবশ্য বাইডেনকে চিন্তিত করছে বলে মনে হয় না। যখন তাকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে তিনি কি উদ্বিগ্ন যে পুতিন এই বিশ্বাস নিয়ে কাজ করতে পারেন যে এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধে রয়েছে, বাইডেন প্রশ্নটি উড়িয়ে দিয়ে উত্তর দিয়েছিলেন, 'তারা যা কিছু করবে তার জন্য আমরা প্রস্তুত।'

এর অর্থ কেবলমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্বীকার করছে যে ন্যাটো এবং রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধ পারমাণবিক যুদ্ধে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু বাইডেন বা ন্যাটো দেশগুলির অন্য কোনও নেতা এই বিপদকে স্পষ্টভাবে স্বীকার করেননি বা পারমাণবিক যুদ্ধের পরিণতি কী হবে তা প্রকাশ্যে বলেননি।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে মার্কিন-ন্যাটো যুদ্ধের সম্ভাব্য বিপর্যয়কর পরিণতিগুলির এই ইচ্ছাকৃত গোপনীয়তা ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন সমানুপাত অপরাধ।

অবমূল্যায়ন করার একটি সাধারণ প্রবণতা রয়েছে, যদি না যুদ্ধের বিপদ খারিজ করা হয়। বেশিরভাগ মানুষ অনুমান করে যে পারমাণবিক যুদ্ধের পরিণতি এত ভয়ানক, শুধুমাত্র উন্মাদই এটি ঘটতে দিতে পারে। 'কারণ' শেষ পর্যন্ত জয়ী হতে হবে।

কিন্তু ২০ শতকের সমগ্র ইতিহাস এবং ২১ শতকের প্রথম দুই দশকে এই ধরনের আত্ম-আশ্বস্ত আত্মতৃপ্তির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়। প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, যার শিকার কোটি কোটি, তা ঘটেছে। যুদ্ধের প্রাদুর্ভাব ব্যক্তিদের উন্মাদনার ফসল নয় বরং পুঁজিবাদের মারাত্মক দ্বন্দ্বের ফসল।

জাতিসংঘের মহাসচিব গুতেরেস বলেছেন, একবিংশ শতাব্দীতে যুদ্ধ একটি অযৌক্তিকতা। কিন্তু এই 'অযৌক্তিকতা' অন্যান্য 'অযৌক্তিকতা' এর সাথে অবিচ্ছিন্নভাবে যুক্ত: শ্রেণী সমাজের অযৌক্তিকতা, উৎপাদনের উপায়গুলির ব্যক্তিগত মালিকানার অযৌক্তিকতা, বিশ্বের জনসংখ্যার একটি অতি ক্ষুদ্র শতাংশের অসীম সম্পদ কুক্ষীগত করার অযৌক্তিকতা যখন কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করে এবং অনাহারের সম্মুখীন হয়, গ্রহের বাস্তুসংস্থানের পদ্ধতিগত ধ্বংসের অযৌক্তিকতা এবং সর্বশ্রেষ্ঠ অযৌক্তিকতা: জাতি-রাষ্ট্রের মাধ্যমে মানবতার বিভাজন যা অন্তহীন এবং অপ্রয়োজনীয় দ্বন্দ্বকে উস্কে দেয় যা শুধুমাত্র কর্পোরেট-অভিজাতদের স্বার্থের জন্য কাজ করে যা সমাজকে শাসন করে।

এটি কি 'অবাস্তব' নয় যে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সরকারগুলি SARS-CoV-2 ভাইরাস নির্মূল করার জন্য সুপরিচিত এবং প্রয়োজনীয় জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে যার ফলে ২০ মিলিয়ন মানুষের জীবন গেছে, এবং এটি বিশ্বাস করে যে মহামারীর সমাধান হল শুধুমাত্র একে উপেক্ষা করা?

তবে একই নেতারা যারা মহামারীটির বিপর্যয়কর প্রতিক্রিয়ার সভাপতিত্ব করেছেন তারা এখন এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন যা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

তাদের ব্যক্তিগত আলোচনায়, রাষ্ট্রপতি বাইডেন, প্রধানমন্ত্রী জনসন, রাষ্ট্রপতি ম্যাক্রোঁ, চ্যান্সেলর স্কোলজ এবং সেই বিষয়ে, রাষ্ট্রপতি পুতিন নিজেদের মধ্যে স্বীকার করেছেন যে একটি বিশ্বযুদ্ধ সমাজকে বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাবে। কিন্তু ২০ শতকে, যারা তাদের দেশগুলিকে প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল তারাও বিশ্বব্যাপী সংঘাতের পরিণতির আশঙ্কা করেছিল। এমনকি হিটলার বুঝতে পেরেছিলেন যে তার কর্ম বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু তাতেও তাদের থামানো যায়নি। শেষ পর্যন্ত, তারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিল যে যুদ্ধই জটিল রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ।

এই অবস্থাই যা আজকে বিরাজ করছে। বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জটিলতায় আক্রান্ত যার কোনো শান্তিপূর্ণ সমাধান নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্ব পুঁজিবাদী বিদ্রোহের বিস্ফোরক কেন্দ্রস্থল, একই সাথে তার আধিপত্যবাদী বৈশ্বিক অবস্থানের ক্ষতি, তার অর্থনীতির জটিল অবনতি এবং তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলির এবং সামাজিক ভারসাম্যের সুদূরপ্রসারী ভাঙ্গনের মুখোমুখি।

অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের ঘূর্ণিঝড়ের বিপদে ভীত এবং শ্রমিক শ্রেণীর ক্রমবর্ধমান সামাজিক জঙ্গিবাদের লক্ষণ দেখে আতঙ্কিত, শাসক শ্রেণী যুদ্ধকে দেখে অভ্যন্তরীণ উত্তেজনাকে বাইরের দিকে তুলে ধরার মাধ্যম হিসাবে, একটি গভীরভাবে বিভক্ত দেশকে কৃত্রিমভাবে 'একত্রিত করার' উপায় হিসেবে যুদ্ধে নিক্ষেপ করে।

তবে যুদ্ধের অবলম্বন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সারা বিশ্বের সংকটকে আরও তীব্র করবে। ইতিমধ্যেই যুদ্ধের প্রভাব মূল্যস্ফীতি এবং জীবনের হুমকিপূর্ন খাদ্য ও অন্যান্য যা জীবনে প্রয়োজনীয় তা কমে যাওয়ায় অনুভূত হচ্ছে। এইসব পরিস্থিতি ব্যাপক ধর্মঘট ও বিক্ষোভকে উস্কে দিয়েছে।

বিশ্বযুদ্ধের হুমকি দেয় এমন দ্বন্দ্বগুলি বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্যও পরিস্থিতি তৈরি করে। শ্রমিক শ্রেণীর সামনে যে চ্যালেঞ্জটি রয়েছে তা হল: বিপ্লবের দিকে পরিচালিত করে এমন বস্তুনিষ্ঠ প্রবণতাগুলিকে শক্তিশালী করা এবং ত্বরান্বিত করা, তখন বিশ্বযুদ্ধের দিকে যা পরিচালিত করে তাদেরকে অবমূল্যায়ন ও দুর্বল করা।

যুদ্ধের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ভিত্তি শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলন। এটি সেই মহান সামাজিক শক্তি যার যুদ্ধ বন্ধ করার, পুঁজিবাদের অবসান ঘটানোর, জাতীয় সীমানাকে ছিন্ন করার এবং একটি বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ার ক্ষমতা রাখে।


লিও ট্রটস্কি



চতুর্থ আন্তর্জাতিকের আন্তর্জাতিক কমিটি এবং এর অধিভুক্ত সোশ্যালিস্ট ইকুয়ালিটি পার্টিগুলি এবং গ্রুপগুলি জাতীয় রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার জন্য সমস্ত নৈরাজ্যবাদী আহ্বানকে প্রত্যাখ্যান করে। আমরা লিও ট্রটস্কির আন্তর্জাতিকতাবাদী নীতিগুলিকে সমর্থন করি, যিনি ১৯৩৪ সালে লিখেছিলেন:

একজন 'সমাজবাদী' যিনি জাতীয় প্রতিরক্ষা প্রচার করেন তিনি ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদের সেবায় একটি পেটি-বুর্জোয়া প্রতিক্রিয়াশীল। যুদ্ধের সময় জাতীয় রাষ্ট্রের সাথে নিজেকে আবদ্ধ না করা, যুদ্ধের মানচিত্র নয়, শ্রেণী সংগ্রামের মানচিত্রকে অনুসরণ করা, কেবল সেই দলের পক্ষেই সম্ভব যেটি ইতিমধ্যে শান্তির সময়ে জাতীয় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শত্রুভাবাপন্ন যুদ্ধ ঘোষণা করেছে।

সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের বস্তুনিষ্ঠ প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকাকে সম্পূর্ণরূপে উপলব্ধি করার মাধ্যমেই সর্বহারা অগ্রগামী সকল প্রকার সামাজিক দেশপ্রেমের কাছে অভেদ্য হয়ে উঠতে পারে। এর মানে হল যে 'জাতীয় প্রতিরক্ষা' এর আদর্শ ও নীতির সাথে প্রকৃত বিচ্ছেদ শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক সর্বহারা বিপ্লবের দৃষ্টিকোণ থেকেই তা সম্ভব।

অতএব, কেন্দ্রীয় কাজ হল সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণীকে ঐক্যবদ্ধ করা। বেপরোয়া বাড়াবাড়ি বন্ধ করতে হবে। ইউক্রেনের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে শ্রমিক শ্রেণীর শক্তিকে একত্রিত করতে হবে।

আন্তর্জাতিক কমিটি রাশিয়া ও ইউক্রেনের সাহসী ও শ্রেণী-সচেতন শ্রমিকদের প্রতি বিশেষ আবেদন জানায়। আপনার বুর্জোয়া সরকারগুলির প্রতিক্রিয়াশীল নীতিগুলিকে প্রত্যাখ্যান করুন। পুঁজিবাদী পুনরুদ্ধারের পুরো প্রকল্পটিকে প্রত্যাখ্যান করুন, যা এই ভয়ানক যুদ্ধের দিকে নিয়ে গেছে।

মার্কসবাদ এবং বলশেভিজমের ঐতিহ্যে ফিরে আসুন যা একসময় আপনার দেশের শ্রমজীবী জনগণকে অনুপ্রাণিত করেছিল। আমরা জানি যে সেই ঐতিহ্যগুলি এখনও জনসাধারণের চেতনার মধ্যে বাস করে এবং নিশ্চিত যে তারা পুনরুত্থিত হবে সন্মিলিতভাবে কাজের দ্বারা।

আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেণীকে অবশ্যই সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। সমস্ত রাজনৈতিক কাজের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন হল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বিশ্ব পার্টি হিসাবে চতুর্থ আন্তর্জাতিককে গড়ে তোলা। আমরা তাদের সকলকে আহ্বান জানাই দলে যোগদান করার জন্য যারা এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একমত এবং এই লড়াইয়ে অংশ নিতে প্রস্তুত।

Loading