বাংলা

শ্রীলঙ্কার শ্রমিকরা কার্ফু ও সরকার-সংগঠিত হিংসতাকে অস্বীকার করছে

সেন্ট্রাল কলম্বোর গল ফেস গ্রিনে শিবিরে থাকা শ্রীলঙ্কার বিক্ষোভকারীদের উপর গতকাল সরকার-সংগঠিত আক্রমণের অর্থ ছিল মাসব্যাপী সরকার বিরোধী প্রতিবাদ আন্দোলনের উপর আরও বিস্তৃত দমণ পীড়নের মঞ্চ তৈরি করা। এটা বুমেরাং হয়েছে.

মেডিক্যাল ছাত্ররা ৯ই মে, ২০২২-এ গালে ফেসে হামলার বিরুদ্ধে রাগামাতে বিক্ষোভকারী শ্রমিকদের সাথে যোগ দিয়েছে [ফটো: WSWS]

অজুহাত হিসাবে হিংসাত্মক আক্রমণ ব্যবহার করে, রাষ্ট্রপতি গোটাভায়া রাজাপাক্ষে একটি অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশব্যাপী কার্ফু জারি করেছেন এবং সামরিক বাহিনীকে একত্রিত করেছেন, ইতিমধ্যে হাতে থাকা ভারী পুলিশি উপস্থিতি জোরদার করার জন্য গ্যালে ফেস গ্রিনে সশস্ত্র সৈন্য পাঠান।

বিরোধীদের দমন করতে পারা থেকে অনেক দূরে, হিংসাত্মক আক্রমণের জন্য ক্ষুব্ধ হাজার হাজার মানুষ কার্ফুকে এবং ভারী পুলিশ-সামরিক বাহিনীর উপস্থিতিকে অস্বীকার করে বন্যার মত গালে ফেস-এ সরকার বিরোধী বিক্ষোভে যোগ দিয়ে তাদের সংহতি প্রদর্শন করে। দ্বীপ জুড়ে, কয়েক হাজার মানুষ একই কাজ করার জন্য রাস্তায় নেমেছিল বলে জানা গেছে।

কলম্বোর ন্যাশনাল হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মী এবং ডাক বিভাগের কর্মী সহ শ্রমিকদের একটি অংশ, সরকারের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ বন্ধ করে দেয়।

প্রেসিডেন্ট ও তার সরকারের পদত্যাগ এবং আকাশছোঁয়া দাম, দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং মৌলিক খাদ্য সামগ্রী জ্বালানী এবং ওষুধ সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ঘাটতির কারণে শ্রমজীবী মানুষের মুখোমুখি হওয়া সামাজিক বিপর্যয়ের অবসান ঘটানোর দাবিতে গত এক মাস ধরে শ্রীলঙ্কা জুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে।

কলম্বো শহরতলির কান্দানায় কেরোসিন কেনার জন্য লোকেরা লাইনে দাঁড়িয়েছে। ৯ই মে, ২০২২ [ছবি: WSWS]

শ্রমজীবী মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা এমনকি কয়েক দিন পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছেন। অনেকেরই তাদের পরিবারের জন্য খাবার সরবরাহ করতে অসুবিধা হচ্ছে এবং প্রতিদিন খাবারের সংখ্যা কম করছে। অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবাগুলির ক্রমবর্ধমান ভাঙ্গন অব্যাহত। হাসপাতালগুলোতে ওষুধ ও যন্ত্রপাতি ফুরিয়ে যাচ্ছে। পরিবহন ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।

শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে বিরোধিতা বাড়তে থাকা ট্রেড ইউনিয়নগুলিকে বাধ্য করেছে, যারা প্রথমে কিছুই করেনি, ২৮শে এপ্রিল এবং আবার গত শুক্রবার একদিনের সাধারণ ধর্মঘট ডাকতে৷ শুক্রবারের ধর্মঘট - যা হরতাল নামে পরিচিত, সাধারণভাবে ছোট ব্যবসা বন্ধের ফলে - অর্থনীতিকে স্থবির করে দিয়েছিল। ফ্রি এন্টারপ্রাইজ জোন, হাসপাতাল, স্কুল, পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এবং পরিবহন সহ সমগ্র দ্বীপ জুড়ে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কাজ বন্ধ করে দিয়েছে।

ধর্মঘটটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল কারণ শ্রমজীবী ​​মানুষ সাম্প্রদায়িক পথ ভুলে- সিংহল ও তামিল, মুসলিম, খ্রিস্টান, হিন্দু ও বৌদ্ধ-তাদের সাধারণ শ্রেণী স্বার্থে একত্রিত হয়েছিল। কয়েক দশক ধরে, বিশেষ করে সঙ্কটের সময়ে, কলম্বোর রাজনীতিবিদরা তামিল-বিরোধী এবং মুসলিম-বিরোধী ঊগ্রবাদকে চাগিয়ে তুলেছে এবং শ্রমিকদেরকে একে অপরের বিরুদ্ধে বিভক্ত করার জন্য সাম্প্রদায়িক উস্কানি ও গণহত্যার আয়োজন করেছে।

সাধারণ ধর্মঘট ও হরতালের প্রতি শক্তিশালী সমর্থন সমগ্র রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান-সরকার এবং বিরোধীদের পাশাপাশি ট্রেড ইউনিয়নগুলির মধ্যে ভয়ের কাঁপুনি ধরিয়েছে, যারা সমর্থনের বহর দেখে স্পষ্টতই হতবাক হয়ে গিয়েছিল।

শুক্রবার গভীর রাতে, রাষ্ট্রপতি রাজাপাক্ষে, যার ইতিমধ্যেই নির্বাহী রাষ্ট্রপতি হিসাবে ব্যাপক ক্ষমতা রয়েছে, জরুরি অবস্থা জারি করে যা তাকে সক্ষম করবে সামরিক বাহিনীকে একত্রিত করতে, কার্ফু এবং সেন্সরশিপ আরোপ করতে, নির্বিচারে গ্রেপ্তার করতে এবং ধর্মঘট ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করতে।

যখন সরকার সামরিক বাহিনীকে একত্রিত করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, ট্রেড ইউনিয়নগুলি এই বুধবার শুরু হতে যাওয়া একটি অনির্দিষ্টকালের সাধারণ ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নিয়েছে, তার পরিবর্তে শ্রমিকদের দ্বারা মধ্যাহ্নভোজের সীমিত সময়ে বিক্ষোভ হবে। শ্রমিক শ্রেণীকে ধ্বংস করে, ট্রেড ইউনিয়নগুলি শুধুমাত্র একটি মরিয়া সরকারকে কিছু করতে উৎসাহিত করেছে।

প্রধানমন্ত্রী, মাহিন্দা রাজাপাক্ষে, যিনি রাষ্ট্রপতির ভাই, গতকাল কয়েকশ ক্ষমতাসীন শ্রীলঙ্কা পোডুজানা পেরামুনা (SLPP) সমর্থকদের জড়ো করেছিলেন, তাদের মধ্যে অনেকেই দ্বীপের অন্যান্য অংশ থেকে বাসে করে মধ্য কলম্বোতে তার সরকারী বাসভবনে এসেছিলেন। ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তেজক বক্তৃতার পরে, তাদের লাঠি এবং অনান্য জিনিস দিয়ে সশস্ত্র করে পাঠানো হয়েছিল, প্রথমে বাসভবনের বাইরে বিক্ষোভকারীদের আক্রমণ করার জন্য এবং তারপরে সেই রাস্তার প্রায় এক কিলোমিটার নীচে যেখানে গ্যালে ফেস গ্রিন দখল করে আছে সেখানে।

যদিও পুলিশ টিয়ারগ্যাস এবং জলকামান নিয়ে সজ্জিত ছিল, গালে ফেস গ্রিনে তাণ্ডব সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তাদের থামাতে কিছুই করেনি। গুণ্ডাদের আঘাতে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন শতাধিক মানুষ।

হামলার পর গ্যালে ফেস এ জনতা ৯ই মে, ২০২২ [ছবি: WSWS]

রাজাপাক্ষে ভাইরা যা গণনা করেননি তা হল জনসংখ্যার বিস্তৃত স্তরের ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া যারা কার্ফু এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে অস্বীকার করার জন্য প্রস্তুত ছিল। বিরোধিতার পরিধি স্পষ্ট হয়ে উঠলে, মাহিন্দা রাজাপাক্ষে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন, কার্যকরভাবে মন্ত্রিসভা ভেঙে দেন।

রাষ্ট্রপতি রাজাপাক্ষে এখন দেশের নজিরবিহীন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের সমাধান খুঁজতে 'জাতীয় ঐক্য সরকার' গঠনের জন্য সমস্ত সংসদীয় দল - সরকার এবং বিরোধী দলকে আহ্বান জানিয়েছেন। দেশটি একটি তীব্র বৈদেশিক মুদ্রা সংকটের সম্মুখীন, যার অর্থ জ্বালানি সহ আমদানি জিনিস কেনার জন্য এটির কাছে খুব সীমিত তহবিল রয়েছে এবং তার বড় বিদেশী ঋণ থাকায় 'অস্থায়ী ঋণ খেলাপি' ঘোষণা করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল জরুরী বেলআউট (সমস্যা থেকে বের করে আনতে) ঋণের জন্য কঠোর ব্যয় হ্রাস করার শর্তের উপর জোর দিয়েছে যা কেবলমাত্র শ্রমজীবী মানুষের মুখোমুখি হওয়া সামাজিক সংকটকে আরও খারাপ করবে।

সমগ্র কলম্বোর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান-বিরোধী দল, ট্রেড ইউনিয়ন, কর্পোরেট প্রতিনিধি এবং মিডিয়া ভাষ্যকাররা- শ্রমিকদের, যুবক ও গ্রামীণ জনগণের বিক্ষোভকে নিষ্ক্রিয় বা দমন করার জন্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন বা জাতীয় ঐক্য বা সর্বদলীয় সরকার গঠনের আশা করছেন।

আজ অবধি, প্রধান বিরোধী দলগুলি - সামগী জনা বালাভেগয়া (SJB) এবং জনতা বিমুক্তি পেরামুনা (JVP)- জোর দিয়ে বলেছে যে তারা আগাম নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্য অন্তর্বর্তী সরকারে যোগদান বা সমর্থন করার কথা বিবেচনা করার আগে রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগ করতে হবে৷ গত কয়েকদিনের ঘটনার প্রভাবে তারা হয়তো ভালোভাবে পুনর্বিবেচনা করবে। নিঃসন্দেহে বন্ধ দরজার আড়ালে, এমন একটি সরকারকে একত্রিত করার জন্য শাসক মহলে উন্মত্ত আলোচনা চলছে।

শ্রীলঙ্কার সোশ্যালিস্ট ইকুয়ালিটি পার্টি (SEP) শ্রমিকদের সতর্ক করেছে যে কোনো পুঁজিবাদী অন্তর্বর্তী সরকারে তাদের বিশ্বাস না রাখতে। বিরোধী SJB এবং JVP-এর উভয়েরই IMF-এর কঠোরতার নির্দেশ আরোপ করার পুরানো রেকর্ড রয়েছে এবং তাঁরা সুযোগ পেলে বর্তমান রাজাপাক্ষের শাসনের মতোই নির্মমভাবে আবারও তা করবে৷

সরকার বিরোধী বিক্ষোভকারীদের উপর হিংসাত্মক আক্রমণটি SEP-এর আহ্বান করা অ্যাকশন কমিটি গঠনের জরুরিতার উপর জোর দেয়,যা ট্রেড ইউনিয়নগুলি থেকে স্বাধীন হবে, শ্রমিকদের শ্রেণী স্বার্থে একীভূত প্রচার চালানো দ্বীপ জুড়ে সমস্ত কর্মক্ষেত্রে, চা বাগানে এবং শ্রমিক-শ্রেণির শহরতলিতে ।

SEP বেশ কয়েকটি দাবীর বিশদ বিবরণ দিয়েছে যার ভিত্তিতে এই অ্যাকশন কমিটিগুলি শ্রমজীবী মানুষের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে সম্পদগুলি ব্যবহার করা নিশ্চিত করবার জন্য লড়াই করতে পারে অতি-ধনীদের লাভের চাহিদা পূরণ করবার জন্য নয়। এর মধ্যে রয়েছে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের উৎপাদন ও বন্টন নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে মজুরির সূচীকরণ, চাকরির সুরক্ষা এবং সমস্ত বৈদেশিক ঋণ প্রত্যাখ্যান।

অ্যাকশন কমিটিগুলির একটি নেটওয়ার্ক গঠন এবং এই দাবিগুলির জন্য লড়াই শ্রমিক ও কৃষকদের সরকার গঠণের জন্য অনির্দিষ্টভাবে রাজনৈতিক সংগ্রামের দিকে নিয়ে যায় সমাজকে সমাজতান্ত্রিক পথে পুনর্গঠন করার জন্য । শ্রীলঙ্কার সংকট তীক্ষ্ণ আকারে দেখায় যে মুনাফা ব্যবস্থার মধ্যে শ্রমিক শ্রেণীর এমনকি সবচেয়ে প্রাথমিক যে চাহিদা তাও পূরণ হওয়া সম্ভব নয়।

Loading