বাইডেন প্রশাসনের অনুরোধে, বিশ্বের পুঁজিবাদী রাজনীতিবিদ, সিইও এবং ক্রয় করা সাংবাদিকরা বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকটের জন্য কুমিরের অশ্রু প্রবাহিত করেছে, আর তারা দাবি করেছে যে একা ভ্লাদিমির পুতিন এই অবস্থা তৈরি করেছে।
সোমবার সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে একটি সুপ্রসন্ন জনতাকে সম্বোধন করে, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেইন একটি নতুন উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন 'ভঙ্গুর দেশ এবং দুর্বল জনসংখ্যার' যাদের তারাই 'সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে' খাদ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে । প্রাক্তন জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী যখন ক্ষুধা থেকে 'লজ্জাজনকভাবে' লাভের জন্য রাশিয়াকে দোষারোপ করেছিলেন তখন বিলিয়নেয়ারদের ভিড় তাঁর প্রশংসা করেছিল। 'বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচী প্রয়োজনীয় সরবরাহের খুব দরকার' গণ-অনাহারের হুমকি দূর করার জন্য তিনি শ্রোতাদেরকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানালে তাঁরা গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ে।
চূরান্ত ভণ্ডামি। ছয় মাস আগে, জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির সভাপতি ডেভিড বিসলি ' এক বারের জন্য দুর্ভিক্ষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাহায্য করতে বিলিয়নেয়ারদের কাছে আবেদন' জারি করেছিলেন, যা ব্যাখ্যা করেছিল যে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিরা যদি তাদের সম্মিলিত $ ১৩.১ ট্রিলিয়ন সম্পদের থেকে মাত্র ৬.৬ বিলিয়ন ডলার (বা ০.০৪ শতাংশ দান করে) ২০২২ সালে বিশ্বের ক্ষুধা নির্মূল করা যেতে পারে এবং লক্ষ লক্ষ জীবন বাঁচানো যেতে পারে।
এই অনুরোধটি পূর্বাভাসিতভাবে বধির কানে পড়েছিল, এবং পরবর্তী ছয় মাসে, শ্বাসরুদ্ধকর প্রযুক্তিগত অগ্রগতির আধুনিক বিশ্বে, ৪.৫ মিলিয়ন মানুষ মারা গেছে সবচেয়ে প্রাচীন কোন উপায়ে যা শুধু কল্পনা করা যায়। প্রতি বছর ৯০ লক্ষ মানুষ অনাহারে মারা যায় যে সমন্ধে পুঁজিবাদী মিডিয়ার খুব কমই মনোযোগ, তাঁরা শুধুমাত্র মৃতদের টেনে নিয়ে যায় যুদ্ধের প্রচারের সময়।
গণঅনাহার এবং বিশ্ব ক্ষুধার প্রকৃত উৎস পুঁজিবাদ। এই সপ্তাহে, অক্সফাম করোনভাইরাস মহামারী চলাকালীন সামাজিক বৈষম্যের ব্যাপক বৃদ্ধির বিবরণ দিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা ২০ মিলিয়ন মানুষকে হত্যা করেছে। অক্সফাম রিপোর্ট করেছে যে 'মহামারী চলাকালীন প্রতি ৩০ ঘন্টায় গড়ে একজন নতুন বিলিয়নেয়ার তৈরি হয়েছে,' যার মধ্যে ৬২ জন ব্যক্তি রয়েছে যারা খাদ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে কৃষি ব্যবসার শিল্প থেকে তাদের অর্থ উপার্জন করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'কর্পোরেশন এবং বিলিয়নিয়ার রাজবংশ যারা আমাদের খাদ্য ব্যবস্থার এত বেশি নিয়ন্ত্রণ করে, তারা তাদের মুনাফা বৃদ্ধি দেখতে পাচ্ছে।'
উদাহরণ স্বরূপ, যখন ভন ডার লেইন ভ্লাদিমির পুতিনকে 'ক্ষমতার অধিকারী থাকার জন্য ক্ষুধা ও শস্যকে ব্যবহার করায়' নিন্দা করেছেন, সেখানে উপস্থিত ছিলেন দু'জন পুরুষ - কারগিলের সিইও ডেভিড ম্যাকলেনান এবং কোম্পানির সিওও ব্রায়ান সাইকস - যারা হয়তো করতালিতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু অক্সফাম রিপোর্ট অনুসারে, মহামারী শুরু হওয়ার পর থেকে কারগিল পরিবারের সম্মিলিত সম্পদ $১৪.৪ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে, যা বিশ্বের ক্ষুধার্তদের দুবার খাওয়ানোর জন্য যথেষ্ট এবং তার পরেও কয়েক বিলিয়ন অবশিষ্ট থাকবে।
কোভিড-১৯ মহামারী যেমন দেখিয়েছে, পুঁজিপতি শ্রেণী তার সম্পদের ক্ষুদ্রতম অংশটুকুও না দিয়ে কত প্রাণের ত্যাগ করাবে তার কোনো সীমা নেই। রাশিয়ার বিরুদ্ধে মার্কিন-ন্যাটোর ছায়া যুদ্ধের স্থপতিরা একইভাবে রাশিয়াকে পরাজিত করতে এবং এর সম্পদগুলি জয় করার জন্য ক্ষুধা ও পারমাণবিক বিপর্যয়ের মাধ্যমে কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষের জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত।
খাদ্যমূল্যের বর্তমান বৃদ্ধির জন্য মার্কিন সরকার এবং তার সাম্রাজ্যবাদী মিত্ররা প্রাথমিকভাবে দায়ী। জো বাইডেন বারবার বলেছেন যে মার্কিন সরকারের লক্ষ্য একটি 'দীর্ঘ এবং বেদনাদায়ক যুদ্ধ' নিশ্চিত করা, এবং খাদ্যের দামের বৃদ্ধি মূলত মার্কিন নেতৃত্বাধীন নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়া। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে, মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে যেমণ বলেছেন, 'লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যাবে।'
একজন শিল্প বিশেষজ্ঞ গত সপ্তাহে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে বলেছেন, “এটি ভূমিকম্প। আমরা অস্বাভাবিক পরিমাণে মানুষের দুর্ভোগের ঝুঁকিতে আছি।' ইউরেশিয়া গ্রুপের ২৩শে মে একটি প্রতিবেদন অনুসারে, মাত্র ৯০ দিনে ৪০০ মিলিয়ন মানুষ খাদ্য পাবার জন্য অনিরাপদ হয়ে পড়েছে, যার ফলে মোট সংখ্যা ১.৬ বিলিয়নে পৌঁছেছে। একই রিপোর্ট ব্যাখ্যা করেছে যে যুদ্ধ চলতে থাকলে, বিশ্বব্যাপী খাদ্যের দাম এই বছর ৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে, যা এক অভূতপূর্ব বৃদ্ধি।
এই মাসে মার্কিন কংগ্রেস কর্তৃক গৃহীত $৪০ বিলিয়ন সামরিক সহায়তা বিলটি ইচ্ছাকৃতভাবে যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করার লক্ষ্যে এবং রোপণ করার সময় বাধা দিয়ে খাদ্য সংকটকে ব্যাপকভাবে তীব্রতর করবে। বিলটি 'মানবিক' সহায়তার জন্য যে নির্দেশ করে তা নিছক লোক ভোলানোর জন্য। আফগানিস্তান এবং ইরাক দখলের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'সহায়তা' তার মতোই এর প্রায় পুরোটাই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা এবং অপরাধীদের পকেটে যাবে।
প্রতিটি রাজনীতিবিদ এবং প্রতিটি সংগঠন যারা এই বিলটিকে সমর্থন করেছে তারা বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী মানুষের মুখ থেকে খাবার কেড়ে নেওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ, বার্নি স্যান্ডার্স, রাশিদা তলাইব, ইলহান ওমর এবং জামাল বোম্যান, আমেরিকার ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট এবং আন্তর্জাতিক 'বাম' গ্রুপ যেমন ইন্টারন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট লীগ, ফরাসি নিউ অ্যান্টি-ক্যাপিটালিস্ট পার্টি এবং বিশ্বের গ্রীন দলগুলি। যুদ্ধের জন্য তাদের সমর্থনের ফলে, তারা অবিস্মরণীয়ভাবে নিজেদেরকে শ্রমিক শ্রেণীর শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করেছে, যাদের জন্য যুদ্ধ একটি বিপর্যয়কর প্রভাব ফেলছে।
খাদ্য সংকটের তীব্রতা শ্রমিকদের শ্রেণী সংগ্রামে নিক্ষেপ করছে। সামাজিক বৈষম্যের ব্যাপক মাত্রা এবং আর্থিক বাজারে অর্থ ক্রমাগত ঢেলে দেবার জন্য মুদ্রাস্ফীতি তৈরি করেছে যা সমস্ত পণ্য এবং মৌলিক প্রয়োজনীয়তার দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির পরিচালক ডেভিড বিসলে সম্প্রতি সতর্ক করে দিয়েছিলেন, “আমরা ইতিমধ্যেই দাঙ্গা ও প্রতিবাদ দেখতে পাচ্ছি যখন আমরা এই কথা বলছি—শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও পেরু তে। আমরা বুরকিনা ফাসো, মালি, চাদ থেকে সাহেলেতে ইতিমধ্যেই অস্থিতিশীল গতিশীলতা দেখেছি।এগুলি কেবল সামনে আগত দিনগুলির লক্ষণ।'
ব্যাপক বিক্ষোভ এখন ইরান জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, তেহরানের মতো শহরে যেখানে ৮.৫ মিলিয়ন জনসংখ্যা ময়দা-ভিত্তিক খাদ্যর ৩০০ শতাংশ দাম বৃদ্ধির জন্য শ্রমিকদের ধর্মঘটের সাথে বিক্ষোভকে উস্কে দিয়েছে। শ্রীলঙ্কা, পেরু এবং অন্যত্র দেশব্যাপী একটি চলমান বিক্ষোভ এবং ধর্মঘট অব্যাহত রয়েছে।
প্রতিটি দেশে, ট্রেড ইউনিয়নগুলি শ্রেণী সংগ্রাম ভেঙে দেবার জন্য কাজ করে এবং জরুরি সামাজিক চাহিদা মেটাতে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম করতে বাধা দেয়।
তিউনিসিয়ায়, প্রধান ইউনিয়ন কনফেডারেশন ব্যাপকভাবে আচমকা আন্দোলনের জন্য ভীতি হয়ে তা রোধ করার জন্য একটি সাধারণ ধর্মঘটের প্রস্তুতি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার পূর্ব কেপ জুড়ে স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা এই মাসে ক্রমবর্ধমান খাদ্যের দাম এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় মহামারীর বিপর্যয়কর প্রভাবের ফলে ট্রেড ইউনিয়নের অনুমোদন ছাড়াই ধর্মঘটে গিয়েছে। আর্জেন্টিনার কর্ডোবায় বাস চালকরা খাবার এবং অন্যান্য জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যাবার জন্য আচমকা ধর্মঘট শুরু করেছে।
এই আন্দোলন উন্নয়নশীল বিশ্বের কাছে বিচ্ছিন্ন নয়। কোপেনহেগেনের ব্যাগেজ হ্যান্ডলাররা খাবার এবং অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিসের ক্রমবর্ধমান মূল্যের জন্য গত সপ্তাহান্তে আচমকা ধর্মঘট শুরু করেছে। ড্যানিশ প্রেসের মতে, 'রবিবার ডেনমার্কের শ্রম আদালত রায় দিয়েছে যে ব্যাগেজ কর্মীদের সোমবার আবার কাজ শুরু করতে হবে, কিন্তু তা মানা হয়নি।' ফ্রান্সের সেন্ট-নাজায়ারে বিমান কর্মীরা মজুরি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির জন্য প্রতিদিন হঠাত করে ওয়াকআউট শুরু করেছে।
ব্রিটেনে, ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ড জীবনযাত্রার ব্যয়-সংকটকে 'বিপর্যয়' বলে অভিহিত করেছে। শ্রমিকরা ৯ শতাংশ মূল্যস্ফীতি এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের বিলে রেকর্ড ৫৪ শতাংশ বৃদ্ধি নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। একটি ইপসোস সমীক্ষা অনুসারে, ৮৫ শতাংশ ব্রিটেনবাসী আগামী ছয় মাসে ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রভাব সম্পর্কে উদ্বিগ্ন।
এই বিস্ফোরক প্রেক্ষাপটে, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের জন্য ব্যাপক বেতন বৃদ্ধির দাবিতে উত্তর সাগরের বেশ কয়েকটি তেল ও গ্যাস উত্তলোন স্থানগুলিতে ১,০০০ শ্রমিকের আচমকা ধর্মঘট একটি শক্তিশালী লক্ষণ যে শ্রমিকরা জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ট্রেড ইউনিয়নগুলিকে বাধা হিসাবে দেখে – সুবিধা হিসাবে নয়। যদিও ধর্মঘটটি কর্পোরেট সংবাদ মাধ্যম দ্বারা প্রচার না পাবার শিকার হয়েছিল, একটি ইন্ডাস্ট্রি নিউজ রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, 'মজুরি বিপ্লব শুরু হয়েছে - আমরা একটি কোম্পানিকে আলাদা করছি না বরং সমগ্র বিশ্বব্যাপী শিল্পকে।'
একজন নিয়োগকর্তা বা কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত সংগ্রামের কাঠামোর মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট বা বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট মোকাবেলা করার কোনো উপায় নেই, তা যতই জঙ্গি হোক না কেন। সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্য এবং মৌলিক প্রয়োজনীয়তা এবং মজুরির ব্যাপক বৃদ্ধির লড়াইয়ে, শ্রমিক শ্রেণীকে অবশ্যই তার পূর্ণ শক্তিকে কাজে লাগাতে সমস্ত কর্মক্ষেত্রে, সমস্ত শিল্প এবং সব দেশ জুড়ে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
লড়াই হল সমগ্র পুঁজিবাদী শ্রেণী এবং তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক সংগ্রাম। এটি সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধকে বন্ধ না করে জয়ী হতে পারে না, যা মানবতার প্রযুক্তিগত প্রতিভা এবং শিল্প শক্তিকে নিঃশেষ করে দেয়, এটিকে মৃত্যু এবং ধ্বংসের দিকে পরিচালিত করে যখন সর্বত্র জীবন বাঁচাতে এবং উন্নত করার জন্য এটি অত্যন্ত প্রয়োজন। এর জন্য প্রয়োজন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, ধনীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা এবং ক্ষুধা ও অভাবকে চিরতরে দূর করার জন্য শ্রমিক শ্রেণীর গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণে বিশ্বের উৎপাদন শক্তিকে স্থাপন করা।
আমরা শ্রমিক শ্রেণীর এই আন্তর্জাতিক আন্দোলনে যোগ দিতে আগ্রহী সকল শ্রমিকদের কাছে আজই ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কার্স অ্যালায়েন্স অফ র্যাঙ্ক-এন্ড-ফাইল কমিটির (IWARFC) সাথে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করছি।
