বাংলা

শ্রীলঙ্কা: সরকারি ক্ষেত্রে চাকরি ও মজুরি কমানোর বিরোধিতা করুন! শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় অ্যাকশন কমিটি গঠন করুন!

শ্রীলঙ্কার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ২৫শে মে একটি সার্কুলার জারি করেছে যাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের শুধুমাত্র 'জনসেবা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অপরিহার্য' কর্তব্যরত কর্মকর্তাদের নিয়োগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। মন্ত্রীদের মন্ত্রিসভা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং ২৬শে মে থেকে কার্যকর হয়েছে।

৮ই এপ্রিল ক্যান্ডিতে সরকারী কর্মীরা মিছিল করছেন [চিত্র: ফেসবুক-ডেভেলপমেন্ট অফিসার সার্ভিস ইউনিয়ন]

সার্কুলারে বলা হয়েছে, এই পদক্ষেপটি প্রয়োজনীয় ছিল, কারণ জ্বালানীর ঘাটতির কারণে 'সরকারি এবং বেসরকারী পরিবহন পরিষেবাগুলি সঠিকভাবে কাজ করছে না' এবং জ্বালানী, বিদ্যুৎ এবং জলের জন্য সরকারী ব্যয় 'এই সংকটের সময় সীমাবদ্ধ করা উচিত।'

এই নির্দেশ একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা নয়। সরকারের জন্য 'সম্পদের অভাব' এর কোন শেষ নেই কারণ শ্রীলঙ্কার পুঁজিবাদী অর্থনীতি একটি বড় সংকটের মধ্যে রয়েছে।

আমরা সতর্ক করে দিচ্ছি যে সরকারী ক্ষেত্রের আকার কমানোর দিকে এটি প্রথম পদক্ষেপ যা লক্ষাধিক চাকরির ধ্বংস, মজুরি হ্রাস এবং অবশিষ্ট কর্মীদের জন্য কাজের চাপ বৃদ্ধি দেখতে পাবে। এই হামলাটি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) কঠোর ব্যয় হ্রাস ব্যবস্থার অংশ যা এখন রাষ্ট্রপতি গোটাভায়া রাজাপাক্ষে এবং প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে দ্বারা বাস্তবায়িত করা হচ্ছে৷

জনশক্তি ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ২৫শে এপ্রিল জারি করা একটি পূর্ববর্তী 'পরিকল্পনা পত্র' যাতে ব্যাপক সরকারি খাতের ব্যয় এবং চাকরি কমানোর রূপরেখা দিয়েছে। এটি ঘোষণা করেছে যে সরকারী আয়ের ৫০ শতাংশেরও বেশি ১.৭ মিলিয়ন পাবলিক সেক্টরের কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা দিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই খরচ এখন 'অসহনীয়,' এটা বলেছে।

পরিকল্পনাটিতে দাবি করেছে যে COVID-19 মহামারী বিধিনিষেধের সময় প্রায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ কর্মচারীকে কাজ করার জন্য ডাকা হয়েছিল এবং জনসেবা বজায় রাখার জন্য এর ১.৭ মিলিয়ন কর্মীর মধ্যে মাত্র ৫০ শতাংশের প্রয়োজন ছিল। অন্য কথায়, ৮,৫০,০০০ এর বেশি সরকারি কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করা উচিত।

এটি আরও প্রস্তাব করেছে যে সমস্ত কর্মীকে অতিরিক্ত বলে বিবেচিত হবে তাদের বিনা বেতনে পাঁচ বছরের ছুটি দেওয়া হবে এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান খুঁজতে হবে। এর মাধ্যমে, কাগজটি দাবি করেছে, সরকার সরকারী খাতের ব্যয় প্রতি বছরে ৩০০ বিলিয়ন টাকা কমাতে পারে এবং যা শ্রীলঙ্কার বার্ষিক রেমিটেন্স $২.৫ বিলিয়ন ডলার বাড়িয়ে দিতে পারে।

আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্কের মতো আন্তর্জাতিক ঋণদানকারী সংস্থাগুলির প্রাথমিক চাহিদা মেটাতে মাঠ প্রস্তুত করার জন্য এই পদক্ষেপগুলি বাস্তবায়নের জন্য 'পরিকল্পনা পত্র' সরকার এর কাছে আবেদন জানিয়েছে।

IMF গত কয়েক দশক ধরে ক্রমাগত শ্রীলঙ্কার সরকারগুলিকে বারবার নির্দেশ দিয়েছে সরকারী ক্ষেত্রর আকার কমাতে এবং এর বাজেটের ঘাটতি কমাতে পেনশন কাটছাঁট করতে। প্রস্তাবিত অন্যান্য পদক্ষেপগুলির মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের বেসরকারীকরণ বা বাণিজ্যিকীকরণ এবং উচ্চ কর ধার্য করা।

এখন শ্রীলঙ্কা একটি অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সঙ্কটের সম্মুখীন এবং তার বিদেশী ঋণের খেলাপি ঘোষণা করায়, আন্তর্জাতিক আর্থিক পুঁজি আর কোনো স্থগিতকরণ সহ্য করবে না। যদিও প্রতিটি দেশ কোভিড-১৯ মহামারী এবং ইউক্রেনে রাশিয়ার বিরুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটোর ছায়া যুদ্ধের দ্বারা উদ্ভূত অর্থনৈতিক সঙ্কটের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে, শ্রীলঙ্কা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

খাদ্য, ওষুধ এবং জ্বালানি সহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মারাত্মক ঘাটতি, সেইসাথে চলমান বিদ্যুত বিভ্রাটের সাথে শ্রমিক এবং দরিদ্ররা ক্রমবর্ধমান এবং অসহনীয় মুদ্রাস্ফীতির মুখোমুখি হয়েছে। রাষ্ট্রপতি রাজাপাক্ষের আগের শাসনকালের মতো, তার বর্তমান সরকার শ্রমজীবী ​​মানুষের পিঠে অর্থনৈতিক সংকটের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে যাতে তারা বিদেশী ঋণদাতাদের অর্থ প্রদান করে এবং মুনাফা ব্যবস্থা রক্ষা করতে পারে।

গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী বিক্রমাসিংহে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছিলেন যে তিনি শীঘ্রই একটি অন্তর্বর্তীকালীন বাজেট ঘোষণা করবেন। 'এটি কেবল ব্যয় কমানো, যেখানে সম্ভব সেখানেই কাটা এবং তা কল্যাণকর কাজে স্থানান্তর করা,' তিনি ঘোষণা করেছিলেন। স্বাস্থ্য ও শিক্ষার জন্য ব্যয় হ্রাস করা কঠিন, তিনি যোগ করেন, 'কিন্তু আরও অনেক মন্ত্রণালয় আছে যেখানে আমরা কমাতে পারি।'

বিক্রমাসিংহের দাবি যে অন্তর্বর্তীকালীন বাজেট কল্যাণ তহবিল স্থানান্তর করবে এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে স্পর্শ করবে না তা মিথ্যা। সরকার স্বাস্থ্য ও শিক্ষা সহ সকল খাতে চাকরি, মজুরি এবং পেনশনের রাষ্ট্রীয় ব্যয়কে 'যতটা পারা যায়' কমিয়ে দেবে। প্রকৃতপক্ষে, ওভারটাইম পেমেন্ট এবং অন্যান্য ভাতা ইতিমধ্যেই কমানো হয়েছে।

চাকরি এবং মজুরি হ্রাস শুধুমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আমদানির ওপর সরকার কর্তৃক আরোপিত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক বেসরকারি কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে। নির্মাণ খাতে কয়েক লক্ষ শ্রমিক ইতিমধ্যে তাদের চাকরি হারিয়েছে, যখন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলি প্রকাশ করেছে যে তারা প্রায় ৪.৫ মিলিয়ন শ্রমিককে মজুরি দিতে পারছে না।

কোনো ধরনের আবেদন বা চাপের কৌশলে সরকারের কর্মসূচির পরিবর্তন করবে না, শ্রমিকরাও তাদের চাকরি, মজুরি এবং মৌলিক অধিকারের জন্য লড়াই ট্রেড ইউনিয়নের হাতে ছেড়ে দিতে পারে না।

এপ্রিল মাসে আপনার নিজের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করুন এবং গত এক বছরে ইউনিয়নগুলি কী করেছে তা নিয়ে ভাবুন!

শ্রমিক ও যুবকদের বিস্তৃত জনতা ক্রমাগত বিক্ষোভে নিযুক্ত রয়েছে, বিশেষ করে এপ্রিলের শুরু থেকে, রাষ্ট্রপতি রাজাপাক্ষে এবং তার সরকারের পদত্যাগের দাবিতে এবং বিপর্যয়কর এবং খারাপ সামাজিক অবস্থার অবসান ঘটাতে। ২৮শে এপ্রিল এবং ৬ই মে’র সাধারণ ধর্মঘট শ্রমিক, দরিদ্র এবং সমস্ত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ব্যাপক সমর্থন লাভ করে।

ট্রেড ইউনিয়নগুলি এই সংগ্রামের সময় আমাদের সামাজিক অধিকার রক্ষার জন্য কোন দাবি উত্থাপন করেনি, শুধু একক নীতি জারি করেছে তাদের জন্য লড়াই করতে। পরিবর্তে, একটি অন্তর্বর্তীকালীন শাসন ব্যাবস্থার দাবিকে সমর্থন করে, তারা আমাদের সংগ্রামকে বিরোধী সামগী জনা বালাওয়েগয়া এবং জনতা বিমুক্তি পেরামুনার রাজনৈতিক সমর্থনে পরিণত করেছে। এই দলগুলো স্পষ্ট করেছে যে তারা আইএমএফের নির্দেশ বাস্তবায়ন করবে।

রাজাপাক্ষে ৬ই মে সাধারণ ধর্মঘটের পরে জরুরি অবস্থা জারি করেন এবং ১০ই মে, শাসক-দলের গুন্ডারা সরকার বিরোধী বিক্ষোভকারীদের উপর হামলা করার পরে রাস্তায় সামরিক বাহিনীকে জড়ো করেন। ইউনিয়নগুলি নিয়মতান্ত্রিকভাবে আমাদের ধর্মঘট বন্ধ করে সাড়া দিয়েছে, পরিবর্তে সীমিত প্রতিবাদ এর আহ্বান করেছে।

গত বছর, শিক্ষক ইউনিয়নগুলি তাদের সদস্যদের ১০০ দিনের অনলাইন ধর্মঘটের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, মূল বেতন দাবির মাত্র এক তৃতীয়াংশের একটি সরকারী 'অফার' গ্রহণ করে।

স্বাস্থ্যকর্মীদের দ্বারা ক্রমবর্ধমান দাবির প্রতিক্রিয়ায়, ফেডারেশন অফ হেলথ সার্ভিসেস এর নেতারা রবি কুমুদেশ এবং সামান রথনাপ্রিয়া প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন যে তারা সংগ্রাম করছেন 'তাদের সদস্যদের ক্রোধ সামলানোর জন্য' যাতে তাঁদের নিয়ন্ত্রন এবং বেধে রাখা যায়।

সরকারী কর্মীরা ইতিমধ্যেই সরকারি আক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তাদের প্রস্তুতি দেখিয়েছে। গত সপ্তাহে ক্যান্ডি, অনুরাধাপুরা এবং কুরুনেগালা হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীরা এবং সরকারী ছাপাখানার শ্রমিকরা ওভারটাইম এবং অন্যান্য ভাতা কাটার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে।

পাবলিক সার্ভিস কর্মীরা, অন্যান্য বিভাগে তাদের সমকক্ষদের মতো, সমস্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তাদের সংগ্রামের সংগঠনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের অধিকার রক্ষা করতে পারে। এই কারণেই আমরা প্রতিটি কারখানায়, চা বাগানে এবং বড় কোম্পানিতে এবং শ্রমিক-শ্রেণির এলাকাতে শ্রমিকদের দ্বারা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত অ্যাকশন কমিটি গঠনের প্রস্তাব করছি। এগুলি অবশ্যই ট্রেড ইউনিয়ন এবং সমস্ত পুঁজিবাদী দল থেকে স্বাধীন হতে হবে।

• আমরা বলি পুঁজিবাদী সংকটের জন্য শ্রমিকরা দায়ী নয় এবং এর জন্য অর্থ তাঁরা দেবে না। আমাদের চাকরি, মজুরি এবং পেনশন থেকে হাত ওঠাও!

• আমরা উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি প্রতিরোধ করার জন্য এবং উন্নত কাজের অবস্থার জন্য মজুরি জীবনযাত্রার ব্যয়ের মানের সাথে যুক্ত করার দাবি করি!

অ্যালায়েন্স অফ অ্যাকশন কমিটি (AAC) হল সোশ্যালিষ্ট ইকোয়ালিটি পার্টির উদ্যোগে এবং শিক্ষক, স্বাস্থ্য কর্মচারী, গার্মেন্টস ও প্ল্যান্টেশন কর্মী, অভিবাসী শ্রমিক এবং যারা শিল্প ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য লড়াই করছে তাদের নিয়ে গঠিত অ্যাকশন কমিটিগুলির একটি সমষ্টি।

আমরা এই কমিটিগুলিকে প্রসারিত করার জন্য লড়াই করছি এবং আমাদের শ্রেণী ভাই ও বোনদের নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে অ্যাকশন কমিটি সংগঠিত করতে আমরা সাহায্য করতে প্রস্তুত, সেইসাথে আন্তর্জাতিকভাবে একই ধরনের আক্রমণের সম্মুখীন শ্রমিকদের সাথে জোট গঠন করতে।

আমাদের অ্যাকশন কমিটি সোশ্যালিষ্ট ইকোয়ালিটি পার্টির (SEP) দ্বারা ক্রমবর্ধমান সামাজিক এবং জীবনযাত্রার অবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রচারিত কর্মসূচিকে সমর্থন করে। এর কর্মসূচির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আছে:

• প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সম্পদের সমস্ত উৎপাদন ও বন্টন শ্রমিক শ্রেণীর গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে! ব্যাংক, বড় কর্পোরেশন, চা বাগান এবং অন্যান্য মূল অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলির জাতীয়করণ!

• সমস্ত বিদেশী ঋণ প্রত্যাখ্যান! আন্তর্জাতিক ব্যাংকার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্বকারী আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের কঠোর ব্যয় হ্রাসের দাবিকে না!

• বিলিয়নেয়ার এবং কর্পোরেশনগুলির বিপুল সম্পদ বাজেয়াপ্ত করুন!

• গ্রামীণ ও শহুরে নির্যাতিত, দরিদ্র কৃষক, জেলে ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সকল ঋণ মুকুব! সার এর ভর্তুকি সহ সকল কৃষক ভর্তুকির পুনর্বহাল!

• বিনামূল্যে শিক্ষা এবং বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবার জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দের মাধ্যমে যাদের প্রয়োজন তাদের জন্য উচ্চ-মানের পরিষেবা নিশ্চিত করা!

জনসাধারণ যে সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে তার কোনো সমাধান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে SEP। উপরোক্ত নীতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন শ্রমিক ও কৃষকদের সরকার গঠনের জন্য লড়াইয়ের । আমরা আপনাকে এই সংগ্রামে যোগদান করার জন্য অনুরোধ করছি এবং আরও বিস্তারিত জানার জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।

Loading