বাংলা

SEP শ্রীলঙ্কায় গল ফেস বিক্ষোভকারীদের উপর রাষ্ট্রীয় হামলার নিন্দা করেছে

সোশ্যালিস্ট ইকুয়ালিটি পার্টি (SEP) শুক্রবার ভোররাতে কলম্বোর গালে ফেস গ্রিনে নিরস্ত্র সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের উপর নৃশংস পুলিশ-সামরিক হামলার নিন্দা জানায়। গল ফেস গ্রিন দখল করে সরকার বিরোধী বিক্ষোভকারীরা রাষ্ট্রপতি হিসাবে গোটাভায়া রাজাপাক্ষের পদত্যাগের দাবী করেছে এবং এখন তার উত্তরসূরি রনিল বিক্রমাসিংহের।

রনিল বিক্রমসিংহে [Source: United National Party Facebook] [Photo: United National Party Facebook]

বিক্রমাসিংহে স্পষ্টতই দমণ করায় প্ররোচনা দিয়েছিলেন, যা তাঁর নির্বাহী রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ নেওয়ার ২৪ ঘন্টারও কম সময়ের মধ্যে ঘটেছে। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসাবে তার স্বল্প সময়ে, তিনি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন, নিরাপত্তা বাহিনীকে পুরো ছাড় দিয়েছেন এবং সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের 'ফ্যাসিস্ট' হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বৃহস্পতিবার একটি ডিক্রি জারি করে সেনাবাহিনীকে পুরো দ্বীপ জুড়ে 'জনশৃঙ্খলা' বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

অপারেশনটি ছিল সুপরিকল্পিত। বিক্ষোভকারীদের অজান্তে ধরতে এবং জনসাধারণের দৃষ্টি এড়াতে শুক্রবার রাত্রি দেড়টার দিকে এটি শুরু হয়। গালে ফেস গ্রিন যাওয়ার সমস্ত রাস্তা ব্যারিকেড করা হয়েছিল। প্রায় ১,০০০ পুলিশ এবং সৈন্য, তাদের মুখ ঢেকে, সমস্ত দিক থেকে বিক্ষোভের জায়গায় নেমে আসে, বিক্ষোভকারী এবং সাংবাদিকদের শারীরিকভাবে আক্রমণ করে এবং তাদের তাঁবু এবং অস্থায়ী কাঠামো ভেঙে ফেলে। চৌদ্দ জনকে জাতীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং নয়জনকে হেফাজতে নেওয়া হয় এবং পরে তাঁরা জামিনে ছাড়া পায়।

বিক্রমাসিংহে নৃশংস হামলার অনুমোদন দিয়েছিলেন যদিও প্রতিবাদ সংগঠকরা ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছিল যে তারা ২টার মধ্যে গল ফেস গ্রিনের কাছে রাষ্ট্রপতি সচিবালয় খালি করে দেবে। শুক্রবার, এটির স্পষ্টভাবে লক্ষ্য ছিল, শুধুমাত্র গ্যাল ফেস গ্রিন পরিষ্কার করাই নয়, বরং গত তিন মাসে বিক্ষোভ ও ধর্মঘটে যোগদানকারী লক্ষাধিক মানুষের কাছে একটি ভয়ঙ্কর বার্তা পাঠানো।

এসইপি শ্রমজীবী জনগণকে সতর্ক করে যে বিক্রমাসিংহে সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বর্বর কঠোরতা দাবিকে নির্মমভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং তীব্রভাবে সচেতন যে এর পদক্ষেপগুলি শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে আরও বৃহত্তর জনপ্রিয় বিরোধিতাকে উস্কে দেবে যারা ইতিমধ্যেই বিশাল ঘাটতি এবং আকাশ ছোঁয়া দামের মোকাবেলা করছে। শাসক শ্রেণীর কাছে একটাই উত্তর আছে—গণ-দমন পীড়ণ—এবং তা কার্যকর করার জন্যই বিক্রমাসিংহেকে বসানো হয়েছে।

এই আক্রমণ পুঁজিবাদী শ্রেণীর একনায়কত্বের মুখোশ হিসাবে 'সংসদীয় গণতন্ত্রের' আসল চেহারাকে উন্মোচিত করে। বিক্রমাসিংহের সংবিধান এবং 'গণতন্ত্র' রক্ষা করার দাবি বুর্জোয়া শাসনের প্রতিরক্ষা ছাড়া আর কিছুই নয়। সংবিধান বিক্রমাসিংহেকে একজন স্বৈরশাসকের ব্যাপক ক্ষমতা দেয়—একতরফাভাবে সরকার স্থাপন ও বরখাস্ত করা, ডিক্রি দ্বারা শাসন করা, জরুরী অবস্থা ঘোষণা করা এবং শ্রমজীবী মানুষের বিরুদ্ধে সামরিক ও পুলিশ কর্তৃক প্রাণঘাতী বল প্রয়োগের আদেশ দেওয়া।

শাসক শ্রেণীর সমস্ত দল এবং রাজনীতিবিদরা- বিরোধী সমগী জনা বালাওয়েগয়া (এসজেবি), জনতা বিমুক্তি পেরামুনা (জেভিপি) এবং তামিল ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স (টিএনএ), ফ্রন্টলাইন সোশ্যালিস্ট পার্টি (এফএসপি) এর ছদ্ম-বাম দল সহ, তথাকথিত সুশীল সমাজের সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন এবং গালে ফেস গ্রিন প্রতিবাদী নেতারা—সংবিধান ও সংসদের পবিত্রতা ঘোষণা করে। তারা সকলেই এই বিভ্রমকে প্রচার করে যে বুধবারের সংসদে নতুন রাষ্ট্রপতির জন্য ভোট জনসাধারণের মধ্যে আশা জাগিয়েছে।

SEP একাই সংসদে বুধবারের হেঁয়ালিকে 'শ্রমিক শ্রেণী, যুবক এবং গ্রামীণ দরিদ্রদের বিরুদ্ধে একটি প্রতারণা এবং ষড়যন্ত্র' বলে নিন্দা করেছে। বিক্রমাসিংহেকে বৃহৎ ব্যবসায়ী, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, আইএমএফ এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা মদত দিচ্ছে শ্রমজীবী মানুষের ওপর অর্থনৈতিক সংকটের বোঝা চাপিয়ে দিতে এবং যে কোনো বিরোধীতাকে দমন করতে।

পুঁজিবাদী শাসনের নির্মম রক্ষক হিসাবে বিক্রমাসিংহের দীর্ঘ রেকর্ড রয়েছে। তিনি ১৯৮০-এর দশকে ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির সরকারগুলিতে একজন মন্ত্রী ছিলেন, তার বাজারপন্থী নীতির বিরুদ্ধে একটি সাধারণ ধর্মঘট ভাঙতে, কয়েক হাজার শ্রমিককে বরখাস্ত করেছিলেন এবং ১৯৮৩ সালে, কুখ্যাত তামিল-বিরোধী কর্মসূচির আয়োজন করেছিলেন যা দ্বীপের ধ্বংসাত্মক সাম্প্রদায়িক যুদ্ধের সূচনা করেছিল। ১৯৮৮-৯০ সালে গ্রামীণ যুবকদের মধ্যে বিশৃঙ্খল অশান্তির বিরুদ্ধে ইউএনপি সরকারের রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়নের সময় বাটালান্দা নির্যাতন/হত্যার চেম্বার তত্ত্বাবধানের জন্য তাকে প্রকাশ্যে অভিযুক্ত করা হয়েছিল, সেই সময় সামরিক বাহিনী-সংগঠিত ডেথ স্কোয়াড দ্বারা ৬০,০০০ জনকে হত্যা করা হয়েছিল।

স্পষ্টতই উদ্বিগ্ন যে শুক্রবারের পুলিশ-রাষ্ট্রীয় অভিযান ব্যাপক বিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটাবে, কলম্বোতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত জুলি চুং প্রতিবাদকারীদের উপর হিংস্র হামলার বিষয়ে তার 'গভীর উদ্বেগ' টুইট করেছেন এবং 'কর্তৃপক্ষের সংযম এবং আহতদের জন্য অবিলম্বে চিকিত্সা সহায়তা দেবার' আহ্বান জানিয়েছেন। কি ভণ্ডামি! মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুধুমাত্র তার নিজের হিংস্র স্বার্থকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য 'মানবাধিকার' উত্থাপন করে, এবং এটি বিক্রমাসিংহ সরকারের দ্বারা ভবিষ্যতের অপব্যবহারে উদ্বেগের চেয়ে বেশী কোন অভিব্যক্তি প্রকাশ করবে না।

জণসাধারণ রাষ্ট্রপতির দপ্তরের সামনে, সোমবার, ১১ই জুলাই, ২০২২ [Photo: WSWS]

ট্রেড ইউনিয়ন এবং বিরোধী দলগুলি বিক্রমাসিংহেকে বসানোর পথ প্রশস্ত করেছে এবং এই মারাত্মক বিভ্রম প্রচার করছে যে তার সরকারকে চাপ দিলে ছাড় পাওয়া যেতে পারে। শ্রমজীবী মানুষের স্বাধীন আন্দোলনের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে, তারা বিক্রমাসিংহেকে ছাড় দিয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাবহার করে যেকোনো বিরোধীতা দমন করার নির্দেশ দেওয়ার জন্য।

রবি কুমুদেশ, ট্রেড ইউনিয়ন সমন্বয় কেন্দ্রের সহ-আহ্বায়ক (TUCC), একটি প্রধান ইউনিয়ন ফ্রন্ট, বিক্রমাসিংহেকে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন, তার কাছে সরকার বিরোধী বিক্ষোভের প্রত্যাশা পূরণের জন্য 'সৎ সমর্থন' দেওয়ার অনুরোধ করেছেন, অন্তত পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত।

বৃহস্পতিবার, সরকারবিরোধী প্রতিবাদ আন্দোলনের সাথে জড়িত একটি দল 'নির্দলীয় আন্দোলনকারীদের জাতীয় আন্দোলন' তাদের বিক্ষোভ ভেঙে দেওয়ার পরে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের সামনে একটি সংবাদিক সম্মেলন করে। তারা বলেছে যে তারা বিক্রমাসিংহেকে এক বা দুই মাস সময় দিচ্ছে এবং যদি সন্তুষ্ট না হয় তবে তাদের বিক্ষোভ পুনরায় শুরু করবে।

বিক্রমাসিংহে উত্তর দিয়ে দিয়েছেন । শ্রমজীবী জনগণ যে অসহনীয় জীবনযাত্রার মুখোমুখি হচ্ছে তার বিরোধিতা সামরিক হিংস্রতার মাধ্যমে জবাব দেওয়া হবে।

শুক্রবার এক সংবাদিক সম্মেলনে, JVP-এর সাধারণ সম্পাদক টিলভিন সিলভা সরকার বিরোধী বিক্ষোভকারীদের উপর হামলার নিন্দা করেছেন, কিন্তু সামরিক হিংস্রতার অন্তর্নিহিত উত্সটি ঢেকে রাখার চেষ্টা করেছেন। তিনি রাজাপাক্ষেকে রক্ষা করার জন্য বিক্রমাসিংহেকে অভিযুক্ত করেছেন, তিনি যোগ করেছেন যে যারা তাদেরকে অফিস থেকে তাড়িয়েছে সেই প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তাকে তাদের দ্বারা চুক্তিবদ্ধ করা হয়েছে।

বিক্রমাসিংহে অবশ্য রাজাপাক্ষের পক্ষে কাজ করছেন না, বরং সামগ্রিকভাবে শাসক শ্রেণী, যারা গণ-অভ্যুত্থানের ফলে আতঙ্কিত। তিনি বুর্জোয়া শ্রেণীর একজন শ্রেণী সচেতন প্রতিনিধি যিনি বোঝেন যে পুঁজিবাদী অর্থনীতি দেউলিয়া হয়ে গেছে, শ্রমজীবী ​​জনগণকে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না এবং যেকোনো বিরোধিতাকে নির্মমভাবে দমন করতে হবে।

JVP এবং বিরোধী দলগুলি যেগুলি সর্বদলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য চাপ দিচ্ছে তারা ঠিক একই কাজ করতে চালিত হবে।

গল ফেস বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত সামরিক/পুলিশ হিংস্রতা পুঁজিবাদী শ্রেণীর দলগুলিকে ক্ষমতায় রাখলে কী হতে পারে তার জন্য একটি সতর্কতা। এটি শ্রমিক ও গ্রামীণ শ্রমজীবীদের রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের তাগিদ নেবার কথা বলে যা 'শ্রমিক এবং গ্রামীণ জনসাধারণের জন্য একটি গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক কংগ্রেস!' এই শিরোনামে ২০শে জুলাইয়ের SEP বিবৃতির রুপরেখা । এটি 'গোটাভায়া রাজাপাক্ষে এবং রনিল বিক্রমাসিংহের অসম্মানিত সংসদীয় বন্ধুদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত প্রতিক্রিয়াশীল পুঁজিবাদী অন্তর্বর্তী সরকারের একটি বিপ্লবী রাজনৈতিক বিকল্প হিসাবে' এই জাতীয় কংগ্রেস আহ্বান করার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেছে।

কংগ্রেস ডাকার ভিত্তি স্থাপনের জন্য, এসইপি শ্রমিকদের এবং গ্রামীণ মেহনতীদের শ্রেণী স্বার্থের জন্য লড়াই করতে প্রতিটি কর্মক্ষেত্রতে, কারখানায়, চা বাগানে, নিজস্ব এলাকায় এবং গ্রামীণ এলাকাগুলিতে তাদের নিজস্ব র‌্যাঙ্ক-এন্ড-ফাইল অ্যাকশন কমিটি তৈরি করার আহ্বান জানায়। যেহেতু রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রযন্ত্র এবং সামরিক বাহিনী আরও হিংসতার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তাই শ্রমিকদের উচিত তাদের অ্যাকশন কমিটির মাধ্যমে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের অদম্য প্রতিরক্ষার সাথে তার সাড়া দেওয়া। গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রতিরক্ষা অবিচ্ছিন্নভাবে সমাজতান্ত্রিক দাবির লড়াইয়ের সাথে জড়িত এবং দুর্নীতিগ্রস্ত ও বিক্রী হওয়া শাসকগোষ্ঠী যারা যেকোন উপায়ে তাদের সম্পদ এবং সুযোগ-সুবিধা রক্ষা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তাঁদের কাছ থেকে ক্ষমতা দখল করার সাথে।

যেমণ এসইপি’র বিবৃতিতে ঘোষণা করা হয়েছে, “শ্রমিক ও গ্রামীণ জনগণের গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক কংগ্রেসের আহ্বান শ্রমিক শ্রেণীর জন্য একটি রাজনৈতিক কৌশল প্রদান করে যাতে তারা তার বাহিনীকে একত্রিত করে, গ্রামীণ জনগণের সক্রিয় সমর্থন অর্জন করে এবং যা সমাজতান্ত্রিক ধারার মাধ্যমে শ্রমিক ও কৃষকদের সরকার গঠণের মধ্য দিয়ে নিজস্ব শাসনের ভিত্তি স্থাপন করে সমাজ পুনর্গঠন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।” এই সংগ্রাম দক্ষিণ এশিয়ায় এবং আন্তর্জাতিকভাবে সমাজতন্ত্রের জন্য বৃহত্তর রাজনৈতিক লড়াইয়ের অংশ।

Loading