শ্রমিক ও সরকার বিরোধী বিক্ষোভকারীদের ক্রমবর্ধমান বিরোধিতার মধ্যে প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহের সরকার তার দমনমূলক কর্মকাণ্ড জোরদার করছে।
* রাষ্ট্রপতি বুধবার মধ্যরাতে একটি গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারি করে তার দমনমূলক অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা আইন (ESPA) এর সময় বাড়িয়েছেন যা বিদ্যুতের সরবরাহ, পেট্রোলিয়াম পণ্য সরবরাহ ও বিতরণ এবং স্বাস্থ্য ক্ষেত্রকে অপরিহার্য পরিষেবা হিসাবে চিহ্নিত করে।
এই কঠোর আইন অনুসারে, এই ক্ষেত্রগুলির যে কোনও কর্মচারী যারা কাজে যোগ দেবেন না তিনি 'একজন ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে সংক্ষিপ্ত বিচারের পরে দোষী সাব্যস্ত হবেন' এবং তাঁর দুই থেকে পাঁচ বছরের 'সশ্রম কারাদন্ড' এবং/অথবা ২,০০০-৫,০০০ টাকা ($5–13) জরিমানা হতে পারে।
দোষী সাব্যস্তদের 'স্থাবর এবং অস্থাবর সম্পত্তি' রাষ্ট্র দ্বারা বাজেয়াপ্ত করা যেতে পারে এবং তার নাম 'পেশা বা পেশার জন্য রক্ষিত যে কোনও রেজিস্টার থেকে মুছে ফেলা হবে।' 'শারীরিক কাজ বা কোনও বক্তৃতা বা লেখার মাধ্যমে' কাজে যোগ না দেওয়ার জন্য “অন্য কাউকে প্ররোচিত করা, বা উত্সাহিত করা' যে কোনও ব্যক্তির পক্ষে সেটিও একটি অপরাধ।
এই দমনমূলক ব্যবস্থাগুলি কার্যকর হয় যখন ট্রেড ইউনিয়ন সমন্বয় কেন্দ্র, যা স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ এবং পেট্রোলিয়াম সেক্টরের ইউনিয়নগুলি নিয়ে গঠিত, বিক্ষোভকারীদের উপর সরকারের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ৯ই আগস্ট একদিনের প্রতিবাদ ঘোষণা করে। ইউনিয়নগুলি অসহনীয় মূল্যবৃদ্ধি এবং তীব্র ঘাটতি এবং বিক্রমাসিংহের গণতান্ত্রিক বিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য শ্রমিকদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ক্ষোভকে বিপথগামী করতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
* বুধবার সন্ধ্যায়, পুলিশ সিলন টিচার্স ইউনিয়নের (সিটিইউ) সাধারণ সম্পাদক জোসেফ স্ট্যালিনকে ইউনিয়নের প্রধান কার্যালয় থেকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ দাবি করেছে যে নিষেধ থাকা সত্বেও ২৮শে মে পুলিশ সদর দফতরের কাছে একটি বিক্ষোভ মিছিল করে আদালতের আদেশ লঙ্ঘনের কারণে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল ফোর্ট ম্যাজিস্ট্রেট থিলিনা গামাগে ইউনিয়ন নেতাকে ১২ই আগস্ট পর্যন্ত হেপাজতে থাকার নির্দেশ দিয়েছে।
পুলিশ সিলন ব্যাঙ্ক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের ব্যাঙ্ক অফ সিলন শাখার সেক্রেটারি, ধনঞ্জয়া সিরিবর্ধনা এবং এর প্রাক্তন শাখা সভাপতি, পলিথা আতমপালাকেও গ্রেপ্তার করেছে৷ তাদের বিরুদ্ধে ১৩ জুলাই জোরপূর্বক রাষ্ট্রপতির বাসভবনে প্রবেশের অভিযোগ রয়েছে। গতকাল উভয় ইউনিয়ন নেতাই জামিনে মুক্তি পেয়েছে।
* পুলিশ গতকাল সরকার বিরোধী বিক্ষোভকারীদের একটি চূড়ান্ত নির্দেশ জারি করে বলেছে যারা এখনও গল ফেস গ্রিনের এক কোণ দখল করে আছে তাঁরা যেন আজ বিকাল ৫টার আগে এলাকাটি খালি করে দেয়। গতকাল বিক্ষোভকারীদের কাছে পুলিশের নোটিশ পড়ে বলা হয়েছে যে তারা বেআইনিভাবে এলাকাটি দখল করে আছে এবং তারা না ছাড়লে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একটি মিডিয়া কনফারেন্সে, বিক্ষোভকারীরা ঘোষণা করেছে যে তারা এলাকাটি খালি করবে না এবং পুলিশকে জোরপূর্বক এলাকাটি সাফ করতে বাধা দেওয়ার জন্য একটি রিট আদেশের অনুরোধ জানিয়ে আদালতের আপিল দায়ের করেছে।
২২শে জুলাই, শত শত ভারী সশস্ত্র পুলিশ এবং একটি সামরিক দল খুব ভোরে প্রেসিডেনশিয়াল সেক্রেটারিয়েট এবং আশেপাশের এলাকায় দখলকারী বিক্ষোভকারীদের জোরপূর্বক উচ্ছেদের জন্য আক্রমণ চালায়। অনেকে আহত হন এবং নয়জনকে গ্রেফতার করা হয়।
গত সপ্তাহে বিক্ষোভকারীরা বিক্রমাসিংহের পদত্যাগ না করা পর্যন্ত গালে ফেস গ্রিন ছাড়তে অস্বীকার করেছিল। তারা এখন গল ফেস গ্রিন-এ একটি সরকার-নির্ধারিত 'বিক্ষোভের স্থান'-এ সীমাবদ্ধ।
গত শুক্রবার ছদ্ম-বাম ফ্রন্টলাইন সোশ্যালিস্ট পার্টি (এফএসপি) এর কলম্বো অফিসে দুটি পুলিশ দলের অভিযানের মধ্যে দিয়ে এই দমনমূলক ব্যবস্থাগুলি আসে৷ পুলিশ FSP সদস্যদের বিরোধিতা উপেক্ষা করে, দাবি করে যে তারা আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ফেডারেশনের আহ্বায়ক ওয়াসন্থা মুদালিগেকে খুঁজছে।
সংবাদ মাধ্যমের খবর অনুযায়ী, পুলিশ ও সামরিক স্কোয়াড দ্বারা ইতিমধ্যে ১০০ জনেরও বেশি প্রতিবাদী কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ইমিগ্রেশন বিভাগের কর্মকর্তারা ৩রা আগস্ট ব্রিটিশ সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট কায়লেগ ফ্রেজারের বাড়িতে ঢুকে তার পাসপোর্ট বাজেয়াপ্ত করেছে। পুলিশ তার ফেসবুক পেজে সরকার বিরোধী বিক্ষোভে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ এনেছে। যাইহোক, সংবাদ মাধ্যম প্রশ্ন করলে, কর্মকর্তারা ঘোষণা করেন যে 'বিভাগ এখনও নির্ধারণ করতে পারেনি যে তিনি তার ভিসার শর্ত লঙ্ঘন করেছেন কিনা।'
যদিও সোশ্যালিস্ট ইকুয়ালিটি পার্টি’র (SEP) সাথে ইউনিয়ন নেতাদের, FSP এবং প্রতিবাদ সংগঠকদের মৌলিক রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে, তবুও আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে এই সমস্ত গ্রেপ্তার এবং পুলিশী পদক্ষেপের নিন্দা জানাই।
এসইপি শ্রমজীবী জনগণকে সতর্ক করছে যে বিক্রমাসিংহের শাসনতন্ত্রের কঠোর কঠোরতামূলক ব্যয় হ্রাস পদক্ষেপ যা প্রচুর কষ্ট ও দুর্ভোগের সৃষ্টি করেছে তার বিরুদ্ধে সমস্ত বিরোধিতাকে আরও বিস্তৃতভাবে দমন-পীড়ন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে । আমরা অবিলম্বে সমস্ত অভিযোগ প্রত্যাহার এবং গ্রেফতার করা ব্যাক্তিদের মুক্তির দাবীর ডাক দেবার জন্য শ্রমিক ও গ্রামীণ শ্রমজীবীদের প্রতি আহ্বান জানাই।
৩রা আগস্ট গল ফেস গ্রিনে আয়োজিত একটি বিক্ষোভে পুলিশ নিপীড়ন এবং বর্তমান জরুরি অবস্থার অবসান এবং রনিল বিক্রমাসিংহে এবং তার সরকারের পদত্যাগের দাবি জানানো হয়। ট্রেড ইউনিয়ন এবং গণ সংস্থা (TUMO) দ্বারা আয়োজিত আরেকটি বিক্ষোভ গতকাল জোসেফ স্টালিন সহ, অন্যান্য ট্রেড ইউনিয়ন নেতা এবং সরকার বিরোধী বিক্ষোভকারীদের অবিলম্বে মুক্তির দাবী জানিয়েছে।
তবে, ট্রেড ইউনিয়নগুলি অসহনীয় জীবনযাত্রার বিরোধিতায় শ্রমিকদের মধ্যে গড়ে ওঠা ধর্মঘট আন্দোলনকে ইচ্ছাকৃতভাবে সীমিত করে এই পুলিশ-রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের দরজা খুলে দেবার রাজনৈতিক দায় বহন করে। এইভাবে, তারা শাসক শ্রেণীকে তার পাল্টা আক্রমণ প্রস্তুত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময় দিয়েছে।
২৮শে এপ্রিল, ৬ই মে এবং তারপরে ১০ ও ১১ই মে রাষ্ট্রপতি গোটাভায়া রাজাপাক্ষের যিনি ১৩ই জুলাই গণবিক্ষোভের মধ্যে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন তাঁর বিরুদ্ধে ধর্মঘটে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক অংশগ্রহণ করেছিল। TUMO এবং ট্রেড ইউনিয়ন সমন্বয় কেন্দ্র শুধুমাত্র ধর্মঘটের সুযোগ এবং সময়কাল যতটা সীমিত করা সম্ভব তাই করেনি আন্দোলনটিকে সংসদীয় কৌশলের কানা গলির দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল।
একটি 'অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের' জন্য তাদের দাবি সম্পূর্ণরূপে বিরোধী দলগুলির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল যেমন - সামগী জনা বালাভেগয়া (এসজেবি) এবং জনতা বিমুক্তি পেরামুনা (জেভিপি)। যদিও সংসদীয় দলগুলোর কোনোটিরই রাজাপাক্ষে বা এখনকার বিক্রমাসিংহের সরকারের শ্রমিক শ্রেণী-বিরোধী কর্মসূচি যা পুঁজিবাদের গভীর অর্থনৈতিক সংকটের জন্য শ্রমজীবী জনগণকে মূল্য চোকাতে বাধ্য করে তা নিয়ে মৌলিক কোনো দ্বিমত নেই ।
বুধবার সংসদে তার নীতিগত বিবৃতিতে, বিক্রমাসিংহে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) দ্বারা নির্ধারিত বর্বর কঠোরতা ব্যবস্থা আরোপ করার জন্য তার সংকল্প পুনর্ব্যক্ত করেছেন। জরুরী অবস্থা আরোপ করার সময় এবং একটি পুলিশ জাল বিছানোর সময়, তিনি কুৎসিতভাবে ঘোষণা করেছেন যে সরকার সরকারী নির্ধারিত স্থানে 'শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ' করার অনুমতি দেবে এবং প্রতিবাদকারীরা যাতে তার কাছে অভিযোগ জানাতে পারে তার জন্য একটি 'হটলাইন' খুলে দেবে।
এটা পুলিশ-রাষ্ট্রের দমন-পীড়নের স্বচ্ছ মুখোশ ছাড়া আর কিছুই নয়। যদি বিক্রমাসিংহের শাসনতন্ত্র সমস্ত বিরোধীদের বিরুদ্ধে পূর্ণ মাত্রায় দমণ পীড়ন শুরু না করে থাকে, তবে এটি শুধুমাত্র এই কারণে যে শাসক শ্রেণী শ্রমিক এবং গ্রামীণ মেহনতিদের বিরোধিতার বিস্ফোরণ ঘটতে পারার আশঙ্কায় অত্যন্ত বিচলিত। বিক্রমাসিংহে জল পরীক্ষা করছেন, আরও জঙ্গি বিক্ষোভকারীদের 'ফ্যাসিস্ট' হিসাবে নিন্দা করছেন এবং আরও অনেক বেশি বর্বর পুলিশ-রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সময় তাদের গ্রেপ্তার করছেন।
সমস্ত 'বিরোধী দল' সহ সমগ্র রাজনৈতিক সংস্থা আইএমএফের কঠোরতা কর্মসূচিকে সমর্থন করে যা গণতান্ত্রিকভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে না। শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় উপসংহার টানতে হবে: গণতান্ত্রিক এবং সামাজিক অধিকারের লড়াই সম্পূর্ণরূপে সমাজতান্ত্রিক ও আন্তর্জাতিকতাবাদী কর্মসূচির ভিত্তিতে পুঁজিবাদকে বিলুপ্ত করার সংগ্রামের সাথে আবদ্ধ।
এসইপি দাবী করছে:
সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে গ্রেপ্তার হওয়া সবাইকে মুক্তি দিতে হবে!
অত্যাবশ্যকীয় পাবলিক সার্ভিস আইন বাতিল করো!
জরুরী বিধি প্রত্যাহার করতে হবে!
এই দাবিগুলির পক্ষে লড়াই করার জন্য, আমরা শ্রমিক ও গ্রামীণ শ্রমজীবীদেরকে প্রতিটি কাজের জায়গাতে, চা বাগানে, শহরতলিতে, শহর ও গ্রামে তাদের নিজস্ব অ্যাকশন কমিটি গঠনের আহ্বান জানাচ্ছি, যা সমস্ত পুঁজিবাদী দল এবং তাদের ট্রেড ইউনিয়ন এবং ছদ্ম-বাম দালালদের থেকে সম্পূর্ণভাবে স্বাধীন হবে। এসইপি এই অ্যাকশন কমিটির ভিত্তিতে 'শ্রমিক ও গ্রামীণ জনগণের গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক কংগ্রেস' এর জন্য এবং শ্রমিক ও দরিদ্রদের অধিকারের জন্য লড়াই করতে প্রচার চালাচ্ছে।
শাসক শ্রেণী তার সম্পত্তি ও মুনাফা রক্ষার জন্য শ্রমজীবী জনগণের কাছে আত্মত্যাগ দাবি করছে। এসইপি জনসাধারণের জরুরী চাহিদা মেটাতে ব্যবস্থা নেবার দাবি করে, যার মধ্যে রয়েছে সমস্ত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের উৎপাদন ও বন্টনের উপর শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ, ব্যাঙ্কগুলির জাতীয়করণ, বড় কর্পোরেশন এবং চা বাগানগুলিকে জনসাধারণের গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে করা, বিলিয়নেয়ার এবং কর্পোরেশনগুলির বিপুল সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা, এবং সমস্ত বিদেশী ঋণ প্রত্যাখ্যান।
আমরা অ্যাকশন কমিটিগুলিকে এই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগুলি নেবার জন্য এবং একই সাথে গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর বিক্রমাসিংহে সরকারের দ্বারা ক্রমবর্ধমান আক্রমণের বিরোধিতা করার জন্য সংযুক্ত হওয়ার এবং লড়াই শুরু করার আহ্বান জানাই। একটি গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচির ভিত্তিতে, শ্রমিক শ্রেণী গ্রামীণ জনগণকে তার পক্ষে জড়ো করতে পারে এবং আন্তর্জাতিকভাবে সমাজতন্ত্রের লড়াইয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে সমাজতান্ত্রিক নীতি বাস্তবায়নের জন্য শ্রমিক ও কৃষকদের সরকারের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে।
