গতকাল শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি রনিল বিক্রমাসিংহে, যিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রীও, তিনজন নেতৃস্থানীয় ছাত্র অধীকার রক্ষা কর্মীকে দেশের কঠোর সন্ত্রাস প্রতিরোধ আইনের (পিটিএ) অধীনে ৯০ দিন বন্দী রাখার আদেশে স্বাক্ষর করেছেন।
যাদের আটক করা হয়েছে তাঁরা হলেন আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ফেডারেশন (IUSF) আহ্বায়ক ওয়াসান্থা মুদালিগে, আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ভিক্ষু ফেডারেশনের আহ্বায়ক গালওয়াওয়া সিরিদাম্মা এবং কেলানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী হাশান গুনাতিলাকে, এরা সবাই ছদ্ম-বাম ফ্রন্টলাইন সোশ্যালিস্ট পার্টির (এফএসপি) সমর্থক।
এফএসপির সাথে আমাদের মৌলিক এবং সুপরিচিত রাজনৈতিক পার্থক্য সত্ত্বেও, সোশ্যালিস্ট ইকুয়ালিটি পার্টি (এসইপি) এবং শ্রীলঙ্কার ইন্টারন্যাশনাল ইয়ুথ অ্যান্ড স্টুডেন্টস ফর সোশ্যাল ইকুয়ালিটি (আইওয়াইএসএসই), বিক্রমাসিংহের দমনমূলক কর্মকাণ্ডের নিন্দা করছে এবং তিনজন ছাত্র অধীকার রক্ষা কর্মীর অবিলম্বে এবং নিঃশর্তভাবে মুক্তির দাবি জানাচ্ছে। আমরা শ্রমিক, যুবক ও ছাত্রদের আহ্বান জানাচ্ছি এই আটকের বিরোধিতা করতে এবং অবিলম্বে তাদের মুক্তির দাবি করতে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রক রাষ্ট্রপতির কাছে আটক করার আদেশ প্রস্তুত করে পাঠিয়েছে বলে রবিবারের এই খবরের পরে শ্রীলঙ্কা জুড়ে এবং আন্তর্জাতিকভাবে জনপ্রিয় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। আটকের বিষয়ে বিক্রমাসিংহের অনুমোদন স্পষ্ট করে যে তিনি গণতান্ত্রিক এবং সামাজিক অধিকারের উপর তার শাসনের চলমান আক্রমণের বিরুদ্ধে শ্রমিক, যুবক এবং দরিদ্রদের সমস্ত প্রতিরোধকে চূর্ণ করতে বদ্ধপরিকর।
১৯৭৯ সালে প্রণীত কুখ্যাত PTA-এর অধীনে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী 'সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সন্দেহে' বিনা বিচারে যে কাউকে ৯০ দিনের জন্য আটকে রাখতে পারেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী আটকের মেয়াদ ১৮০ দিন পর্যন্ত বাড়াতে পারেন।
PTA পুলিশকে বিনা অপরাধে যে কাউকে গ্রেফতার ও আটক করার ব্যাপক ক্ষমতা দেয়। শ্রীলঙ্কার পুলিশ, যারা স্বীকারোক্তি আদায়ে নির্যাতন করার জন্য কুখ্যাত, তাঁদেরকে আদালতে প্রমাণ হিসাবে এই 'স্বীকারোক্তি'কে ব্যাবহার করার অনুমতি দেয়। পিটিএ এই অনুমতিও সরকারকে দেয় যাতে করে 'সন্ত্রাসী' বলে মনে করে এমণ যে কোনও সংস্থাকে নিষিদ্ধ করতে এবং তাঁর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার অনুমতি দেয়।
কলম্বো ১৯৮৩ সালে বিচ্ছিন্নতাবাদী লিবারেশন টাইগারস অফ তামিল ইলামের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে তামিলদের, বিশেষ করে যুবকদের আটকে রাখার জন্য পিটিএ ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে কয়েক ডজন এবং দেশ জুড়ে অন্যান্য যুবক এখনও কারাগারে বন্দী, তাঁদের মধ্যে অনেকর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আজ পর্যন্ত দায়ের করা হয় নি।
১৮ আগস্ট আইইউএসএফ-সংগঠিত একটি বিক্ষোভে হিংস পুলিশী হামলার সময় গ্রেপ্তার হওয়ার চার দিন পর মুদালিগে, সিরিদাম্মা এবং গুণতিলেকের বিরুদ্ধে আটকের আদেশ জারি করা হয়েছে। প্রায় ২,০০০ ছাত্র এই বিক্ষোভে জড়িত ছিল যাদের প্রধান দাবি ছিল, “রানীল-রাজাপাক্ষে সরকারকে অবশ্যই যেতে হবে। নিপীড়ন বন্ধ করুন,' 'গ্রেফতার হওয়া [বিক্ষোভ] কর্মীদের মুক্তি দিন' এবং 'জনগণের পরিষদ গড়ে তুলুন।'
পুলিশ জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে বিক্ষোভকে নির্মমভাবে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের লাঞ্ছিত করে, তাদের কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত ধাওয়া করে, এবং ১৯ জনকে আটক করে এই জাল অভিযোগে যে তাদের কাজগুলি 'অবৈধ' এবং যা 'পুলিশকে বাধা দিয়েছে'।
গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ১৬ জনকে শনিবার কঠোর ৫,০০,০০০ টাকার ($1,370) বিণিময়ে জামিনের শর্তে অনুযায়ী মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তাদের মামলার শুনানি হবে ১২ই সেপ্টেম্বর। বাকি তিনজনকে ৯০ দিনের জন্য পিটিএ অধীনে আটকের আদেশ জারি করা্য় আটকে রাখবে।
পুলিশ ইঙ্গিত দিয়েছে যে আটক ছাত্র নেতাদের বিরুদ্ধে বানানো মিথ্যা অভিযোগের অধীনে তদন্ত করা হবে, যার মধ্যে রয়েছে তাঁরা 'রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে' জড়িত ছিল কিনা এবং 'সন্ত্রাসমূলক কাজের' সাথে জড়িত ছিল কিনা।
পুলিশ পূর্বে বলেছে যে ৯ই এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভে তাদের জড়িত থাকার বিষয়েও ছাত্রদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। শ্রমিক এবং দরিদ্রদের এই গণ বিক্ষোভ, প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি গোতাভায়া রাজাপাক্ষে এবং তার সরকারের পদত্যাগের ডাক দিয়েছিল, যাতে ইন্ধন জুগিয়েছিল নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের বিপর্যয়কর অভাব এবং ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি।
হাজার হাজার মানুষ সেন্ট্রাল কলম্বোর গল ফেস গ্রিন দখল করার পাশাপাশি, ২৮শে এপ্রিল এবং ৬ই মে এক দিনের সাধারণ ধর্মঘটে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক অংশগ্রহণ করে, যা অবশেষে রাজাপাক্ষকে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য করে।
ট্রেড ইউনিয়নগুলি যখন এই ধর্মঘটগুলির ডাক দিয়েছিল, তারা রাজাপাক্ষে শাসন এবং মুনাফা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর পূর্ণ মাত্রায় সংঘবদ্ধতার বিরোধিতা করেছিল - তারা একটি অন্তর্বর্তী পুঁজিবাদী সরকার গঠণের রাজনৈতিক দাবির মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের বিপথে চালিত করেছিল। এই বিশ্বাসঘাতকতাকে সংসদীয় বিরোধী দলগুলি এবং ফ্রন্টলাইন সোশ্যালিস্ট পার্টির মতো ছদ্ম-বাম সংগঠনগুলি সমর্থন করেছিল।
১৪ই জুলাই রাজাপাক্ষে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর মার্কিন-পন্থী এবং ব্যাপকভাবে ঘৃণ্য বিক্রমাসিংহে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত হন এবং তারপর ২০শে জুলাই অসম্মানিত সংসদ কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে এই পদে বসানো হয়।
১৭ই জুলাই, বিক্রমাসিংহে 'জরুরি অবস্থা' ঘোষণা করেন এবং, আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ নেওয়ার ২৪ ঘন্টা পরে, রাষ্ট্রপতি সচিবালয় দখলকারী বিক্ষোভকারীদের উচ্ছেদের জন্য একটি জঘন্য সামরিক-পুলিশ অভিযান শুরু করেন। পুলিশ সরকারবিরোধী কর্মীদের উপর হিংস হামলা চালায়, নয়জনকে গ্রেপ্তার করে এবংআরো অনেককে আহত করে। তারপর থেকে, পুলিশ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে নির্যাতন শুরু করেছে, এ পর্যন্ত কয়েক ডজন গ্রেপ্তার হয়েছে। বিক্রমাসিংহে প্রকাশ্যে বিক্ষোভে যারা জড়িত তাঁদের 'ফ্যাসিস্ট' এবং 'সন্ত্রাসী' বলে অপবাদ দিয়েছেন, যখন প্রকৃতপক্ষে তার সরকারই জনগণকে আতঙ্কিত করার জন্য পুলিশ-রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা অবলম্বন করছে।
বিক্রমাসিংহে, দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দাবীগুলির প্রয়োগকারী, তিনি তাদের ব্যয় হ্রাস কঠোরতা ব্যবস্থা আরোপ করতে চলেছেন। তার পূর্বসূরির মতো তার লক্ষ্য হল জনসাধারণকে শ্রীলঙ্কার গভীর অর্থনৈতিক সংকটের জন্য অর্থ জোগাতে বাধ্য করা। আইএমএফ হাজার হাজার সরকারী সেক্টরের চাকরি ধ্বংস, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলির বেসরকারীকরণ, উচ্চ কর ব্যাবস্থা, জনশিক্ষা ও স্বাস্থ্যে কঠোরভাবে খরচ কমানো এবং অন্যান্য কঠোর সামাজিক খরচে আক্রমণ নামিয়ে আনার দাবি করছে।
তার হাতকে শক্তিশালী করার জন্য, বিক্রমাসিংহে এই পদক্ষেপগুলি বাস্তবায়ন এবং শ্রমিক ও দরিদ্রদের গণবিরোধিতাকে দমন করার জন্য একটি সর্বদলীয় সরকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন।
তাদের কৌশলগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও, সমগী জনা বালাওয়েগয়া এবং জনতা বিমুক্তি পেরামুনা সহ সমস্ত সংসদীয় দল এবং ট্রেড ইউনিয়নগুলি IMF-এর ব্যয় হ্রাস কঠোরতা কর্মসূচিকে সমর্থন করে।
রবিবার কলম্বোর ফোর্ট রেলওয়ে স্টেশনের কাছে ছাত্র কর্মীদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে একটি ছাত্র সমাবেশকে সম্বোধন করে, এফএসপি প্রচার সম্পাদক ডুমিন্ডা নাগামুওয়া বিক্রমাসিংহেকে সতর্ক করেছেন: “আপনি যেমন জানেন, পিটিএ সমস্যাটি জিএসপি প্লাসের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তাই এই [ছাত্রদের আটক] সাবধানে করুন।'
পুঁজিবাদী কাঠামোর সাথে আবদ্ধ, FSP, যা IUSF নেতৃত্বকে নিয়ন্ত্রণ করে, বিক্রমাসিংহেকে সতর্ক করছে যে, যদি তিনি গণতান্ত্রিক অধিকার লঙ্ঘন করতে থাকেন তবে শ্রীলঙ্কার পুঁজিবাদ GSP প্লাস এর অধীনে ইইউ কর ছাড় এবং মুনাফা হারাবে, ।
বিক্রমাসিংহে এবং শাসক অভিজাতদের কাছে এই আবেদনগুলি তাদেরকে পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য করবে না। কিংবা কোনো বড় বৈশ্বিক শক্তি শ্রীলঙ্কার শ্রমিক ও দরিদ্রদের গণতান্ত্রিক ও সামাজিক অধিকারও রক্ষা করবে না।
মুদালিগে, গুনাতিলেকে এবং সিরিদাম্মার অবিলম্বে এবং নিঃশর্ত মুক্তি নিশ্চিত করার লড়াই এবং সমস্ত জামিনপ্রাপ্ত ছাত্রদের বিরুদ্ধে বানানো মিথ্যা অভিযোগ প্রত্যাহার করার লড়াইকে অবশ্যই শ্রমিক শ্রেণীর স্বাধীন সংহতি এবং গ্রামীণ দরিদ্রদের একজোট করার মাধ্যমে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে বিক্রমাসিংহে সরকার এর বিরুদ্ধে সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে।
শ্রীলঙ্কার ছাত্রদের অবশ্যই শ্রমিক শ্রেণীর দিকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য লড়াইয়ে, যার মধ্যে অবশ্যই পিটিএ বাতিল করা থাকবে, সমস্ত জরুরী আইন এবং অপরিহার্য পাবলিক সার্ভিস আইন, নির্বাহী প্রেসিডেন্সি এবং অন্যান্য সমস্ত দমনমূলক পদক্ষেপ এর বিলুপ্তি অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
এসইপি শ্রমিক ও গ্রামীণ জনসাধারণকে সামাজিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের লড়াইকে তাদের হাতে তুলে নেওয়ার জন্য কর্মক্ষেত্র, চা বাগানে এবং প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলির পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকায় তাদের নিজস্ব অ্যাকশন কমিটি তৈরি করার আহ্বান জানায়। এই সংগঠনগুলিকে ট্রেড ইউনিয়ন এবং পুঁজিবাদী দলগুলির থেকে স্বাধীনভাবে গড়ে তুলতে হবে। আমরা শিক্ষার্থীদের তাদের নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে IYSSE শাখা তৈরি করার আহ্বান জানাই।
'শ্রমিক ও গ্রামীণ জনগণের গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক কংগ্রেস'-এর জন্য SEP লড়াই করছে, যা এই অ্যাকশন কমিটিগুলির উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হবে, শ্রমিক ও কৃষকদের সরকার এবং সমাজতান্ত্রিক নীতি বাস্তবায়নের সংগ্রামকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য। এটি দক্ষিণ এশিয়া এবং আন্তর্জাতিকভাবে সমাজতন্ত্র গড়ে তোলার বৃহত্তর লড়াইয়ের একটি অংশ।
