বাংলা

গণঅভ্যুত্থানের মধ্যেই ভারতে পালিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী

বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ক্রমবর্ধমান নিষ্ঠুর কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের মধ্যেই সোমবার দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ উদযাপনে বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দিচ্ছেন। ঢাকা, বাংলাদেশ, সোমবার, ৫ই আগস্ট, 2024 [AP Photo/Rajib Dahr]

হাসিনা এবং তার বোনকে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সেনাবাহিনীর পাহারার মধ্যে দেখা যাওয়ার ঘণ্টা খানেক পর সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকের-উজ-জামান জাতির উদ্দেশে একটি টেলিভিশন বিবৃতিতে ঘোষণা করেন যে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। পরবর্তীকালে জানা যায় যে হাসিনা, যিনি গত ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশের সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছেন, তিনি ভারতে চলে গেছেন, যার সাথে তাঁর শাসনব্যাবস্থা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক উপভোগ করেছে।

১৭ কোটি মানুষের দেশ 'একটি বিপ্লবী সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে' ঘোষণা করে জেনারেল ওয়াকের-উজ-জামান বলেন যে সামরিক বাহিনী একটি নতুন সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণ স্থানান্তর এবং শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের তত্ত্বাবধান করবে। তিনি ইতিমধ্যে বিরোধী নেতা এবং 'সুশীল সমাজ' গ্রুপগুলির সাথে পরামর্শ করেছেন বলে দাবি করেন।

জেনারেল জনগণকে রাস্তা থেকে সরে যাওয়ার জন্য আবেদন করেছেন এবং আদেশ দিয়েছেন যে মঙ্গলবার সকালে কার্ফু তুলে নেওয়ার পরে স্কুল, কলেজ, কারখানা এবং অফিসগুলি আবার খুলবে। জনগণের ক্ষোভ প্রশমিত করার চেষ্টা করে ওয়াকের-উজ-জামান জনগণের বন্ধু হিসেবে ভঙ্গি করেন। 'আমি আপনাদের সকলকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি,' তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, 'আমরা সকল হত্যার বিচার করব... দেশের সেনাবাহিনীর প্রতি আস্থা রাখুন। দয়া করে হিংসতার পথে ফিরে যাবেন না এবং দয়া করে অহিংস ও শান্তিপূর্ণ পথে ফিরে আসুন।”

জেনারেল যখন বক্তৃতা করছিলেন, তখন জাতীয় রাজধানী ঢাকার রাস্তায় উল্লাসিত জনতার ঢল নেমেছিল। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ও বেশ কয়েকটি সরকারি ভবনে হামলা ও ভাংচুর করা হয়। নিউইয়র্ক টাইমস বস্ত্র কারখানার একজন শ্রমিক মনসুর আলীকে উদ্ধৃত করেছে, যিনি বলেছেন যে তিনি হাসিনার বাসভবনে প্রবেশকারী হাজার হাজার মানুষের মধ্যে ছিলেন। “আমরা রাগ করে সেখানে গিয়েছিলাম। সেখানে কিছুই অবশিষ্ট নেই।”

এই সবকিছুই ইঙ্গিত করে যে সেনাবাহিনীর শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা হাসিনাকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করেছিল, এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে যে তাঁর রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়নের মাধ্যমে অফিসে আঁকড়ে থাকার প্রচেষ্টা বিপজ্জনকভাবে বাংলাদেশী পুঁজিবাদকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।

একটি স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে শ্রমিক শ্রেণী এখনো সংকটে হস্তক্ষেপ করতে পারেনি। কিন্তু গত মাসের শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা যে প্রতিবাদী আন্দোলন শুরু করেছিল সরকারী চাকুরীর বরাদ্দ ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে তাতে আগের চেয়ে বেশি সংখ্যক শ্রমজীবী ​​মানুষ যোগ দিয়েছে। তারা রাষ্ট্রীয় হিংস্রতার বিরোধিতা করতে এবং ব্যাপক বেকারত্ব, দারিদ্র্য এবং ক্রমবর্ধমান সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে এটি করেছে।

সামরিক বাহিনী এবং শাসক শ্রেণী স্পষ্টভাবে ভয় পায় যে দেশের বিশাল পোশাক শিল্পে ক্রমাগত ব্যাঘাত মুনাফা কমাবে, দেশের অর্থনৈতিক সঙ্কটকে বাড়িয়ে তুলবে এবং শ্রমিক অস্থিরতায় ইন্ধন জোগাবে।

রবিবার, সারা দেশে সরকার বিরোধী বিক্ষোভকারী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে ১৩ পুলিশ কর্মকর্তাসহ প্রায় এক শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। প্রতিবাদ আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে এতে মৃতের সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়ে গেছে।

দমন-পীড়ন এবং সর্বত্র সরকারি কার্ফু সত্ত্বেও, হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছাত্ররা সোমবার ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের উদ্দেশ্যে গণমিছিলের ডাক দেয়।

সোমবার পর্যন্ত, হাসিনা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কুখ্যাত সন্ত্রাসবিরোধী র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন এবং তাঁর রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এর সংগঠিত গুণ্ডাবাহিনী সহ পুলিশকে লেলিয়ে দিয়ে কঠোরপন্থা অনুসরণ করেছিলেন। তিনি শিক্ষার্থীদের 'সন্ত্রাসী' হিসাবে নিন্দা করেন, সরকারী কার্ফু অমান্যকারীদের জন্য 'দেখা মাত্র গুলি করার' আদেশ দিয়েছিলেন এবং মিথ্যা দাবি করেছিলেন যে আন্দোলনটি প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং জামায়াত-ইসলামী যা একটি ইসলামী সাম্প্রদায়িক দল তাঁদের দ্বারা সংগঠিত হয়েছে।

বিক্ষোভের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়, সেই সময় পুলিশ বিক্ষোভকারীদের হিংসস্রভাবে দমন করার প্রচেষ্টায় প্রধান ভূমিকা পালন করে। এর মধ্যে রয়েছে হাজার হাজার গ্রেপ্তার। প্রেস রিপোর্ট অনুসারে, গত শুক্রবার একটি সভায় জুনিয়র অফিসাররা নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি করার বিষয়ে তাদের উর্ধ্বতনদের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।

সেনাপ্রধান শেখ হাসিনার পদত্যাগের ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পর, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন বলেন যে তিনি জেনারেল ওয়াকের-উজ-জামান, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধান এবং বিরোধী দলের নেতাদের সাথে একটি বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছেন।

রাষ্ট্রপতি বলেছেন যে বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে একটি 'অন্তর্বর্তী সরকার' প্রতিষ্ঠার অনুমতি দিতে সংসদ ভেঙে দেওয়া উচিত এবং সেনাবাহিনী 'বিরাজমান নৈরাজ্যিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য ব্যবস্থা নেবে।'

হাসিনার আওয়ামী লীগের অধ্যুষিত বর্তমান সংসদটি গত জানুয়ারিতে একটি ভোটে নির্বাচিত হয়েছিল যা বিএনপি এবং তার মিত্ররা, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে জামায়াতে ইসলামী, তা বয়কট করেছিল। তারা তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর সরকারের দমন-পীড়নের রেকর্ড এবং নির্বাচন তদারকির জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়োগের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতির কথা উল্লেখ করে।

সভাপতি শাহাবুদ্দিন আরও ঘোষণা করেন যে বৈঠকে একমত হয়েছে যে দুর্নীতির মামলায় ২০১৮ সাল থেকে জেলে থাকা বিএনপির দীর্ঘদিনের নেত্রী খালেদা জিয়াকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।

বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছাত্রদলের নেতারা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন, যেটি পুঁজিবাদী শাসনের ধারক এবং যাদের দমন ও একনায়কত্বের কুখ্যাত রেকর্ড রয়েছে। সকল প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, প্রতিশ্রুত অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে ছাত্র সংগঠন সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছে।

এই ধরনের সরকার একটি ডানপন্থী পুঁজিবাদী শাসন ব্যবস্থা যার কাজ শাসন ব্যাবস্থা পুনরুদ্ধার করা এবং ২০২৩ সালের হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের ৪.৭ বিলিয়ন ডলার আইএমএফ ঋণ পাবার বিনিময়ে খরচ কমাতে সম্মত হওয়া ও বেসরকারীকরণের পদক্ষেপগুলির বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করা।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে বিএনপি ও তার মিত্রদের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান থাকবে। তবে পিছনে ক্ষমতার শক্তি থাকবে সামরিক বাহিনীর কাছে।

কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের সরকারী রাজনীতি হাসিনা ও তার আওয়ামী লীগ এবং জিয়া ও তার বিএনপির মধ্যে তিক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামের সবচেয়ে বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা এবং দেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি, তাঁর পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে একটি সফল সামরিক অভ্যুত্থানের অংশ হিসাবে হত্যার পর হাসিনা আওয়ামী লীগের নেত্রী হিসাবে আবির্ভূত হন।

জিয়া ১৯৮৩ সালে বিএনপির অস্থায়ী নেতা হন, তাঁর স্বামী, দলের প্রতিষ্ঠাতা এবং বাংলাদেশের পঞ্চম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একদল সেনা কর্মকর্তার হাতে নিহত হওয়ার দুই বছর পর।

উভয় দলই আন্তর্জাতিক পুঁজির প্রতি দায়বদ্ধ, তাদের ব্যাপকভাবে অন্তরঙ্গ পুঁজিবাদী এবং দুর্নীতিগ্রস্ত পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ক রয়েছে, তাদের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন এবং গণতান্ত্রিক বিরোধী চতুরতা ব্যবহার করেছে এবং শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে যেকোনো গুরুতর বিরোধী আন্দোলনকে কঠোরভাবে দমন করেছে।

এটা উল্লেখ্য যে, বিএনপি শুধুমাত্র জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে ছাত্র আন্দোলনের প্রতি তার 'সমর্থন' ঘোষণা করেছিল, যখন সরকারী দমন-পীড়নের প্রতিবাদে জনগণ রাস্তায় নেমেছিল।

বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ বাংলাদেশে যে সংকট এখন উদ্ভূত হচ্ছে এবং দুই বছর আগে শ্রীলঙ্কায় যা হয়েছে তার মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। ২০২২ সালের জুলাইয়ে, গণবিক্ষোভ এবং ধর্মঘট রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া রাজাপাক্ষকে ক্ষমতা থেকে হঠাতে তাড়া করেছিল। কিন্তু ট্রেড ইউনিয়ন এবং বিরোধী দলগুলির সহায়তায় শীঘ্রই একটি নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় যা স্পষ্টতই বড় ব্যবসায়ী এবং ওয়াশিংটনপন্থী রনিল বিক্রমাসিংহের অধীনে। এটিকে IMF এর বর্বর ব্যয় কঠোরতা ব্যবস্থা লাগু করার দিকে ঠেলে দিয়েছে যখন রাষ্ট্রের দমনমূলক বাহিনীকে গড়ে তোলা হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনকে হিংসাত্মকভাবে দমনের প্রস্তুতিতে ।

অনুরূপ ফলাফল আটকাতে, বাংলাদেশী শ্রমিক এবং ছাত্রদের অবশ্যই লিও ট্রটস্কির স্থায়ী বিপ্লবের কর্মসূচির উপর ভিত্তি করে একটি নতুন দিশা তৈরি করতে হবে - যে কর্মসূচীটি ১৯১৭ সালের অক্টোবরের রাশিয়ান বিপ্লব এবং তার পরে স্তালিনবাদী অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে পরবর্তী সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশের শ্রমিক শ্রেণীকে অবশ্যই একটি স্বাধীন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদেরকে গঠন করতে হবে, সমগ্র রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং শাসক শ্রেণীর সকল অংশ এবং তার রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে। এটিকে অবশ্যই তার পিছনে গ্রামীন নিপীড়িত মেহনতীদের জড়ো করতে হবে শ্রমিক ও কৃষকের সরকার গড়ে তোলার সংগ্রামে, যা অর্থনৈতিক জীবনের সমাজতান্ত্রিক পুনর্গঠন এবং সাম্রাজ্যবাদ ও বৈশ্বিক পুঁজির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেণীর সংঘবদ্ধকরণের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হবে।

Loading