বাংলা
Perspective

ভারত মহাসাগরে গণহত্যা: আইআরআইএস ডেনা’তে টর্পেডো হামলা

আইআরআইএস ডেনাতে মার্কিন নৌবাহিনীর টর্পেডো হামলা

৪ঠা মার্চ, ২০২৬ তারিখে ভারত মহাসাগরে ইরানি ফ্রিগেট আইআরআইএস ডেনাতে মার্কিন নৌবাহিনীর টর্পেডো হামলা একটি যুদ্ধাপরাধ। বিতর্কিতভাবে বিকৃত 'যুদ্ধ সচিব'-এর 'যোদ্ধা' দাম্ভিক মন্তব্য, এটি নৌ ইতিহাসে যতটা কাপুরুষোচিত কাজ হিসেবে স্মরণ করা হবে ঠিক ততটাই নিষ্ঠুর হিসাবে। এই অপরাধটি ১৯৮৮ সালে ইউএসএস ভিনসেনেস কর্তৃক একটি ইরানি বাণিজ্যিক বিমান সংস্থাকে গুলি করে ভূপাতিত করা যেখানে ২৯০ জন নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছিল তার পাশে যায়গা করে নেবে। প্রকৃতপক্ষে, পদ্ধতি এবং মৃত্যুদণ্ড উভয় ক্ষেত্রেই, ইরানি জাহাজ ধ্বংসের ঘটনাটি ল্যাটিন আমেরিকার উপকূলে প্রতিরক্ষাহীন জেলেদের সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের মতোই বৃহত্তর পরিসরে অব্যাহত রয়েছে।

এই ক্ষেত্রে, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর একটি সাবমেরিন একটি বিচ্ছিন্ন জাহাজকে যা কারও জন্য কোনও হুমকি ছিল না, তাকে কোনও সতর্কতা দেয়নি, আত্মসমর্পণের কোনও সুযোগ দেয়নি এবং ১৪০ জনেরও বেশি নাবিককে ভারত মহাসাগরের তলদেশে সলিল সমাধি দিয়েছে। পিট হেগসেথ, একজন খ্রিস্টান ফ্যাসিস্ট যিনি নিজেকে যুদ্ধবাযদের হাতিয়ার বলে বিশ্বাস করেন, পেন্টাগনের মঞ্চে উঠে এ নিয়ে গর্ব করেছেন।

ট্রাম্প প্রশাসন এটিকে ন্যায্যতা দিতে একটি শব্দও ব্যয় করেনি। তারা এই হত্যাকাণ্ডের আইনি ভিত্তি চিহ্নিত করার চেষ্টা করেনি। তারা আত্মরক্ষার দাবি করেনি। তারা অভিযোগ করেনি যে আইআরআইএস ডেনা শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল। তারা আনুপাতিকতা, সামরিক প্রয়োজনীয়তা বা আসন্ন হুমকির বিষয়ে কোনও যুক্তি দেয়নি। তারা কিছুই দেয়নি - কারণ তারা বিশ্বাস করে না যে এর কোনও কিছুরই প্রয়োজন আছে। গত তিন দশক ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে 'নিয়ম-ভিত্তিক ব্যবস্থা' সম্পর্কে সকলকে বক্তৃতা দিয়ে আসছে তার জন্য এটি যথেষ্ট। এর পরিবর্তে যা এসেছে তা হল এই নগ্ন দাবি যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যাকে ইচ্ছা, যেখানে ইচ্ছা, যখন ইচ্ছা হত্যা করতে পারে এবং হত্যার কাজটি নিজেই যথেষ্ট ন্যায্যতামূলক। হেগসেথ এটিকে 'নীরব মৃত্যু,' বলেছেন।

এখানে একটি তিক্ত ঐতিহাসিক বিড়ম্বনা রয়েছে। ১৯১৫ সালে, আয়ারল্যান্ডের উপকূলে একটি জার্মান ইউ-বোট (সাবমেরিন) দ্বারা ব্রিটিশ ক্রুজ জাহাজ এইচএমএস লুসিটানিয়াকে ডুবইয়ে দেওয়ার ঘটনায় আমেরিকান জনমতকে জার্মানির বিরুদ্ধে উস্কে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দুই বছর পর, ১৯১৭ সালের এপ্রিলে, রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশের জন্য অজুহাত হিসেবে জার্মানির সীমাহীন সাবমেরিন যুদ্ধের ঘোষণাকে গ্রহণ করেন।

এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরে, একটি মার্কিন সাবমেরিন একটি ইরানি জাহাজকে চুপিসারে আক্রমণ করে ও একটি টর্পেডো দিয়ে ধ্বংস করে দেয়, এবং পিট হেগসেথ এটি নিয়ে হেসে ওঠেন।

কী করা হয়েছে তার প্রকৃতি বুঝতে হলে, জড়িত বাহিনীগুলির অদ্ভুত অসামঞ্জস্যতাকে বুঝতে হবে।

একটি মার্কিন নৌবাহিনীর আর্লে বার্ক-শ্রেণীর ডেস্ট্রয়ার প্রায় ৯,০০০ টন। এটি প্রায় ১৫৫ মিটার দৈর্ঘ্যের। এটি ৯০ থেকে ৯৬টি উল্লম্ব লঞ্চ সেল বহন করে যা টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, উন্নত ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র এবং সাবমেরিন-বিধ্বংসী অস্ত্র নিক্ষেপ করতে সক্ষম। এটি এজিস কমব্যাট সিস্টেমের সাথে একীভূত, যা এখন পর্যন্ত নির্মিত সবচেয়ে অত্যাধুনিক যুদ্ধ-ব্যবস্থাপনা নেটওয়ার্কগুলির মধ্যে একটি, যা এটিকে সঠিক সময়ে উপগ্রহ, বিমান এবং অন্যান্য নৌযানের সাথে সমগ্র অপারেশন চালাতে সংযুক্ত করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী এই ধরণের অসংখ্য জাহাজ পরিচালনা করে। এটি ১১টি পারমাণবিক শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ পরিচালনা করে, প্রতিটি একটি বিমানশক্তিধর চলমান শহর যা সমগ্র সমুদ্র জুড়ে প্রাণঘাতী শক্তি প্রক্ষেপণ করতে সক্ষম।

আইআরআইএস ডেনা ১,৫০০ টনের - একটি একক আমেরিকান ডেস্ট্রয়ারের এক-ষষ্ঠাংশ। এটি ৯৪ মিটার লম্বা ছিল, চারটি দেশীয়ভাবে তৈরি ইরানি ডিজেল ইঞ্জিন দ্বারা চালিত। এটি ইরানি তৈরি জাহাজ-বিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র, একটি ৭৬-মিলিমিটার ডেক বন্দুক এবং হালকা টর্পেডো দিয়ে সজ্জিত ছিল। ক্রুতে ১৮০ জন লোক ছিল। এটি আমেরিকান নৌ শক্তির সমকক্ষ প্রতিযোগী ছিল না। আইআরআইএস ডেনা ছিল একটি উপকূলীয় ফ্রিগেট, নিষেধাজ্ঞার কারনে দেশীয়ভাবে নির্মিত, দেশীয় ব্যাবস্থাপনায় ইরানি ইঞ্জিনিয়াররা বছরের পর বছর ধরে এটিকে তৈরি করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন কারণ পশ্চিমা শক্তিগুলি ইরানকে বিশ্বব্যাপী অস্ত্র বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। এটি একেবারেই চলমান, ২০২২ এবং ২০২৩ সালের মতো এটি বিশ্ব প্রদক্ষিণ করতে পারে, এটি তাদের দক্ষতার প্রমাণ যারা এটি তৈরি করেছিল এবং যারা এর নাবিক ছিল।

যে ইরানি নাবিকদের হত্যা করা হয়েছিল তাদের আমেরিকান সংবাদমাধ্যমে কোনও নাম নেই। তাদের কোনও মুখ নেই। তাদের কোনও পরিবার নেই যাদের সাক্ষাৎকার নিতে পশ্চিমা সাংবাদিকদের পাঠানো হয়েছিল। তারা বেশিরভাগই যুবক ছিল, যারা পেশাদার নাবিক হিসাবে কয়েক মাস ধরে তাদের পরিবারগুলির থেকে দূরে ছিল।

ইরানি নাবিকদের কোনও সতর্কতা দেওয়া হয়নি। তাদের লড়াই করার, পালিয়ে যাওয়ার, এমনকি তাদের সাথে কী ঘটছে তা বোঝার সময়ও ছিল না। জাহাজটি এত দ্রুত ডুবে যায় যে যখন শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী - মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী নয়, কোনও আমেরিকান জাহাজ নয় বরং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাধ্যবাধকতা পালনকারী একটি ছোট দ্বীপরাষ্ট্রের নৌবাহিনী - ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, তখন IRIS Dena ইতিমধ্যেই ভূপৃষ্ঠের নীচে সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল।

যে মার্কিন সাবমেরিন তাদের হত্যা করেছিল, জাহাজটি থেকে বেঁচে যাওয়াদের উদ্ধারের কোনও চেষ্টা করেনি, যা দ্বিতীয় জেনেভা কনভেনশন (১৯৪৯) এর ধারা ১৮ এর অধীনে তাদের আইনি বাধ্যবাধকতার সরাসরি লঙ্ঘন। তারা টর্পেডো নিক্ষেপ করে, তাদের হত্যা নিশ্চিত করে এবং চলে যায়। বেঁচে থাকা ৩২ জন নাবিক তাদের জীবনের জন্য সম্পূর্ণ ঋণী শ্রীলঙ্কার উদ্ধার অভিযানের কাছে। পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত নৌবাহিনীর অধিকারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, একজন ডুবে যাওয়া মানুষকে জল থেকে উদ্ধার করার জন্য সামান্য চেষ্টাও করেনি।

আমরা জানি না যে সাবমেরিনে থাকা আমেরিকান নাবিকদেরকে তাদের আদেশ পালন করার সময় কী বলা হয়েছিল। কিন্তু যখন তারা সত্যটি আবিষ্কার করবে – তাঁরা কোনো কারণ ছাড়াই গুলি চালিয়ে ১৪০ জনকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে - তখন তাদের অনেকেই মর্মান্তিক অনুশোচনা এবং লজ্জা অনুভব করবে যা তাদের বাকি জীবন ধরে বয়ে বেরাতে হবে।

আইআরআইএস ডেনা ইরানের জলসীমায় ছিল না। এটি পারস্য উপসাগরে ছিল না, কোনও ঘোষিত বর্জন অঞ্চলেও ছিল না। এটি আক্রমণাত্মকভাবে কৌশল চালাচ্ছিল না বা কোনও জাহাজকে লক্ষ্য করে কাজও করছিল না। এটি কোনও সক্রিয় নৌ অভিযানের অংশ ছিল না। এটি একাই যাত্রা করছিল, কোনও এসকর্ট ছাড়াই, নিকটতম যুদ্ধক্ষেত্র থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে, ভারতের আমন্ত্রণে - আন্তর্জাতিক নৌবহর পর্যালোচনা ২০২৬ এবং বিশাখাপত্তনম বন্দরে বহুজাতিক মহড়া ২০২৬-এ অংশগ্রহণের পর দেশে ফিরছিল। সেই মহড়ায় ৭৪টি দেশ অংশগ্রহণ করেছিল। এতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও অন্তর্ভুক্ত ছিল। আমেরিকান এবং ইরানি নৌ কর্মকর্তারা, ডুবে যাওয়ার কয়েকদিন আগে, ভারতের মাটিতে একই পেশাদার সমাবেশে অংশ নিয়েছিলেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এই জাহাজটিকে সতর্ক করার জন্য সমস্ত উপায় ছিল। এটি একটি নিরপেক্ষ বন্দরে এটিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার দাবি করার জন্য সমস্ত উপায় ছিল। এর কাছে ভূপৃষ্ঠের জাহাজ, বিমান এবং বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল। আইআরআইএস ডেনা একটি ভূপৃষ্ঠের জাহাজ ছিল, দৃশ্যমান, ট্র্যাকযোগ্য, যেকোনো আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক ফ্রিকোয়েন্সিতে রেডিও দ্বারা পৌঁছানো যেত। কোনও সতর্কতা দেওয়া হয়নি কারণ উদ্দেশ্য সেটি ছিল না। প্রশাসন কোনও সতর্কতা বার্তা প্রয়োজনীয় বলে মনে করেনি কারণ এটিকে প্রয়োজনীয় বলে মনে করে না, কারণ এটি ট্রাম্পের 'নৈতিকতার' বাইরে কোনও আইনি বা নৈতিক কর্তৃত্বকে স্বীকৃতি দেয় না।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম কোনও মন্তব্য ছাড়াই এই অপরাধ স্বীকার করেছে। কিন্তু কল্পনা করুন যে ভারত মহাসাগরে কর্মরত একটি রাশিয়ান সাবমেরিন একটি ইউক্রেনীয় নৌযান - আইআরআইএস ডেনার সমান আকারের একটি ফ্রিগেট - খুঁজে পেয়েছে যেটি বহুজাতিক মহড়া থেকে দেশে ফিরে আসছে, যেখানে এটিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, আন্তর্জাতিক জলসীমায় একা যাত্রা করছিল, কারও জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করেনি। কল্পনা করুন যে রাশিয়ান সাবমেরিনটি কোনও সতর্কতা ছাড়াই, আত্মসমর্পণের কোনও প্রচেষ্টা না দিয়েই একটি টর্পেডো নিক্ষেপ করেছে এবং জাহাজ এবং তার ১৮০ সদস্যের বেশিরভাগ নাবিককে সমুদ্রে সলিল সমাধি দিয়েছে। কল্পনা করুন যে রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী তখন মস্কোতে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে রাশিয়ার নাগাল এবং শক্তি প্রদর্শন হিসাবে আক্রমণটি উদযাপন করেছেন এবং এটিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ টর্পেডো হত্যাকাণ্ড ঘোষণা করেছেন।

পশ্চিমি প্রতিক্রিয়া বর্ণনা করার জন্য কল্পনার কোনও কৃতিত্বের প্রয়োজন নেই। এটি তাৎক্ষণিক, বজ্রধ্বনিপূর্ণ এবং অভিন্ন হবে। লিন্ডসে গ্রাহামের মতো রিপাবলিকান ফ্যাসিস্ট থেকে শুরু করে বার্নি স্যান্ডার্সের মতো 'বাম' ডেমোক্র্যাট পর্যন্ত প্রতিটি ধরণের বুর্জোয়া রাজনীতিবিদদের মুখে 'যুদ্ধাপরাধ' শব্দটি থাকবে। ইউরোপে, ন্যাটো নেতাদের দ্বারা জারি করা নিন্দাগুলি সমস্ত রাজনৈতিক দল দ্বারা ধার্মিকভাবে সমর্থন করা হবে। দিন শেষ হওয়ার আগেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে আবেদন করা হবে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি অধিবেশন ডাকা হবে। জাতিসংঘের সনদ, নৌযুদ্ধের আইন, সশস্ত্র সংঘাতের প্রচলিত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের তালিকা তৈরি করতে প্রতিটি নেটওয়ার্কে আইনজ্ঞরা উপস্থিত হবেন। রাশিয়ার রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত ফৌজদারি বিচারের জন্য আহ্বান জানানো হবে। পশ্চিমা সরকারগুলি নতুন নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে। ডুবে যাওয়া ইউক্রেনীয় নাবিকদের নাম, মুখ এবং পরিবারকে প্রতিটি পর্দায় দেখা যাবে।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে যে প্রতিটি আইনি এবং নৈতিক যুক্তি প্রয়োগ করা হবে, তা ৪ ঠা মার্চ, ২০২৬ তারিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যা করেছিল তার সাথে একই শক্তিতে প্রযোজ্য। তথ্যগুলি বস্তুগতভাবে অভিন্ন। আইনি কাঠামো একই। মানবিক পরিণতি সমানভাবে বাস্তব। একমাত্র পার্থক্য হল সাবমেরিনের আমেরিকান পরিচয়।

মার্কিন সরকারের পদক্ষেপগুলি থার্ড রাইখের মতো। অ্যাডমিরাল কার্ল ডোনিটজ ১৯৪২ সালে তার ল্যাকোনিয়া আদেশ জারি করেছিলেন, যেখানে ইউ-বোট কমান্ডারদের জীবিতদের জন্য সমস্ত উদ্ধার অভিযান পরিত্যাগ করার এবং সতর্কতা ছাড়াই অবাধ সাবমেরিন যুদ্ধ পরিচালনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সেই কুখ্যাত আদেশে বলা হয়েছিল:

ডুবে যাওয়া জাহাজ থেকে বেঁচে যাওয়াদের উদ্ধারের সকল প্রচেষ্টা, যেমন সাঁতারুদের বাঁচানো এবং লাইফবোটে তোলা, উল্টে যাওয়া লাইফবোটগুলিকে এগিয়ে দেওয়া, অথবা তাঁদের খাবার ও জল দেওয়া, আবশ্যই বন্ধ করতে হবে। উদ্ধারকার্য যুদ্ধের সবচেয়ে মৌলিক দাবিগুলির সাথে সাংঘর্ষিক: শত্রু জাহাজ এবং তাদের নাবিকদের ধ্বংস।

নুরেমবার্গে তার বিচারের সময়, নাৎসি অ্যাডমিরাল ডোনিৎজ এই আদেশকে সমর্থন করেছিলেন এই যুক্তিতে যে আধুনিক যুদ্ধ নৌ-বীরত্বের পুরানো রীতিনীতিগুলিকে অপ্রচলিত করে তুলেছে।

তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। হেগসেথ ক্যামেরার সামনে 'নীরব মৃত্যু' ঘোষণা করেন, আইনজীবীদের সামনে, কোন লজ্জা ছাড়াই, আন্তর্জাতিক জলসীমায় ১৪০ জন নাবিকের হত্যাকাণ্ড - কোনও সতর্কীকরণ, কোনও হুমকি ছাড়াই, পরে তাদের বাঁচানোর কোনও প্রচেষ্টা ছাড়া - যা জাতীয় আত্ম-অভিনন্দনের উপলক্ষ ছাড়া আর কিছুই নয়।

এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দেওয়া চেইন অফ কমান্ড সাবমেরিনের টর্পেডো রুম থেকে হোয়াইট হাউস পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। নুরেমবার্গে প্রতিষ্ঠিত এবং আন্তর্জাতিক আইনে অন্তর্ভুক্ত কমান্ডের দায়িত্বের মতবাদে বলা হয়েছে যে রাজনৈতিক ও সামরিক নেতারা তাদের অধীনস্থ বাহিনী দ্বারা সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের জন্য ফৌজদারি দায়িত্ব বহন করেন - কেবলমাত্র যখন তারা সরাসরি এই ধরনের অপরাধের নির্দেশ দেন তখনই নয়, বরং যখন তারা সেই অপরাধ সম্পর্কে জানতেন বা জানা থাকা সত্বেও সেটি প্রতিরোধ করতে বা শাস্তি দিতে ব্যর্থ হন। এই উপলক্ষে, জ্ঞানের প্রশ্ন ওঠে না। যুদ্ধ সচিব নিজেই, জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে, বিশ্বের কাছে এই অপরাধের ঘোষণা, উদযাপন এবং সম্প্রচার করেছিলেন।

আইআরআইএস ডেনার টর্পেডো হামলার প্রভাব সমুদ্রের আনেক বাইরে বিস্তৃত। ভারত মহাসাগরে হত্যার অনুমোদন দেওয়া সরকার মিনিয়াপলিসের রাস্তায় আমেরিকানদের হত্যাকে ন্যায্যতা দিয়েছে। ৭ই জানুয়ারী, ২০২৬ তারিখে, একজন ফেডারেল আইসিই এজেন্ট ৩৭ বছর বয়সী একজন মা রেনি নিকোল গুডকে তার গাড়িতে বসে থাকা অবস্থায় গুলি করে হত্যা করে। ২৪শে জানুয়ারী, অ্যালেক্স প্রেত্তি, একজন পরিচর্যাকারী নার্স, যাকে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা কমপক্ষে ১০ বার গুলি করে, যখন তাকে ইতিমধ্যেই ফুটপাতে ফেলে আটকে ধরে রাখা হয়েছিল, তার বন্দুক কখনও বের করা হয়নি।

উভয় ক্ষেত্রেই মতবাদ একই রকম। আমেরিকান শক্তির হাতে নিহত - ভারত মহাসাগরে ইরানি নাবিকরাই হোক বা মিনিয়াপলিসের ফুটপাতে আমেরিকান নাগরিক – তাঁরা রাষ্ট্র দ্বারা হত্যার লক্ষ্যবস্তু ছিল। ভুক্তভোগীরা সর্বদা, পূর্ববর্তীভাবে, কিছু না কিছুর জন্য দোষী। রেনি গুডের গাড়ি ছিল। অ্যালেক্স প্রেত্তির কাছে তার বৈধভাবে বহন করা আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। আমেরিকান রাস্তায় যা অনুশীলন করা হয় তা ভারত মহাসাগরেও অনুশীলন করা হয়। এটি একটি মতবাদ এবং যা একই শাসক শ্রেণীর স্বার্থে পরিচালিত একটি সরকার।

আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেণী, ছাত্র এবং সাম্রাজ্যবাদের সমস্ত বিরোধীদের এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে সংগঠিত হতে হবে। তাদের অবশ্যই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অবিলম্বে বন্ধ করার এবং অপারেশন এপিক ফিউরির অধীনে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের তদন্তের জন্য একটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক শ্রমিক ট্রাইব্যুনাল গঠণের দাবি জানাতে হবে।

আইআরআইএস ডেনাকে ডুবিয়ে দেওয়া টর্পেডো কেবল ১৪০ জন নাবিককেই হত্যা করেনি। এটি বিশ্বের কাছে এবং ক্ষমা না চেয়েই ঘোষণা করেছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর সরকার কোনও আইন, কোনও কনভেনশন বা সভ্য আচরণের কোনও মানদণ্ড দ্বারা আবদ্ধ নয়। এটি যে একমাত্র বাধ্যবাধকতাগুলিকে স্বীকৃতি দেয় তা হল পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এবং যা মুনাফা সংগ্রহের দ্বারা নির্ধারিত।

প্রতিদিন, প্রতিটি নতুন অপরাধ লিও ট্রটস্কির সতর্কবার্তাকে আরও তাৎপর্য করে তোলে: 'সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ছাড়া, পরবর্তী ঐতিহাসিক সময়ে, একটি বিপর্যয় সমগ্র মানবজাতির সংস্কৃতিকে হুমকির মুখে ফেলে।'

Loading