বাংলা
Perspective

ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইজরায়েলের আগ্রাসী যুদ্ধের ১০০ দিন

Lebanese security officers gather at the site where an Israeli airstrike hit a building in Dahiyeh, Beirut's southern suburb, Lebanon, Sunday, June 7, 2026. [AP Photo/Hassan Ammar]

একশ দিন আগে, ২৮শে ফেব্রুয়ারি, আমেরিকা ও ইজরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে এক বেআইনি ও আগ্রাসী যুদ্ধ শুরু করে। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো ঐতিহাসিকভাবে নিপীড়িত একটি জাতির বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ চালাচ্ছে।

ইরানি জনগণের প্রতিরোধ—সেখানকার ধর্মীয় শাসকদের শাসনব্যবস্থা যতই প্রতিক্রিয়াশীল হোক না কেন—রাজনৈতিকভাবে বৈধ এবং বীরত্বপূর্ণ। সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য ও বশ্যতা স্বীকার করা থেকে ইরানকে রক্ষা করতে আন্তর্জাতিক শ্রমিক শ্রেণিকে নিঃশর্তভাবে এগিয়ে আসতে হবে।

ট্রাম্প প্রশাসন বর্তমানে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে যে ‘আলোচনা’ চালাচ্ছে, তা নিছকই এক প্রতারণা। সপ্তাহান্তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে, ইরান যদি তাঁর দাবি মেনে না নেয়, তবে তিনি তাদের ‘ধ্বংসস্তূপে পরিণত করবেন’। এমনকি ট্রাম্প প্রশাসন যদি কোনো ‘যুদ্ধবিরতি’তেও সম্মত হয়, তবুও হোয়াইট হাউসের সেই ‘গুণ্ডা’দের সাথে করা যেকোনো চুক্তির গুরুত্ব হবে ঠিক ততটুকুই, যতটা ছিল ২০২৫ সালের সেই তথাকথিত ‘শান্তি’ চুক্তির—যা আসলে এই বছরের যুদ্ধের পটভূমি তৈরি করেছিল।

রবিবার রাতে ইজরায়েল তেহরানে হামলা চালায়। লেবাননে, তথাকথিত আলোচনার মধ্যেই ইজরায়েলি বোমাবর্ষণ তীব্রতর হয়েছে; এতে অন্তত ৩,৫৯৩ জন নিহত এবং দশ লক্ষেরও বেশি মানুষ ঘর ছাড়া হয়েছে- এই প্রাণহানির সংখ্যা ইরানে নিহত ৩,৪৬৮ জনের (যাদের মধ্যে সাতটি শিশু ও ৩৭৬ জন নাবালক এবং ২৬,৫০০-এরও বেশি মানুষ আহত হয়েছে) সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।

এই যুদ্ধের সময় সাম্রাজ্যবাদ বর্বরতার এক নতুন ও নিকৃষ্ট স্তরে নেমে গেছে। ‘একটি সমগ্র সভ্যতা’কে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার ব্যাপারে ট্রাম্পের হুমকি এবং ‘কোনো ছাড় বা দয়া নয়’—এমন নীতি নিয়ে যুদ্ধ চালানোর ব্যাপারে হেগসেথের প্রতিজ্ঞা ইতিহাসে এমন এক শাসকগোষ্ঠীর (অলিগার্কি) কর্মকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে, যারা বৈধতার সমস্ত ভানটুকুও পরিত্যাগ করেছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো এখন নাৎসিদের প্রবর্তিত পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রকাশ্যে নিপীড়ন ও বশ্যতা আদায়ের যুদ্ধ চালাচ্ছে।

আমেরিকা ও ইজরায়েলের নৃশংস ও প্রাণঘাতী আক্রমণ সত্ত্বেও সাম্রাজ্যবাদ তার কোনো লক্ষ্যই অর্জন করতে পারেনি। তারা ইরানের সরকারকে উৎখাত করতে পারেনি, ইরানের সামরিক শক্তিকে গুঁড়িয়ে দিতে পারেনি কিংবা হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি।

এই যুদ্ধের দুটি বড় প্রভাব পড়েছে: পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বৈশ্বিক সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে—বিশেষ করে খোদ আমেরিকার অভ্যন্তরে—শ্রেণি-সংগ্রামের ব্যাপক তীব্রতা দেখা দিয়েছে।

ইরানের ঘটনায় আমেরিকার বিপর্যয় মার্কিন-নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। জুন মাসে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মার্কিন ট্রেজারি বন্ড ছেড়ে সোনার দিকে ঝুঁকছে; ফলে সোনা এখন ইউরোকে ছাড়িয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম রিজার্ভ সম্পদে পরিণত হয়েছে—যা বৈশ্বিক রিজার্ভের ২৭ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে (এক বছর আগে যা ছিল ২০ শতাংশ)। আমেরিকার জাতীয় ঋণের পরিমাণ ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

আমেরিকা ও আন্তর্জাতিক স্তরে—সর্বত্রই—এই যুদ্ধের বোঝা বইতে হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণিকে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পাম্পে জ্বালানির দাম ৫০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে, টমেটোর মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ এবং মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে ৩.৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০২৩ সালের পর সর্বোচ্চ।

ট্রাম্প এই যুদ্ধকে কাজে লাগিয়ে সামাজিক কর্মসূচিগুলোর ওপর তাঁর আক্রমণ আরও জোরদার করেছেন। এপ্রিলে তিনি ঘোষণা করেন যে, 'আমরা যুদ্ধে লিপ্ত আছি' এবং তাই 'ডে-কেয়ার, মেডিকেইড, মেডিকেয়ার বা এ ধরনের ব্যক্তিগত স্বাস্থ বিষয়গুলোর দেখভাল করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।' বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) সতর্ক করেছে যে, এই যুদ্ধের ফলে আরও ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ তীব্র ক্ষুধার কবলে পড়তে পারে—যা একটি রেকর্ড সংখ্যা—এবং এতে আফ্রিকা ও এশিয়ার সবচেয়ে দরিদ্র ও আমদানিনির্ভর দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সংকটের জবাবে শ্রমিক শ্রেণি পাল্টা লড়াই শুরু করেছে। গত তিন মাসে আমেরিকায় শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামের উল্লেখযোগ্য বিস্তার ঘটেছে: তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে লং আইল্যান্ড রেল রোডে এই প্রথম ধর্মঘট; কলোরাডোর গ্রিলিতে জেবিএস (JBS)-এর ৩,৮০০ মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ কর্মীর তিন সপ্তাহব্যাপী কর্মবিরতি (যা এই শিল্পে ৪০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে প্রথম); ক্যালিফোর্নিয়ায় শিক্ষকদের ধর্মঘট ও নর্থ ক্যারোলিনায় রাজ্যজুড়ে কর্মবিরতি; নিউ অরলিন্স ও ক্যালিফোর্নিয়ায় অপর্যাপ্ত কর্মীসংখ্যার প্রতিবাদে নার্সদের ধর্মঘট; এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীদের ধর্মঘট। এবং অটো পার্টস শিল্পে বর্তমানে ছড়িয়ে পড়া বিদ্রোহ।

আন্তর্জাতিকভাবে শ্রেণি-সংগ্রাম তীব্র হয়ে উঠছে—কেনিয়ায় সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণ-বিক্ষোভ, দিল্লির শিল্পকেন্দ্রিক-উপশহরগুলোতে হাজার হাজার শ্রমিকের বিদ্রোহ এবং তুরস্কে কয়লা খনি শ্রমিকদের অনশন ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে তা প্রকাশ পাচ্ছে। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে ইউরোপের আটটি দেশে ৪৫৮টি ধর্মঘট হয়েছে; এর মধ্যে রয়েছে বেলজিয়াম ও ইতালিতে জাতীয় সাধারণ ধর্মঘট এবং স্পেনের আন্দালুসিয়া ও বাস্ক অঞ্চলে আঞ্চলিক সাধারণ ধর্মঘট। ফেব্রুয়ারি মাসে আর্জেন্টিনা মিলেই সরকারের বিরুদ্ধে জাতীয় সাধারণ ধর্মঘট পালন করেছে এবং ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যে ১৭ লাখ সরকারি কর্মচারী কর্মবিরতি পালন করেছেন।

সাম্রাজ্যবাদকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়া দ্বন্দ্বগুলোই শ্রমিক শ্রেণিকে সংগ্রামের পথে ধাবিত করছে। যে সংকট যুদ্ধের জন্ম দেয়, সেই একই সংকট থেকে শ্রেণি-সংগ্রামের বিকাশ ঘটে। সেই সংকট থেকেই এমন এক সামাজিক শক্তির উদ্ভব ঘটে, যা এর অবসান ঘটাতে সক্ষম। যুদ্ধ এবং সামাজিক বিপ্লব একই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার দুটি দিক।

ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইজরায়েলের আগ্রাসী যুদ্ধ, কৃচ্ছ্রসাধন ও একনায়কতন্ত্রের দিকে ধাবিত হওয়ার বৃহত্তর প্রবণতার বিরুদ্ধে আমেরিকা ও বিশ্বজুড়ে ব্যাপক ও ক্রমবর্ধমান বিরোধিতা গড়ে উঠছে। কিন্তু এই বিরোধিতা যদি নিজস্ব গতিতে চলতে থাকে, তবে তা ছড়িয়ে পড়ে ও ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়ে যায়। একে অবশ্যই একটি কর্মসূচি, দৃষ্টিভঙ্গি ও নেতৃত্বের মাধ্যমে সুসংহত করতে হবে।

যারা যুদ্ধ চালাচ্ছে, সেই সরকার ও দলগুলোর কাছে আবেদন জানিয়ে যুদ্ধের বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব নয়। আমেরিকান ডেমোক্রেটিক পার্টি ইরানের নেতাদের হত্যার ঘটনাকে উল্লাসের সাথে স্বাগত জানিয়েছে এবং ট্রাম্পের সামরিক বাজেটে অর্থায়ন করেছে। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো এই যুদ্ধকে সমর্থন ও রাজনৈতিকভাবে যৌক্তিকতা প্রদান করেছে; একইসাথে তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রক্সি যুদ্ধ (পরোক্ষ যুদ্ধ) তীব্র করার লক্ষ্যে অস্ত্রসজ্জায় ৮০০ বিলিয়ন ইউরো ঢালছে—যে যুদ্ধ তারা নিজেরাই অস্ত্র দিয়ে ও পরিচালনার মাধ্যমে চালিয়ে যাচ্ছে।

সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হলে আমেরিকা, ইউরোপ ও বিশ্বজুড়ে শ্রমিকদের সংগ্রামকে—যুদ্ধ, কৃচ্ছ্রসাধন ও একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে—একটি সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচির ভিত্তিতে সচেতন রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। যুদ্ধ ও বর্বরতার অবসান ঘটাতে হলে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে নির্মূল করতে হবে।

এটিই হলো 'সোশ্যালিস্ট ইকুয়ালিটি পার্টি' (Socialist Equality Party) এবং 'ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অফ দ্য ফোর্থ ইন্টারন্যাশনাল'-এর (International Committee of the Fourth International) দৃষ্টিভঙ্গি। এই যুদ্ধের বিরোধী প্রতিটি শ্রমিক ও তরুণকে আমরা আহ্বান জানাই এই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে এবং শ্রমিক শ্রেণীর প্রয়োজনীয় বিপ্লবী নেতৃত্ব গড়ে তুলতে।

Loading