বাংলা

শিক্ষার্থীদের ক্রমবর্ধমান বিক্ষোভ ভারতের কট্টর-ডানপন্থী সরকারকে কাঁপিয়ে দিয়েছে

নয়াদিল্লিতে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে ভারতের পার্লামেন্টের দিকে মিছিল করে যাওয়ার সময় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র সমর্থকদের সাথে পুলিশের ধস্তাধস্তি, ২০শে জুলাই সোমবার ২০২৬।  [এপি ছবি/বিপিন].  [AP Photo/Vipin]

গত মাসে নবগঠিত 'ককরোচ জনতা পার্টি' (সিজেপি)-র নেতৃত্বে শুরু হওয়া একটি প্রতিবাদ আন্দোলন ভারতের রাজধানীর রাস্তায় হাজার হাজার শিক্ষার্থী, বেকার তরুণ ও তরুণ পেশাজীবীদের সমবেত করেছে এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও তাঁর কট্টর-ডানপন্থী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সরকারকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

এই প্রতিবাদের তাৎক্ষণিক কারণ সরকারি ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত অত্যন্ত কঠোর ও সামাজিক বৈষম্যমূলক উচ্চ শিক্ষায় ভর্তির পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দুর্নীতির ঘটনা। তবে এই আন্দোলনটি এখন আরও ব্যাপক সামাজিক ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে—এই ক্ষোভের মূলে রয়েছে কর্মসংস্থানের অভাব, ব্যাপক দারিদ্র্য এবং সাধারণ জনগণ ও অতি-ধনী মুষ্টিমেয় গোষ্ঠীর মধ্যে ক্রমবর্মান বিশাল ব্যবধান।

এই সপ্তাহে প্রতিবাদ আন্দোলনটি নতুন মাত্রা পায়, যখন হাজার হাজার মানুষ সংসদ ভবনের দিকে মিছিল করার ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞাকে অমান্য করে রাস্তায় নেমে আসে। নিজেদের হিংস ও স্বৈরাচারী স্বভাব অনুযায়ী, মোদী সরকার এর জবাবে কঠোর পুলিশি দমন-পীড়ন চালায়—যার মধ্যে ছিল কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ, লাঠিচার্জ, গণ-গ্রেপ্তার এবং হাজার হাজার আধা-সামরিক বাহিনীর মোতায়েন।

তরুণদের এই আন্দোলনের আগে এপ্রিল মাসে নয়াদিল্লির উপকণ্ঠে নয়ডা এবং প্রতিবেশী রাজ্য হরিয়ানার মানেসার শহরে হাজার হাজার নির্মমভাবে শোষিত শ্রমিকের মধ্যে এক গণ-অভ্যুত্থান ঘটেছিল। জীবনধারণের উপযোগী মজুরির দাবি জানানোর অপরাধেই এই দুই শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের অপরাধী সাব্যস্ত করে জেলে ভরা হয়।

ভারতের তরুণ শিক্ষার্থীরা সব দিক থেকেই এক অন্ধকার ভবিষ্যতের মুখোমুখি: হয় তাঁরা দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হওয়া কলেজ ভর্তি প্রক্রিয়ার কারণে উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অথবা শুরু থেকেই স্বল্প বা দারিদ্র্য-সীমার কাছাকাছি মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে; অথবা স্নাতক হওয়ার পর তারা এমন এক শ্রমবাজারের মুখোমুখি হচ্ছে যেখানে অধিকাংশ ডিগ্রিধারীর কপালে জুটছে কেবল অনিয়মিত বা কিছু সময়ের কাজ (গিগ ওয়ার্ক), বেকারত্ব অথবা যোগ্যতার চেয়ে অনেক নিম্নমানের কাজ।

ভারত সরকারের নিজস্ব 'লেবার ফোর্স সার্ভে' বা শ্রমশক্তি সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, দেশটিতে বেকারত্বের হার গত ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে—এমন একটি তথ্য যা রাজনৈতিকভাবে এতটাই বিস্ফোরক যে মোদী সরকার শুরুতে তা গোপন করেছিল। প্রতি বছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করা এক কোটিরও (১০ মিলিয়ন) বেশি তরুণের মধ্যে মাত্র অতি সামান্য একটি অংশই আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান পায়। এটি কোনো দুর্ঘটনা বা সাময়িক অকার্যকারিতা নয়—এটি এমন এক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কাঠামোগত ফলাফল, যা ২২৯ জন বিলিয়নেয়ারের (যাদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ১ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি) জন্য বিপুল সম্পদ সৃষ্টি করে, অথচ একই সাথে একটি পুরো প্রজন্মকে ঠেলে দেয় স্থায়ী অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার দিকে।

প্রতিবাদ আন্দোলনের উৎস 

বর্তমান আন্দোলনের প্রত্যক্ষ সূত্রপাত ঘটে ৬ই জুন, যখন ভারতের রাজধানী দিল্লিতে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী 'ককরোচ জনতা পার্টি' (সিজেপি) নামক একটি নতুন আন্দোলনে প্রথম বড় জনসমাবেশে অংশ নেয়। প্রতিষ্ঠান-বিরোধী একটি সোশ্যাল মিডিয়া মিমের প্রতি ব্যাপক জনসমর্থনের ফলস্বরূপ এই দলটি গঠিত হয়েছিল। দেশের আরও কয়েকটি বড় শহরে প্রতিবাদ মিছিল করার পর, ২০শে জুন সিজেপি মধ্য দিল্লির যন্তর মন্তরে একটানা অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে। এর আট দিন পর, পরিবেশ ও শিক্ষা সংস্কার কর্মী সোনম ওয়াংচুক শিক্ষার্থীদের সাথে সংহতি জানিয়ে সেই প্রতিবাদস্থলে অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন শুরু করেন।

সিজেপি-র প্রধান দাবি হলো কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত 'ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট' (যা সর্বজনবিদিত 'নিট' বা NEET নামে পরিচিত) এবং 'সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন'-এর পরীক্ষায় যে পদ্ধতিগত জালিয়াতি ও অনিয়ম ফাঁস হয়েছে, তার প্রেক্ষিতেই এই দাবি তোলা হয়েছে।

আন্দোলনের প্রাথমিক স্ফুলিঙ্গটি জ্বলে ওঠে যখন জানা যায় যে, ৩রা মে অনুষ্ঠিত মেডিকেল কলেজে ভর্তির পরীক্ষা 'নিট'-এর প্রশ্নপত্র রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কিছু কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে ফাঁস হয়ে গিয়েছে। 'নিট' হলো একটি বাধ্যতামূলক ও অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, যার মাধ্যমে প্রতি বছর ২৩ লক্ষেরও বেশি শিক্ষার্থী মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য থাকা মাত্র ১ লক্ষ ৩৬ হাজার আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। পরবর্তীতে পরীক্ষাটি বাতিল করে ২১শে জুন নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়। এর ফলাফল ছিল মর্মান্তিক: অন্তত ১২ জন তরুণ-তরুণী—যাদের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়েছিল এবং বছরের পর বছরের প্রস্তুতি বৃথা গিয়েছিল—তাঁরা আত্মহননের পথ বেছে নেয়।

'ককরোচ জনতা পার্টি' নামটি ক্ষমতাসীন 'ভারতীয় জনতা পার্টি'-র নামের একটি ব্যঙ্গাত্মক রূপ এবং এটি ক্রমবর্ধমান সামাজিক ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। ১৫ই মে, ভারতের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্য কান্ত এক শুনানিকালে মন্তব্য করেছিলেন যে, ভারতের কোটি কোটি বেকার তরুণ-তরুণী হলো 'পরজীবী' এবং 'তেলাপোকা' (ককরোচ)। এই অবজ্ঞাপূর্ণ মন্তব্যটি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং এটি ছিল শাসক শ্রেণীর সেই চরম অবজ্ঞার নগ্ন প্রকাশ, যার মাধ্যমে তারা সেই বিপুল সংখ্যক তরুণ সমাজকে দেখে—যাদের তারা ব্যর্থ করেছে এবং যাদের তারা পরিত্যাগ করেছে। তাছাড়া, সাধারণ মানুষও বিষয়টিকে সেভাবেই গ্রহণ করেছিল। ভারতের তরুণরা এই গালিকেই প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত করেছে—যদিও সিজেপি নিজে প্রথাগত বা 'এস্টাবলিশমেন্ট'-এর রাজনীতির গণ্ডি অতিক্রম করেনি এবং তাদের প্রতিবাদ আন্দোলনকে অত্যন্ত সীমিত কিছু দাবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করেছে।

“সংসদ চলো”: হাজার হাজার মানুষের সংসদ অভিমুখে পদযাত্রা

সোমবার, ২০শে জুলাই, মোদী সরকারের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচির আওতায় সংসদ ভবনের দিকে পদযাত্রার চেষ্টা করেন। সংসদের ‘বর্ষাকালীন অধিবেশন’ শুরুর দিনটিকে কেন্দ্র করেই এই কর্মসূচিটির  আয়োজন করা হয়েছিল।

সিজেপি (CJP)-র নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনের ব্যাপকতা ও অংশগ্রহণকারীদের দৃঢ় সংকল্প দেখে সরকার বিচলিত হয়ে পড়েছিল। তাই বিক্ষোভকারীদের ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে সরকার আগেই এই পদযাত্রাকে বেআইনি ঘোষণা করে এবং নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচার করে।

কিন্তু সেই কৌশল ব্যর্থ হওয়ার পর, সরকারের নির্দেশে দিল্লি পুলিশ তাদের ওপর চরম দমন-পীড়ন চালায়। সংসদ ভবনে পৌঁছানোর আগেই পদযাত্রাটি আটকে দেওয়ার জন্য বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ভিড়ের ওপর কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে এবং বারবার লাঠিচার্জ করে; শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়া তরুণ-তরুণীদের নির্বিচারে মারধর করা হয়। বহু বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয় এবং ২০০ জনেরও বেশি মানুষ এতটাই গুরুতরভাবে আহত হন যে তাঁদের হাড় ভেঙে যায়, মাথায় গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয় এবং অতিরিক্ত মাত্রায় কাঁদানে গ্যাসের সংস্পর্শে আসার ফলে তাঁরা অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২১ বছর বয়সী এক তরুণী এতটাই গুরুতর আহত হন যে তাঁকে আইসিইউ (ICU)-তে রেখে চিকিৎসা দিতে হয়।

শহরের কেন্দ্রস্থলে বিক্ষোভকারীদের প্রবেশ ও চলাচল ব্যাহত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে দিল্লির বেশ কয়েকটি মেট্রো স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়, যার ফলে নয়াদিল্লি কার্যত এক অবরুদ্ধ নগরীতে পরিণত হয়।

‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এমন অনেক সাহসী তরুণ-তরুণী ছিলেন যাঁদের মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা ছিল। আগের রাতে যন্তর মন্তরের বিক্ষোভস্থল থেকে পুলিশ যখন বলপ্রয়োগ করে তাঁদের সরিয়ে দেয়, সেই সময় পুলিশের লাঠিপেটায় তাঁরা সেই আঘাত পেয়েছিলেন।

ভারতের নয়াদিল্লিতে বুধবার, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে আয়োজিত এক বিক্ষোভের সময় একজন বিক্ষোভকারী একটি পুলিশ গাড়ির বনেটের ওপর বসে আছেন।২২শে জুলাই ২০২৬ [এপি ছবি/বিপিন].  [AP Photo/Vipin]

সোমবারের ঘটনার পর থেকেই বিক্ষোভ আন্দোলন আরও জোরদার হয়েছে; যন্তর মন্তরের বিক্ষোভস্থলে পুনরায় অবস্থান কর্মসূচি শুরু হয়েছে এবং মুম্বাই, চেন্নাই, হায়দ্রাবাদ ও পাটনা-সহ দেশের বিভিন্ন শহরে সংহতি জানিয়ে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভারতের দ্বিতীয় জনবহুল রাজ্য বিহারের রাজধানী পাটনায় বুধবার হাজার হাজার মানুষের এক বিক্ষোভে পুলিশ নৃশংস হামলা চালায়।

বৃহস্পতিবার তরুণদের এই আন্দোলন নিয়ে নীরবতা ভাঙেন মোদী। সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত বার্তায় তিনি ভারতের তরুণদের প্রতি উদ্বেগ প্রকাশের ভান করেন এবং জাতীয় পর্যায়ের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের (গত এক দশকে এমন ঘটনা বহুবার ঘটেছে) জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তির লক্ষ্যে একটি তথাকথিত ‘ফাস্ট-ট্র্যাক’ আদালত গঠনের প্রতিশ্রুতি দেন।

পাশাপাশি সরকার সোমবার সিজেপি (CJP)-র প্রতিনিধিদের সাথে হওয়া আলোচনা পুনরায় শুরু করার প্রস্তাবও দিচ্ছে।

সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং অতীতে ডানপন্থী পুঁজিবাদী দল ‘আম আদমি পার্টি’র সাথে যুক্ত থাকা দিপকে এখন পর্যন্ত এই বিক্ষোভ আন্দোলনকে শুধুমাত্র ‘নিট’ (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। উচ্চ-মাধ্যমিক পরবর্তী শিক্ষায় দীর্ঘস্থায়ী অর্থবরাদ্দের ঘাটতি বা শিক্ষার্থীদের জন্য নামমাত্র আর্থিক সহায়তার বিষয়টি সমাধানের কোনো দাবিই তোলা হয়নি; এমনকি এমন কোনো দাবিও উত্থাপন করা হয়নি যা বাস্তবায়িত হলে ধনী শ্রেণির সম্পদের ওপর প্রভাব পড়ত কিংবা সামরিক খাতে অপচয় করা হাজার হাজার কোটি ডলার (বা লক্ষ কোটি টাকা) জনগুরুত্বপূর্ণ পরিষেবা সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির কাজে লাগানো যেত।

তবে দিপকে স্পষ্টতই বুঝতে পারছেন যে পরিস্থিতি পাল্টাচ্ছে এবং সরকারের প্রতি তরুণ বিক্ষোভকারীদের যে ক্ষোভ—যা সোমবারের দমন-পীড়নের ফলে আরও তীব্র হয়েছে—তার সাথে নিজেকে একাত্ম করাটা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। ভারতীয় সম্মানসূচক সম্বোধন ব্যবহার করে দিপকে বলেন, “মোদীজি, আমি আবারও আপনাকে অনুরোধ করছি ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করার জন্য। অন্যথায়, বিষয়টি কেবল ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি আপনার পদত্যাগের দাবি পর্যন্ত গড়াবে।”

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস গতকাল প্রকাশ করেছে যে, দিল্লি পুলিশকে ১৯৮০ সালের জাতীয় নিরাপত্তা আইন (এনএসএ)-এর অধীনে প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই “অনুমোদন” ১৫ই জুলাই দেওয়া হয়েছিল এবং এটি ১৯শে জুলাই থেকে ১৮ই অক্টোবর তিন মাসের জন্য কার্যকর থাকার কথা। এই কঠোর আইনের অধীনে, পুলিশ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই—এক বছর পর্যন্ত—এমন যে কাউকে কারারুদ্ধ করতে পারে, যাকে “রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বা জনশৃঙ্খলা রক্ষা, বা সম্প্রদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় সরবরাহ ও পরিষেবা বজায় রাখার ক্ষেত্রে কোনোভাবে ক্ষতিকর কাজ করছে” বলে মনে করা হয়।

মোদীর প্রধান অনুচর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ—স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতীয় ইতিহাসে সবচেয়ে দমনমূলক কিছু পদক্ষেপের স্থপতি—রাষ্ট্রের দমনমূলক প্রতিক্রিয়াকে আরও বাড়িয়ে তোলার পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি হাজার হাজার সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (সিআরপিএফ) কর্মী এবং র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (আরএএফ) ইউনিটকে একত্রিত করে রাজধানী জুড়ে মোতায়েন করেছেন।

নিরস্ত্র তরুণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে এই আধাসামরিক বাহিনীর সমাবেশ মোদী সরকারের অন্তরের ভয়কেই প্রকাশ করে। এটি এমন এক শাসনব্যবস্থা যা এক রাজনৈতিক ও সামাজিক আগ্নেয়গিরির চূড়ায় বসে আছে—এবং তারা তা জানে।

এপ্রিলে নয়ডার শ্রমিকদের বিক্ষোভের ওপর নৃশংস হামলায় যেমনটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তাদের সবচেয়ে বড় ভয় হলো এই যে, ছাত্র আন্দোলন শ্রমিক শ্রেণির বিরোধিতার বিস্ফোরণের অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে।

বিরোধী দলগুলো যুব আন্দোলনকে কাজে লাগাতে ও নিয়ন্ত্রনে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে

ভারতের বুর্জোয়া বিরোধী দলগুলো—সর্বোপরি কংগ্রেস পার্টি এবং তাদের জাঁকজমকপূর্ণ নামে পরিচিত কিন্তু রাজনৈতিকভাবে অন্তঃসারশূন্য “ইন্ডিয়া” জোটের নেতৃত্বে—প্রতিবাদী ছাত্র ও যুবকদের রক্ষাকর্তা হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, যিনি ভারতের বংশীয় বুর্জোয়া “বিরোধী দলের” বংশগত প্রতীক, তিনি ২০শে জুলাইয়ের “সংসদ চলো” মিছিল সংসদের দিকে যাওয়ার সময় তাতে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করে লোকদেখানো অভিনয় করেন। দিল্লি পুলিশ তাকে কিছুক্ষণের জন্য আটক করে।

ভারতের শ্রমজীবী ​​মানুষের ওপর বিজেপির শ্রেণিযুদ্ধের বিকল্প হওয়া তো দূরের কথা, কংগ্রেস পার্টি এর সহ-স্থপতি। কংগ্রেস এবং তার ‘ইন্ডিয়া’ জোট—যা বিভিন্ন ডানপন্থী, জাতি-জাতীয়তাবাদী ও বর্ণবাদী দল এবং স্তালিনবাদী সংসদীয় অংশীদারদের (সিপিএম ও সিপিআই) নিয়ে গঠিত—একটি বিকল্প ডানপন্থী পুঁজিবাদী সরকারের পক্ষে কথা বলে। এমন একটি সরকার, যা মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকারের মতোই শ্রমিক-বিরোধী, বিনিয়োগকারী-পন্থী সংস্কার এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে নয়াদিল্লির চীন-বিরোধী যুদ্ধ জোটে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে।

ঐতিহাসিকভাবে “বাম” হিসেবে চিহ্নিত সংগঠনগুলো—সিপিএম ও সিপিআই এবং স্তালিনবাদী নেতৃত্বাধীন সেন্টার অফ ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়নস (সিআইটিইউ) ও অল-ইন্ডিয়া ট্রেডস ইউনিয়ন কংগ্রেস (এআইটিইউসি)-সহ বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন—যথাযথভাবেই ব্যাপকভাবে নিন্দিত। হিন্দু আধিপত্যবাদী বিজেপির বিরোধিতা করার নামে, তারা কয়েক দশক ধরে পরিকল্পিতভাবে শ্রেণি সংগ্রামকে দমন করেছে, কেন্দ্রে ডানপন্থী সরকারগুলোকে সমর্থন করেছে, যে রাজ্যগুলোতে তারা ক্ষমতায় ছিল সেখানে নিজেদের ভাষায় বিনিয়োগকারী-পন্থী নীতি চাপিয়ে দিয়েছে এবং সংগ্রামী শ্রমিকদের সংগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করেছে।

নয়ডার শ্রমিক আন্দোলন এবং বর্তমান ছাত্র বিক্ষোভ আন্দোলন—উভয়ই প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, অর্থাৎ শ্রমিক ইউনিয়ন এবং আপাত বিরোধী দলগুলোর বাইরে থেকে উদ্ভূত হয়েছে। এটি সামাজিক সংকটের গভীরতা এবং ‘বাম’ ও ডান উভয় পক্ষের সমগ্র প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর প্রতি জনগণের বিচ্ছিন্নতারই প্রতিফলন। এর মধ্যেই বিজেপি সরকার এবং সামগ্রিকভাবে পুঁজিবাদী শাসক শ্রেণীর জন্য সত্যিকারের হুমকিস্বরূপ কিছুর বীজ নিহিত রয়েছে।

কিন্তু এটি সেই কেন্দ্রীয় বিপদটিও তৈরি করে—যা সিজেপি নেতৃত্বের রাজনীতিতে ইতিমধ্যেই প্রমাণিত—যার মুখোমুখি এই ধরনের প্রতিটি আন্দোলনই হয়। শ্রমিক শ্রেণীকে একটি সমাজতান্ত্রিক ও আন্তর্জাতিকতাবাদী কর্মসূচির আওতায় সংগঠিত করার লক্ষ্যে পরিচালিত না হলে, গণবিক্ষোভ যতই সংগ্রামী ও প্রতিবাদী হোক না কেন, তা বুর্জোয়া এবং ছদ্ম-বামপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে আসা, ভিন্ন পথে চালিত হওয়া এবং পরিশেষে ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার গণ-অভ্যুত্থানের ক্ষেত্রেও ঠিক এটাই ঘটেছিল।

ভারতের প্রবেশিকা পরীক্ষাকে ঘিরে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং জঘন্য দুর্নীতি, গণ-দারিদ্র্য ও বেকারত্বের মতো আরও অন্য মৌলিক সমস্যাগুলোর মতোই, পুঁজিবাদের বৈশ্বিক সংকটে প্রোথিত সামাজিক ব্যাধি। যা পরিবর্তন করা প্রয়োজন, তা পরিবর্তন করতে গিয়ে, বিজেপি সরকার এবং কর্পোরেট গণমাধ্যম দ্বারা বহুল প্রশংসিত ভারতের  “উত্থান” বিশ্বজুড়ে এবং বিশেষ করে বিশ্ব পুঁজিবাদের কেন্দ্রস্থল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘটনাবলিরই প্রতিচ্ছবি। অভূতপূর্ব এবং ক্রমবর্ধমান সামাজিক বৈষম্যে সমাজ ছিন্নভিন্ন; একটি গোষ্ঠীশাসিত শাসকশ্রেণী উগ্র-ডানপন্থী স্বৈরাচারকে আলিঙ্গন করছে; এবং শ্রমজীবী ​​মানুষের অধিকার নিরলসভাবে আক্রমণের শিকার, অথচ সরকার পুনঃঅস্ত্রসজ্জা এবং যুদ্ধে বিপুল সম্পদ ঢালার পাশাপাশি জনসেবার জন্য “টাকা নেই” বলে ঘোষণা করছে।

এই প্রতিবাদী আন্দোলনকে শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনের দিকে ধাবিত করার লক্ষ্যে সমাজতান্ত্রিক মানসিকতাসম্পন্ন যুবসমাজকে লড়াই করতে হবে—যার সূচনা হতে হবে নয়ডা এবং গুরগাঁও-মানেসার শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের মধ্য দিয়ে। মোদী সরকারকে পরাজিত করার এবং সামাজিক সমতাকে মূল নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে সমাজকে আমূল পরিবর্তন করার সামাজিক শক্তি কেবল শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু এই শক্তিকে কাজে লাগাতে হলে শ্রমিক শ্রেণীকে অবশ্যই সমস্ত পুঁজিবাদ-পন্থী দল—যার মধ্যে স্তালিনবাদীরাও অন্তর্ভুক্ত— তাঁদের থেকে নিজেদেরকে রাজনৈতিকভাবে স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে; এবং শ্রমিক-চালিত সরকার ও সমাজকে সমাজতান্ত্রিক ভিত্তিতে পুনর্গঠনের লড়াইয়ে শোষিত ও শ্রমজীবী ​​মানুষকে নিজেদের পতাকাতলে সমবেত করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন শ্রেণী-সংগ্রামের নতুন সংগঠন ও স্বাধীন সাধারণ শ্রমিক কমিটি গড়ে তোলা এবং সর্বোপরি একটি বিপ্লবী শ্রমিক শ্রেণীর দল—অর্থাৎ ট্রটস্কিবাদী দল—গঠন করা।

Loading